জবাবে তারা বললো “হাঁ, এবং তাদের মতে এই সবচেয়ে উচ্চ ধরণের অতিথি সঙ্কার।”
এ ব্যাপারের পরে আমার ধারণা হল, এর বেশী এসব লোকের কাছে আশা করেও কোনো লাভ নেই। আমি মন স্থির করে ফেললাম, ইবালাতান থেকে যে হজযাত্রীর কাফেলা রওয়ানা হচ্ছে তাদের সঙ্গী হয়ে মরক্কোয় ফিরে যাবো। পরে অবশ্য আমি ভাবলাম মালীতে এদের রাজার রাজধানী দেখে গেলেই ভাল হবে।
এমনি করে ইবালানে আমার প্রায় পঞ্চাশ দিন কেটে গেল। এখানকার বাসিন্দারা আমাকে সম্মান ও সমাদর দেখিয়েছে। ইবালাতান ভয়ানক গরম জায়গা। ঘোট ঘোট কয়েকটি খেজুর গাছ এখানকার গৌরবের বস্তু। খেজুর গাছের ছায়ায় এখানে তরমুজের চাষ করা হয়। এখানে মাটী খনন করে পানি পাওয়া যায়। ছাগল, ভেড়ার গোশত ইবালাতনে প্রচুর পাওয়া যায়। এখানকার অধিবাসীদের অধিকাংশই মাসুফা” উপজাতীয় সম্প্রদায়ভুক্ত। মিশরের দামী কাপড় দিয়ে তারা নিজেদের পোষাক পরিচ্ছদ তৈরী করে। এদের নারীরা অতুলনীয় সৌন্দর্যের অধিকারী এবং পুরুষের চেয়ে নারীই সম্মান পায় বেশী।
এদের চালচলন ও বিধি-ব্যবস্থা বাস্তবিকই কিছুটা অসাধারণ। এখানকার পুরুষদের মনে কোনো ব্যাপারেই কোনো ঈর্ষা-দ্বেষ দেখা যায় না। এদের কেউ-ই পৈত্রিক উত্তরাধিকার দাবী করে না, পক্ষান্তরে মাতুলের উত্তরাধিকার দাবী করে। এদেশের লোকের উত্তরাধিকারী তার ভাগ্নেরা, নিজের ছেলেরা নয়। এ রকম প্রথা হিন্দুস্তানের মালাবার ছাড়া দুনিয়ার আর কোথাও আমি দেখিনি। কিন্তু সেখানকার লোকেরা বিধর্মী আর এরা মুসলমান, নির্ধারিত সময় নামাজ পড়ে, হাদিস চর্চা করে ও কোরান মুখস্থ করে। কিন্তু তা সত্বেও স্ত্রীলোকেরা এখানে পুরুষদের সামনে যেতে লজ্জা। সঙ্কোচ করে না বা ঘোমটা দেয় না, যদিও নামাজ আদায় করতে কখনও কসুর করে না। কেউ যদি ইচ্ছা করে তবে তাদের বিয়ে করতে পারে কিন্তু স্বামীর সঙ্গে তারা। বিদেশে চলে যেতে রাজী হয় না। কেউ রাজী হলেও তার পরিবারের অন্যান্য সবাই তাকে ছেড়ে দিতে রাজী নয়।
সেখানকার মেয়েদের নিজ পরিবারের বাইরেও পুরুষ বন্ধু বা সঙ্গী থাকতে কোন বাধা নেই। পুরুষদের বেলায়ও ঠিক তেমনি, নিজ পরিবারের বাইরে বান্ধবী’ বা সখী থাকা দোষণীয় নয়। একজন পুরুষ হয়তো নিজের গৃহে ফিরে দেখতে পেল তার স্ত্রী নিজের কোন বন্ধুর বা সঙ্গীর মনোরঞ্জন করছে তখন সে তাতে কোনই আপত্তিই উত্থাপন করে না। একদিন আমি ইবালতানে কাজীর বাড়ি গিয়ে তার অনুমতি ক্রমে গৃহে প্রবেশ করে দেখলাম, সেখানে রয়েছে একজন অসামান্য সুন্দরী তরুণী। আমি তাকে দেখেই অপ্রস্তুত হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলাম কিন্তু তাতে তরুণী লজ্জিত না হয়ে বরং আমাকে ড্রিপ করে হেসে উঠল এবং কাজী আমাকে বললেন, আপনি বেরিয়ে যাচ্ছেন কেন? এতো আমার সঙ্গিনী। একজন ধর্মতত্ত্বজ্ঞ অধিকন্তু তীর্থযাত্রীর এ আচরণ দেখে আমি স্তম্ভিত হলাম। শুনেছি কাজী নাকি তার বান্ধবী সহ সেবার হজযাত্রায় যাবার জন্য সুলতানের অনুমতি চেয়েছিলেন। সেই বান্ধবী এ তরুণীই কিনা আমি জানি না কিন্তু সুলতান তার আবেদন মঞ্জুর করেননি।
ইবালাতান থেকে মালী যেতে দ্রুত চলেও চব্বিশ দিন লাগে। মালী যেতে মনস্থ করে মাসুফা থেকে একজন পরিচালক নিযুক্ত করে তিনজন সঙ্গীসহ যাত্রা করলাম। এ পথটি নিরাপদ বলে কাফেলা বা দল বেঁধে চলবার দরকার নেই। পথে অনেকগুলো বিশাল পরিধি বিশিষ্ট পুরাতন গাছ দেখতে পেলাম। সে সব গাছের এক একটির ছায়ায়। পূর্ণ একটি কাফেলা আশ্রয় গ্রহণ করতে পারে। এমন গাছও রয়েছে যার কোন শাখা বা পত্র নেই তবু তার কাণ্ডের ছায়াই একজন লোকের আশ্রয়ের জন্য যথেষ্ট। এসব গাছের কতকগুলোর ভেতরে অংশ পচে যাওয়ায় সেখানে বৃষ্টির পানি জমা হয়ে থাকে। তার ফলে কুপের কাজ চলে যায় এবং লোকে সে পানি পানও করে। কতকগুলো গাছে মৌমাছি ও মধু রয়েছে। লোকে তা সংগ্রহ করে নেয়। আমি বিস্মিত হলাম একজন তাতাঁকে এমনি একটি গাছের ফোকরে নিজের তাঁত বসিয়ে তাত চালাচ্ছে দেখে।
এ অঞ্চলে পথ চলতে গিয়ে পথিকদের কোন রকম খাদ্য ও সোনারূপা বা টাকা কড়ি সঙ্গে রাখবার দরকার হয় না। তারা সঙ্গে রাখে লবণ, কাঁচের তৈরী গহনা যাকে সাধারণতঃ পুতি বলা হয় এবং কিছু সুগন্ধি দ্রব্য। এসব নিয়ে কোনো গ্রামে হাজির হলেই কৃষ্ণকায়া নারীরা আসে তাদের জোয়ার, দুধ, মুরগী, মণ্ডে পরিণত পদ্ম ফল, চাউল, ফুনী ৮ (শর্ষের মত দেখতে এক প্রকার শস্য যা দিয়ে লাবসী তৈরী হয়) এবং ছাতু নিয়ে। মোসাফেররা যা খুশী তখন কিনতে পারে। কিন্তু তাদের চাউল খেয়ে বিদেশীদের অসুখ হয়। চাউলের চেয়ে ফুনী বরং ভাল। ইবালাতান ত্যাগ করার দশ দিন পর জাগারি ১ নামক একটি বড় গ্রামে আমরা হাজির হলাম। সেখানে ওযাজারাতা১০ নামে পরিচিত কাফ্রী ব্যবসায়ীরা এবং তাদের সঙ্গে খারিজী১১ সম্প্রদায়ের এক শ্রেণীর লোকেরা বাস করে। এ গ্রাম থেকেই ইবালাতানে জোয়ার আমদানী করা হয়। জাগারি থেকে আমরা বিখ্যাত নদী নীলনদের তীরে এসে পৌঁছলাম। নীলনদের তীরেই কারসাখু১২ শহর। কারসাখু থেকে নীলনদ বয়ে গেছে কাবারা এবং সেখান থেকে জাঘা১৩। কাবারাও জাঘার সুলতানরা মালীর সুলতানের বশ্যতা স্বীকার করতেন। জাঘার অধিবাসীরা বহুকাল হতেই ইসলাম ধর্মাবলম্বী। বিদ্যাচর্চার প্রতি তাদের যথেষ্ট আগ্রহ ও অনুরাগ দেখা যায়। এখান থেকে নীলনদ। নিম্নদিকে তাবুতু ও গগ (Gogo) ছাড়িয়ে গেছে। এ দুটি জায়গার বর্ণনা পরে দেওয়া হবে। গগা থেকে নীলনদ এসেছে মুলি ১৪ শহরে। মুলি লিমিসদের ১৫ দেশ এবং মালী রাজ্যের সীমান্ত প্রদেশ। সেখান থেকে নীলনদ বয়ে গেছে কাফ্রীদের অন্যতম বৃহৎ শহর যুফী (Yufi)। কাফ্ৰী শাসনকর্তাদের মধ্যে যুকীর শাসনকর্তা একজন খ্যাতনামা১৬ ব্যক্তি। কোনো শ্বেত লোক সে দেশে প্রবেশ করতে পারে না। কারণ সেখানে যাবার আগেই অধিবাসীরা তাকে হত্যা করবে। যুফী থেকে নীলনদ নেমে গেছে নুবাদের (Nubians) দেশে। মুবারা খৃষ্টধর্মাবলম্বী। নুবার পরে দানকুলা (Dongola) তাদের প্রধান শহর ১৭। দানকুলার সুলতানের নাম ইব্নে কাজউদ্দিন। মিশরের সুলতান আল-মালিক আন্-নাসিরের ১৮ সময় তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। অতঃপর নীলনদ এসেছে জানাদিল (the cataracts)। এখানেই কাফ্রী মুলুক শেষ হয়ে মিশরের আসওয়ান প্রদেশ আরম্ভ।
