আমরা সেখানে কষ্টেসৃষ্টে দশ দিন কাটালাম। কারণ, সেখানকার পানি যেমন লোনা, মাছির উৎপাত তেমনি অত্যধিক। তাগাঁজা ছাড়িয়েই যে মরুভূমি আছে তা পার। হবার জন্য তাগাঁজা হতেই পানি সরবরাহ করা হয়। মরুভূমি পার হতে দশ রাত্রি কেটে যায় কিন্তু পথে ক্কচিৎ কোথাও পানি পাওয়া যায়। সৌভাগ্যবশতঃ বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্ট নহর থেকেই আমরা পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পেয়েছিলাম। একদিন দুটি টিলার মধ্যবর্তী স্থানে আমরা মিষ্টি পানির এক নহর পেয়ে গেলাম। তাতে তৃষ্ণা নিবারণ তো হলই, পরে কাপড়-চোপড়ও ধুয়ে নিলাম। এখানকার মরুভূমিতে ব্যাঙের ছাতা গজায় প্রচুর কিন্তু তা জেঁকে ছেয়ে থাকে। কাজেই লোকে পারদযুক্ত (Mercury) একপ্রকার তারের হার গলায় ঝুলিয়ে রাখে। পারদে জোক মরে যায়। আমরা তখন পথ চলছিলাম কাফেলা ছেড়ে অনেকটা অগ্রসর হয়ে। পথে যেখানেই আমরা পশু চারণের উপযোগী জায়গা পেয়েছি সেখানেই পশুগুলিকে ঘাস খেতে ছেড়ে দিয়েছি। আমরা ঠিক এভাবেই চলছিলাম কিন্তু অবশেষে আমাদের দলের একজন লোক মরুভূমির মধ্যে হারিয়ে গেল। তারপর থেকে আমি আর কাফেলা ছেড়ে বেশী এগিয়েও যাইনি, পিছিয়েও পড়িনি। যেতে-যেতে আমরা আরেকটি কাফেলার দেখা পেলাম পথে। সে কাফেলার লোকেরা বলছিল তাদের একটি দলও কাফেলা থেকে পৃথক হয়ে পড়েছে। বালির মধ্যে জন্মে এমনি একটি ঝোঁপের আড়ালে সে দলের একজনকে আমরা পেলাম মৃতাবস্থায়। লোকটির কাপড় চোপড় পরাই রয়েছে, হাতে রয়েছে একটি চাবুক। এ জায়গা থেকে মাত্র এক মাইল দূরেই পানি পাওয়া যায়।
অতঃপর আমরা সারাহলা এসে পৌঁছলাম। এ জায়গার মাটীর নীচে পানি পাওয়া যায়। এখানে এসেই কাফেলা বিশ্রামের জন্য তিন দিন অবস্থান করে। সে সময় তারা তাদের মোশকগুলি মেরামত করে পানি ভতি করে নেয় এবং মরুভূমির হাওয়ার কবল থেকে রেহাই পাবার জন্য সারা গায়ে চট জড়িয়ে সেলাই করে নেয়। এখান থেকেই তাশিফ(Takshif) পাঠানো হয়। মাসুফা উপজাতীয় এমন লোককে তাশিক বলা হয়, কাফেলার দ্বারা নিযুক্ত যে লোক আগেই সংবাদ নিয়ে ইবালাতান পৌঁছে। কাফেলার যাত্রীরা তাশিফের সাহায্যে ইবালাতানে বন্ধু-বান্ধুবের কাছে চিঠিপত্র পাঠায় যার ফলে সে সব বন্ধুবান্ধব আগন্তকদের জন্য আগেই আহার-বাসস্থানের ব্যবস্থা করে রাখতে পারে। বন্ধুবান্ধুবেরা তখন চার রাত্রির পথ এগিয়ে আসে কাফেলার যাত্রীদের জন্য পানি বহন করে। ইবালতানে বন্ধুবান্ধব বলতে যার কেউ নেই সে সাহায্য চেয়ে পত্র লিখে সেখানকার কোনো নামকরা সওদাগরকে। তিনিই তখন তার সেবাযত্বের ভার গ্রহণ করেন। অনেক সময় এমন ঘটনাও ঘটে যে তাশিফ মরুভূমির পথেই মৃত্যুমুখে পতিত হয়। তার ফলে, ইবালানের কেউই আর কাফেলার আগমন সংবাদ পায় না। তখন কাফেলার অনেকেই অথবা সবাই মৃত্যু বরণ করতে বাধ্য হয়। এই মরুভূমিতে ভূতের প্রভাব আছে। তাকশিফকে একা পেলে তারা খেলাচ্ছলে তাশিফের মানসিক বিকৃতি ঘটায়। তার ফলে পথ হারিয়ে সে মৃত্যু বরণ করে। কারণ, মরু হাওয়ার দ্বারা ইতস্তত তাড়িত বালি ছাড়া সেখানে কোনো দিকে কোনো পথের চিহ্নই চোখে পড়ে না। এইমাত্র তুমি দেখতে পাবে এক জায়গায় বালির পাহাড় জমে আছে আরেটু পরেই সে পাহাড় জমবে আরেক জায়গায়। যারা সে পথে বহুবার যাওয়া আসা করেছে এবং যাদের উপস্থিত বুদ্ধি যথেষ্ট তারাই শুধু গাইডের কাজ করতে পারে। অতি বিস্ময়ের সঙ্গে আমি লক্ষ্য করছিলাম, আমাদের চালক বা গাইড ছিল এক চোক কানা, আরেক চোখে অসুক। কিন্তু তা হলেও সব পথই তার ভালভাবে জানা ছিল। আমরা এক শত সোনার মিকাল মজুরী দিয়ে তাশিফ নিয়োগ করেছিলাম। সে ছিল মাসুফার বাসিন্দা। তাসারাহ্লা থেকে যাত্রার সপ্তম দিন রাত্রে আমাদের যারা এগিয়ে নিতে এসেছে তাদের দ্বারা প্রজ্জ্বলিত আগুন আমাদের চোখে পড়ল, আমরা আনন্দে উফুল্ল হয়ে উঠলাম।
এভাবে সিজিলমাসা থেকে যাত্রা করে দু’মাসের একদিন বাকি থাকতে আমরা ইবাদাতা (ওয়ালাতা) এসে পৌঁছলাম।৬ ইবালাতান প্রদেশটি কাফ্রীদেশের উত্তর সীমান্তে অবস্থিত। এখানে সুলতানের প্রতিনিধি ছিলেন ফারবা হোসেন নামে একটি ব্যক্তি। সেখানকার ভাষায় ‘ফারবা’ শব্দের অর্থই প্রতিনিধি বা ডেপুটি। সেখানে পৌঁছবার পরে আমাদের সঙ্গী সওদাগরেরা একটা ভোলা ময়দানে কৃষ্ণকায় লোকদের পাহারায় মালবিও রেখে ফারবার সঙ্গে দেখা করতে গেল। একটি খিলানের নীচে গালিচা বিছিয়ে তিনি বসেছিলেন। তার সামনে রয়েছে বর্শা ও তীরধারী রক্ষীর দল, পিছনে দণ্ডায়মান মাসুফাঁদের প্রধান ব্যক্তি। ফারবা যখন কথা বলছিলেন সওদাগররা তখন দণ্ডায়মান অবস্থায় ছিল। যদিও তারা খুব কাছেই ছিল তবু ফারবা তাদের প্রতি তাচ্ছিল্য দেখাবার জন্য কথা বলছিলেন একজন দোভাষীর মাধ্যমে। তাদের এ অভদ্রতা দেখে এবং শ্বেতকায়দের প্রতি ঘৃণার ভাব লক্ষ্য করে ঠিক তখনই আমার অনুতাপ হয়েছিল এদেশ সফরে এসেছি বলে।
ইব্নে বাদ্দা নামক সালার (সালি, রাবাট) একজন গণ্যমান্য লোকের সঙ্গে আমি দেখা করতে গেলাম। আমি তাকে পত্র দিয়েছিলাম আমার জন্য একটি বাড়ী ভাড়া করবার অনুরোধ জানিয়ে। তিনি সে অনুরোধ রক্ষা করেছিলেন। অতঃপর ইবাদাতানের মাসা জু নামক মুশরিফ’ বা পরিদর্শক (Inspector) আমাদের কাফেলার সবাইকে তার আতিথ্য গ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ করলেন। সে আমন্ত্রণে যোগ দিতে প্রথমে আমি নারাজ ছিলাম কিন্তু সঙ্গীদের সানুনয় অনুরোধ এড়াতে না পেরে তাদের সঙ্গে যেতে হল। প্রকাণ্ড একটি পাত্রের আকারে কাটা একটি লাউয়ের খোলের অর্ধাংশে আমাদের খাবার পরিবেশন করা হল সামান্য মধু আর দুধ মিশ্রিত জোয়ার চুর্ণ(Pounded millet)। অতিথিরা তাই পান করে ফিরে এল। আমি তাদের বললাম,”এ জন্যই কৃষ্ণকায় ব্যক্তি বুঝি আমাদের দাওয়াত করেছিল?”
