৪। স্থানটি এখনো তার বিকৃত আরবী নাম দিনামার কিম্বা আদিনামার রক্ষা করে চলেছে। স্থানটি বেশ সুন্দর এবং লোক-সমাগমে মুখর। এটা গ্রানাডার নিকটবর্তী (স্পেনে মুসলিম রাজত্বের ইতিহাস, ১ম খণ্ড, ৩৪৯)।
৫। সুলতান আবুল হাজাজ ইউসুফ প্রথম ইনি ছিলেন গ্রানাডার নারিদ রাজত্বের সপ্তম শাসক। এর রাজত্ব কাল ১৩৩৩ থেকে ১৩৫৪ পর্যন্ত। অন্য সব লেখকের গ্রন্থে তার রোগের প্রকৃতি বৃিত হয়েছে বলে দেখা যায় না। যেহেতু ইব্নে বতুতা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি, সেজন্য মনে হয় তিনি আল হামরার অভ্যন্তর ভাগ দেখেননি। অন্য সব সমকালীন প্রাসাদের তুলনায় আহামরার গাঠনিক বৈশিষ্ট সম্বন্ধে তার মতামত জানতে পারলে সেটা খুব উপাদেয় হতো।
৬। একটি পাণ্ডুলিপিতে যে বিরা নামক স্থানটি পরিদৃষ্ট হচ্ছে সেটা মুদ্রিত গ্রন্থের টিরা অপেক্ষা অধিক গ্রহনীয়। টিরা নামক কোনো স্থানের উল্লেখ কোনো স্পেনীয় আরবী গ্রন্থে দেখা যায় না। আল্-বিরা হচ্ছে পুরাকালের এবিরা-মুরদের যুগে এর স্থান দখল করেছিল গ্রানাডা। বর্তমানে এটা গ্রানাডা থেকে পনেরো মাইল পশ্চিমে। ইব্নে বতুতা স্থানটিকে দেখলেন ধ্বংসাবস্থায়। এ ধ্বংসের কারণ ছিল বোধহয় এবিরার যুদ্ধ। এ যুদ্ধে মুসলিমগণ। ক্যাষ্টিলিয়ানদেরকে ১৩১৯ খ্রীস্টাব্দে পরাস্ত করেন। সম্ভবতঃ শহরটি পরবর্তীকালে পুনঃ নির্মিত হয়েছিল। কেন না গ্রানাডার বিরুদ্ধে ফার্ডিনাণ্ডের শেষ অভিযানের ইতিহাসে এটার উল্লেখ দেখা যায়। ১৪৮৬ খ্রীষ্টাব্দে এ শহরটি তিনি অধিকার করেন (প্যাসকুয়াল দ্য গেয়াংগোস, ২য় খণ্ড, ৩৫০-১, ৩৭৭; মাক্কারি, ২য় খণ্ড, ৮০৫; আল ওমারি, দেমোমবাইন্দ অনুদিত, ২৪৫ পৃঃ)।
৭। ধাওয়ান কিম্বা আওয়ানকে একটি গ্রাম বলে বর্ণনা করেছেন একজন প্রথম যুগের লেখক। এ স্থানটি হচ্ছে মালাকার পশ্চিমে এবং ১৪৮৫ খ্রীস্টাব্দে ফার্ডিনাও কর্তৃক স্থানটি অধিকৃত হওয়ার সময়ে এর বর্ণনা দেওয়া হয়েছে একটি বৃহৎ জনবহুল দূর্গবেষ্টিত শহর রূপে (ইব্নে আল্-আবার, তামিলা, ৩৪৮; পি দ্যা গেয়াঙ্গোস, ২য় খণ্ড, ৩৭৪; মাক্কারি, ২য় খণ্ড, ৮০৩)।
৮। মারকুশের প্রতিষ্টা হয়েছিল ১০৭৭ খ্রীস্টাব্দে আমুরভিদ রাজত্বের রাজধানী রূপে। ইদ্রিসির বিবরণ অনুসারে শহরটির দৈর্ঘ্য ছিল এক মাইল এবং তার প্রস্থও ছিল প্রায় অনুরূপ। শহরের যে প্রাচীর এখনো বর্তমানে রয়েছে তার দৈর্ঘ্য প্রায় সাত মাইল। ম্যারিনিদৃগণ কর্তৃক এর অবরোধ এবং অধিকারের এবং রাজধানী ফেজে স্থানান্তরিত হওয়ার ফলে শহরটি ধ্বংসমুখে পতিত হয়। এখানকার কুতুবিয়া মজিদের মিনার এখনো বর্তমান রয়েছে এবং মুর-শিল্পের শ্রেষ্ঠ কীর্তি রূপে এটা এখনো প্রশংসিত।
১৪. কাফ্রীদের দেশে
চৌদ্দ
মারাকুশ থেকে ফেজ অবধি সফর করলাম আমাদের সুলতানের পারিষদবর্গের সঙ্গে। সেখান থেকেই সুলতানের কাছে বিদায় নিয়ে কাফ্রীদের দেশে (Negrolands) রওয়ানা হয়ে পৌঁছলাম সিজিলমাসা শহরে। শহরটি চমৎকার। প্রচুর সুস্বাদু খেজুর পাওয়া যায় এখানে ১। এখানকার খেজুরের প্রাচুর্যের তুলনা চলে বার খেজুরের সঙ্গে কিন্তু এখানকার খেজুর অপেক্ষাকৃত উত্তম এবং ইরার নামক যে খেজুর আছে দুনিয়ার কোথাও তেমন খেজুর পাওয়া যায় না। এখানে আমি সুপণ্ডিত আবু মোহাম্মদ আল বুশরীর সঙ্গে বসবাস করলাম। এ আল-বুশরীর ভাইয়ের সঙ্গেই চীনের কাজান শহরে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল। কি আশ্চর্যজনকভাবে তারা দু’জন দু’জায়গায় পড়ে আছেন। তিনি আমাকে যথেষ্ট সমাদর করেছিলেন।
সিজিলমাসায় আমি কয়েকটি উট খরিদ করলাম। সেগুলির জন্য চার মাসের উপযোগী খাদ্যও খরিদ করে নিলাম। তারপর ৭৫২ হিজরীর ১লা মোহরম (১৮ই ফেব্রুয়ারী, ১৩৫২) আবার এক কাফেলার সঙ্গে পথে বেরিয়ে পড়লাম। অন্যান্য লোক ছাড়া এ কাফেলায় সিজিসমাসের কয়েকজন সওদাগর ছিলেন। পঁচিশ দিন পথ চলার পর তাগাঁজা নামক নগণ্য একটি গ্রামে এসে আমরা পৌঁছলাম। এ গ্রামের অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য এই যে, এখানকার মসজিদ ও ঘরগুলি লবণের পাথর (Blocks of salt) দিয়ে তৈরী, ছাদ তৈরী উটের চামড়া দিয়ে। সেখানে গাছপালা নেই, আছে বালি আর বালি। বালির মধ্যে রয়েছে লবণের একটি খনি। খনি খনন করতে গিয়ে তারা লবণের স্থল খণ্ডগুলি এভাবে পায় যেনো যন্ত্রের সাহায্যে চৌকোণাকার করে কেউ একটির পর একটি খণ্ড মাটির নীচে খনির ভিতর সাজিয়ে রেখেছে। একটি উট এ রকম দু’টি খণ্ড (Slab) মাত্র বহন করতে পারে। মাসুফা উপজাতীয় ক্রীতদাসরা ছাড়া তাগাঁজায় আর কেউ বাস করে না। তারা খনি খননের কাজ করে এবং জীবন ধারণ করে দারা ৩ ও সিজিলমাসা থেকে আমদানী করা খেজুর, উটের গোশত ও কাফ্রী দেশের জোয়ার (Millet) খেয়ে। নিজেদের দেশ থেকে কাফ্রীরা এখানে এসে লবণ নিয়ে যায়। ইবালানে এক বোঝা লবণের দাম আট থেকে দশ মিকাল (Mithqals)। সে পরিমাণ লবণই মাল্লী শহরে। বিক্রি হয় বিশ থেকে ত্রিশ মিঙ্কালে–এমন কি সময় বিশেষে চল্লিশ মিত্কাল অবধি দাম ওঠে। সোনা রূপার বিনিময়ে যেমন অন্যান্য দেশে জিনিষ কেনাবেচা হয় কাফ্রীরা তেমনি লবণের বিনিময়ে কেনাবেচা করে। লবণের বড় খণ্ডগুলিকে তারা টুকরো করে কেটে তার সাহায্যে কেনাবেচার কাজ চালায়। তাগাঁজা নগণ্য শহর হলেও ব্যবসায়ে এখানে যা লাভ হয় তার পরিমাণ শত শত মণ স্বর্ণরেণুর ৪ সমান।
