মালাকায় পৌঁছে কাজীকে দেখলাম মসজিদে বসে আছেন কিছু সংখ্যক আইনজীবি ও শহরের গণ্যমান্য লোকজন নিয়ে। তারা সবাই পূর্বোক্ত বন্দীদের মুক্তিপণ দিবার জন্য অর্থ সংগ্রহ করছেন। আমি তাকে বললাম, “খোদাকে অশেষ ধন্যবাদ যিনি আমাকে বন্দীদের দশা থেকে রক্ষা করেছেন। ঘোড়সওয়াররা রওয়ানা হয়ে আসবার পর যা-কিছু ঘটেছে তাকে বললাম। সব শুনে তিনি খুব বিস্ময়-বোধ করলেন। তিনি এবং শহরের ইমাম আমাকে অতিথ্য-উপঢৌকন পাঠিয়েছিলেন।
মালাকার পর আমি চব্বিশ মাইল দূরে বাল্লাশ (ভেলেজ) শহরে এলাম। বাল্লাশও সুন্দর শহর। এখানে চমৎকার একটি মসজিদ আছে। মালাকার মত এখানেও প্রচুর আঙ্গুর, ডুমুর জাতীয় ফল ও অন্যান্য ফল-মূল পাওয়া যায়। সেখান থেকে আমরা এলাম আল্ হামমা (আলহামা) শহরটি ছোট হলেও এখানকার মসজিদটি মনোরম একটি জায়গায় অবস্থিত। শহরের কাছেই, প্রায় মাইল খানেক দূরে নদীর পারে আছে একটি উষ্ণ প্রস্রবণ (তার থেকেই এ শহরের নাম করণ হয়েছে আল হাম্মা)। এখানে পুরুষদের জন্যে একটি এবং মেয়েদের জন্যে একটি গোসলখানা আছে।
সেখান থেকে আমরা পৌঁছলাম গারণাটা (গ্রানাডা)। আন্দালুসিয়ার প্রধান নগর গ্রানাডা সব শহরের রাণী। গ্রানাডার শহরতলীও এত সুন্দর যে দুনিয়ার কোনো দেশের সঙ্গে তুলনা হয় না। প্রায় চল্লিশ মাইল বিস্তৃত এ শহরতলীর ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে বিখ্যাত সান্নিল (জেনিল) নদী এবং আরও বহু শহর। শহরের চারদিক ঘিরে রয়েছে ফুলফলের বাগান শস্যশ্যামল মাঠ, সুরম্য অট্টালিকা ও আঙ্গুর ক্ষেত। সবচেয়ে সুন্দর যে সব জায়গা তার ভেতর উল্লেখযোগ্য হলো আইন-আদ-দামা (অশ্রু ঝরণা) –ফলফুলের বাগানে ঘেরা একটি পাহাড়। অন্য কোনো দেশে তার সমতূল্য জায়গা দেখা যায় না। আমি যখন গারণাটায় যাই তখন সুলতান ছিলেন আবদুল হাজ্জাজ ইউসুফ। তিনি তখন অসুখে ভুগছিলেন বলে আমি তার সঙ্গে দেখা করিনি ৫। তার মহীয়সী পুণ্যবতী মাতা আমাকে কিছু স্বর্ণ দিনার উপহার দিয়েছিলেন। আমি তার সদ্ব্যবহার করেছি।
গারণাটায় কিছু সংখ্যক বিখ্যাত পণ্ডিত ব্যক্তি ও প্রধান শেখের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ আমার হয়েছিল। প্রধান শেখ সেখানকার সুফী সম্প্রদায়ের প্রধান। গারণাটা শহরের বাইরে তার আস্তানায় আমি কয়েকদিন তার সহবাসে কাটাই। তিনি আমাকে বিশেষ সমাদর করেন এবং আমার সঙ্গে বিখ্যাত অতিথিশালায় আল্-আকাব (ঈগল পাখী)ঘাটী দেখতে যান। আল-আকাব একটি পাহাড়। শহর থেকে আট মাইল দূরে এ পাহাড়ের উপর থেকে গারণাটার আশপাশ দেখা যায়। আল-আকাবের কাছেই রয়েছে আল্-বেরা শহরের ধ্বংসাবশেষ। পারস্য-সূফী মতাবলম্বী একজন দরবেশও গারণাটায় রয়েছেন। তাদের নিজ-নিজ দেশের সঙ্গে সাদৃশ্য আছে বলে তারা এখানে ঘর বাড়ী তৈরি করে বসবাস করেছেন। একজন এসেছেন সমরখন্দ থেকে, আরেকজন তাব্রিজ ও তৃতীয় জন কুনিয়া (কনিয়া) আরেক জন খোরাশান, দু’জন হিন্দুস্তান ইত্যাদি।
গারণাটা থেকে ফেরবার পথে আবার আল-হামা বাব্বাশ ও মালাকা হয়ে ঢাকওয়ান কেল্লায় এলাম। প্রচুর পানি গাছপালা ও ফলমূলে সমৃদ্ধ চমৎকার জায়গা ঢাকওয়ান। ঢাকওয়ান ছেড়ে এলাম রন্ডা, রন্ডা থেকে জিব্রালটার। জিব্রালটারে একটি জাহাজে উঠলাম। এ জাহাজটির সাহায্যে আগেও আমি পার হয়েছিলাম। আর্সিলার (আরজিলা) অধিবাসীরা এ জাহাজের মালিক। আমি সাবটা (সিউটা) হয়ে এলাম আসিলা। আসিলায় কয়েক মাস কাটালাম। সেখান থেকে রওয়ানা হয়ে এলাম সালা (সালি)। সালা থেকে এলাম মারাকুশ শহরে। বিশালায়তন মারাকুশ একটি সুন্দর শহর। এখানে কয়েকটি মনোরম মসজিদ রয়েছে। প্রধান মসজিদটি কুতুবাইন মসজিদ বা পুস্তক-বিক্রেতাদের মসজিদ নামে পরিচিত। এখানে একটি সুউচ্চ মিনার রয়েছে। সেই মিনারে আরোহন করায় সারা শহরটি আমার দৃষ্টি গোচর হল। শহরের বেশী অংশই এমনভাবে ধ্বংসের কবলে পড়েছে যে বাগদাদের সঙ্গে এর তুলনা চলে। অবশ্য বাগদাদের বাজারগুলো অপেক্ষাকৃত ভাল ৮। মারাকুশেও সুবৃহৎ একটি কলেজ আছে। সুন্দর পরিবেশে সুদৃঢ়ভাবে গঠিত এ কলেজটি। আমাদের খলিফা আমির-উল-মোমেনিন আবুল হাসান (মরক্কোর ভূতপূর্ব সুলতান) এ কলেজের স্থাপয়িতা।
***
টিকা
পরিচ্ছেদ ১৩
১। একাদশ আলফন্সস এবং জিব্রন্টারের অবরোধ সম্বন্ধে ১২ পরিচ্ছেদ এবং ৪ টীকা দ্রষ্টব্য। এ পরিচ্ছেদের অস্বাভাবিক তিক্ত সুরে প্রতিবিম্বিত হয়েছে মুর এবং স্টেনিয়ার্ডদের সে সময়ে মেজাজ ও মনোবৃত্তি যা তাদেরকে উদ্ধৃদ্ধ করেছিল আন্দালোসিয়া পুনরায় জয় করার সময়ে। এবং পরবর্তী শতাব্দী কালে।
২। ইদ্রিসিতে সুহেইল নামক স্থানের উল্লেখ নেই। মাকারি’তে একে বর্ণনা করা হয়েছে মালাকার পশ্চিমে অসংখ্য গ্রাম নিয়ে গঠিত একটি বৃহৎ জেলা রূপে (১ম খণ্ড, ১০৩)। এর ভিতরে রয়েছে সুহেইল পর্বত এবং এটাই আন্দালুসের একমাত্র পর্বত। এখান থেকে দেখা যায় সুহেইলের কনাষ্টিলেশন (Conopus)। ইব্নে বতুতার বর্ণনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে স্থানটি হচ্ছে মারবেলা এবং মালাগারের মধ্যভাগে উপকূলের বিস্তৃতি।
৩। আল-হাম্ম, অর্থাৎ উষ্ণপ্রস্রবণ, কিম্বা থার্মা। এটা একটি স্থানের নাম। সমস্ত আরব দেশগুলিতে প্রায়ই এ নামের ব্যবহার দেখা যায়। ইব্নে বতুতার একজন সমসাময়িক ব্যক্তি এ শহর সম্পর্কে বলেছেনঃ “আলহাম্মার বুর্গ অবস্থিত রয়েছে একটি পর্বতের চূড়ায়। যারা সমস্ত পৃথিবী ভ্রমন করেছেন তারা বলছেন এ শহরের নির্মাণ কার্যের দৃঢ়তা এবং এর পানির উষ্ণতার সঙ্গে পৃথিবীর অন্য কোনো স্থানের তুলনা হয় না। সমস্ত অঞ্চল থেকে রোগীগণ এখানে আসে এবং রোগ নিরাময় না হওয়া পর্যন্ত তারা এখানেই অবস্থান করে। বসন্তকালে আল্ মেরিয়ার অধিবাসীগণ সেখানে যান তাদের স্ত্রী এবং পরিজনদের নিয়ে এবং খাদ্য ও পানীয় দ্রব্যের উপরে যথেষ্ট ব্যয় করে থাকেন।” (মাসালিক আল্-আবসার)।
