বিশ বৎসরেরও অধিককাল খ্রীষ্টানদের দখলে থাকবার পরে আমাদের ভূতপূর্ব অধিপতি আবুল হাসান জিব্রাল্টার পূর্নদখল করেন। বিপুল অর্থ ও শক্তিশালি সেনাদলসহ তিনি তাঁর পুত্র শাহজাদা আবু মালিককে পাঠান জিব্রাল্টার অবরোধের জন্য। ছ’মাস অবরোধের পর ৭৩৩ হিজরী (খৃঃ পৃঃ ১৩৩৩) জিব্রাল্টার দখল করা হয়। জিব্রাল্টার তখন বর্তমান অবস্থায় ছিল না। আমাদের ভূতপূর্ব অধিপতি আবুল হাসান। দূর্গশীর্ষে প্রকাণ্ড একটি সুরক্ষিত গৃহ নির্মাণ করেন। পূর্বে এখানে ছিল ছোট একটি মিনার মাত্র এবং তাও ক্ষেপণযন্ত্রের সাহায্যে নিক্ষিপ্ত প্রস্তরের আঘাতে ধ্বংস প্রাপ্ত হয়। সে-ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থানেই তৈরী হয় এ নূতন সুরক্ষিত এমারত। এখানকার আয়ুধাগারটিও ‘তার তৈরী। কারণ এখানে আগে কোন আয়ুধাগার ছিল না। এ ছাড়া, লাল পাহাড় আবেষ্টনকারী প্রকাণ্ড প্রাচীরটি, যা আয়ুধাগার থেকে টালির উঠান অবধি বিস্তৃত, তিনিই তৈরী করান। পরবর্তী কালে আমাদের খলিফা আবু ইনান (রাঃ) পুনরায় এর সুরক্ষণ ও শোভাবর্ধনের কাজ নিজ হাতে গ্রহণ করেন ও পাহাড় পর্যন্ত প্রসারিত প্রাচীরটি সুদৃঢ় করেন। এ প্রাচীরটিই সবচেয়ে সুদৃঢ় এবং প্রয়োজনীয়। তিনি সেখানে বিপুল পরিমাণ যুদ্ধোপকরণ ও খাদ্য সামগ্রীও সরবরাহ করেন। তিনি এভাবে তার কর্তব্য সম্পাদন করে খোদার প্রতি তার অসীম আনুগত্যের পরিচয় দান করেন। জেবেলের ব্যাপারে তার এতদূর আগ্রহ ছিল যে, তিনি জেবেল তারিক বা জেবেল পর্বত শৃঙ্গের একটি মডেলে তৈরী করতে হুকুম দেন। সেই মডেলে জেবেলের প্রাচীর, মিনার, কিল্লা, প্রবেশদ্বার, আয়ুধাগার, মসজিদ, বারুদাগার, শস্যভাণ্ডার প্রভৃতি সবই হুবহু দেখানো হয়। তার আকৃতিও লেবেলের মতোই করা হয়। এবং তাতে রেল মাউণ্ড বা লাল পাহাড়টিও দেখানো হয়। মডেলটি প্রাসাদের এক প্রান্তে অবস্থিত। এটি একটি অবিকল অনুকরণ ও নিখুঁত শিল্পনৈপুণ্যের নিদর্শন। জেবেল দেখে এলে যে ব্যক্তি এ মডেলটি দেখেছে সেই শুধু এর মূল্য বুঝতে পারে। জেবেলে কখন কি ঘটছে না-ঘটছে তা জানবার এবং জেবেলকে শক্তিশালি করা ও প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা করার আগ্রহেই তিনি এ মডেলটি এভাবে তৈরী করান। সর্বশক্তিমান খোদা তার অছিলায় পশ্চিম উপদ্বীপে (স্পেন) ইসলামকে বিজয়ী করুণ এবং তাঁর যে আদেশ ছিল, তিনি বিধর্মীদের দেশ অধিকার এবং ক্রুশ পূজারীদের শক্তি হ্রাস করবেন, সে আশাও ফলবতী হোক।”
আমাদের শেখের বিবৃতি আবার শুরু হল। জিব্রাল্টারের বাইরে আমি রন্ডা শহরে এলাম। রপ্তা অতি সুন্দর জায়গায় অবস্থিত মুসলমানদের একটি সুদৃঢ় কেল্লা। এখানকার কাজী ডাক্তার আবুল কাসিম মোহাম্মদ বিন এয়াহিয়া ইব্নে বতুতা আমার খুল্লতাত ভাই। রাস্তায় পাঁচ দিন কাটিয়ে আমি এলাম মারবালা (মারবেল্লা) শহরে। এই দুটি শহরের মধ্যবর্তী চলাচলের রাস্তাটি অত্যন্ত বন্ধুর ও দুর্গম। একটি উর্বর জেলায় অবস্থিত মারবালা সুন্দর ছোট শহর। সেখানে গিয়ে একদল ঘোড় সওয়ারকে পোলাম মালাকা যাওয়ার জন্য তৈরি। আমিও তাদের সঙ্গেই রওয়ানা হবার ইচ্ছা করেছিলাম কিন্তু খোদা সে যাত্রা আমাকে রক্ষা করলেন। তারা আমার আগেই রওয়ানা হয়ে গিয়েছিল এবং পথে শক্রর হাতে বন্দী হয়েছিল। সে বিবরণ পরে বলছি।
ঘোড় সওয়ারদের পরে রওয়ানা হয়ে আমি যখন মারবালা জেলা ছাড়িয়ে সুহাইল ২ জেলার সীমান্তে গিয়ে পৌচেছি তখন দেখতে পেলাম রাস্তার পাশের একটি গর্তে একটা ঘোড়ার মৃতদেহ। আরও কিছুদূর এগিয়ে দেখলাম এক ঝাঁকা মাছ রাস্তায় ছড়িয়ে আছে। আমার মনে কেমন সন্দেহের উদ্রেক হল। সামনেই ছিল একটা উঁচু মিনার যার উপর থেকে পাহারাদাররা চারদিকে নজর রাখত। আমি আপন মনেই বলে উঠলাম, “যদি কোনো শত্রুর আক্রমণের ভয় থাকে এখানে তাহলে মিনারের পাহারাওয়ালা আমাকে হুঁশিয়ার করে দেবে।” তারপর কাছেই একটা বাড়ীতে গিয়ে দেখলাম একটা ঘোড়াকে মেরে রাখা হয়েছে সেখানে। আমি যখন সেখানে আছি তখন একটা চীৎকার শুনতে পেলাম আমার পেছনে (আমি দলের লোকদের ছেড়ে তখন অনেক দূর এগিয়ে গেছি)। পিছন ফিরে দেখতে পেলাম, তাদের সঙ্গে রয়েছেন সুহাইল দূর্গের সেনাপতি। তিনি। আমাকে জানালেন, শত্রুপক্ষের চারখানা ক্ষুদ্র জাহাজ সেখানে পৌচেছে। মিনারে যখন। পাহারাদার ছিল না তখন কিছু সংখ্যক লোকও জাহাজ থেকে নেমেছে। মারবালা থেকে যে বারো জন ঘোড়সওয়ার এসেছিলো তাদের সঙ্গে মোকাবেলা করেছে এই আক্রমণকারীরা। খৃষ্টানরা একজনকে হত্যা করেছে, একজন গেছে পালিয়ে। বাকি দশজন হয়েছে বন্দী। সে সঙ্গে তারা একজন জেলেকেও হত্যা করে। সেই জেলের। মাছের চুপড়ীই আমি পথের পাশে পড়ে থাকতে দেখেছি।
অফিসারটি তার বাসায় আমাকে রাত কাটাতে পরামর্শ দিলেন। তাহলে তিনি পরে আমাকে মালাকা পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করবেন। ঘোড়সওয়ার সীমান্ত রক্ষীদের কেল্লায় আমি রাত কাটালাম। তারা সুহাইল বাহিনী নামে পরিচিত। যে ক্ষুদ্র জাহাজগুলির কথা বলেছি সেগুলো তখনও ওখানেই ছিল। পরের দিন তিনি ঘোড়ায় চড়ে আমার সঙ্গে রওয়ানা হলেন এবং আমরা যথাসময়ে মালাকা গিয়ে পৌঁছলাম। মালাকা আন্দালুসিয়ার অন্যতম সুন্দর ও বড় শহর। সমুদ্রের এবং স্থলভাগের উভয় প্রকার সুবিধাই এ শহরটির রয়েছে। তাছাড়া ফলমূল ও খাদ্য সম্ভারও এখানে প্রায় পাওয়া যায়। আমি দেখলাম এখানকার বাজারে একটি ছোট দেরহামের বিনিময়ে আট পাউণ্ড আঙ্গুর বিক্রি হচ্ছে। এখানকার পদ্মরাগ সদৃশ লাল মার্সিয়ান আনারের তুলনা দুনিয়ায় বিরল। তা ছাড়া ডুমুর জাতীয় ফল ও বাদাম মালাকা এবং মালাকার উপকণ্ঠ থেকে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দেশসমূহে প্রচুর চালান হয়ে যায়। মালাকায় গিল্টি করা প্রচুর। হাঁড়ি-বাসন তৈরি হয় এবং সে সবও দূর-দূরাঞ্চলে চালান হয়। বিস্তৃত পরিধি বিশিষ্ট এর মসজিদটির পবিত্রতার যথেষ্ট সুনাম আছে। মসজিদের চত্বরটি সৌন্দর্যে অতুলনীয়। চত্বরে কমলা লেবুর কয়েকটি সুউচ্চ গাছ রয়েছে।
