সিরিয়ায় ফল প্রচুর পাওয়া যায় কিন্তু পাশ্চাত্য দেশে ফলের দাম অপেক্ষাকৃত সস্তা। সেখানে এক দেরহাম নাকরায় পাওয়া যায় এক পাউণ্ড আঙ্গুর (তাদের এক পাউণ্ড পাশ্চাত্যের তিন পাউণ্ডের সমান)। দাম যখন সেখানে সস্তা হয় তখন এক দেরহাম নাকরায় দু পাউণ্ড পাওয়া যায়। একটি ডালিম বা নাশপাতি জাতীয় ফলের দাম আট ফল (তাম্রমুদ্রা) যা আমাদের এক দেরহামের সমতুল্য। এক দেরহাম নারায় যে পরিমাণ শাকসব্জী পাওয়া যায় তার চেয়ে আমাদের দেশের ছোট দেরহামের কেনা শাকসব্জীর পরিমাণ বেশী। সিরিয়ার এক পাউণ্ড পরিমাণ মাংস সেখানে বিক্রি হয় আড়াই দেরহাম নাকরায়। এসব বিবেচনা করলে সহজেই বুঝা যাবে, পাশ্চাত্যে জীবিকা নির্বাহের ব্যয় স্বল্প, সেখানে ভাল জিনিসের প্রাচুর্য আছে এবং বসবাস করা। আরামদায়ক ও সুবিধাজনক। অধিকন্তু আমির-উল-মোমেনিনের দৌলতেও পাশ্চাত্যের সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্ব বৃদ্ধি করেছেন।২১
***
টিকা
পরিচ্ছেদ ১২
১। সিন্দবাদ কাহিনীর কল্যাণে রুস্ শব্দটি ইউরোপে যথেষ্ট পরিচিত। কাজেই এটার ব্যাখ্যা নিষ্প্রয়োজন। এই বিপুলকায় পাখির গল্পের মূল উৎস কি, সে সম্বন্ধে ইউ মার্কোপলোর বিবরণের দীর্ঘ আলোচনা করেছেন (২য় খণ্ড, ৪১৫-২০)। দু একজন আরবী লেখক এ ব্যাপারে। ইতিপূর্বে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, এবং দেখা যাচ্ছে ইব্নে বতুতা এ সম্বন্ধে বেশ বিবেচকের মতো কোনো মত প্রকাশ করেননি। মরীচিকা বা অস্বাভাবিক আলোক প্রতিসরণের দ্বারা এই ব্যাপক প্রচলিত গল্পকে চালু করার ব্যাপারটি সম্বন্ধে তার বর্ণনায় অবশ্য ইঙ্গিত রয়েছে।
২। কুরেয়াত (করিয়াত) এখনো আমাদের মানচিত্রে দেখা যায়। শাবা এবং কাবা অন্ততঃ এ রকম নামে দেখা যাচ্ছে না তবু মনে হয় স্থান দুটি বর্তমান রয়েছে। কেননা ওমান উপকূলে এখনো একটি ধারাবাহিক গ্রামশ্রেণী রয়েছে।
৩। কারাজ বা কারজিন ঠিক সাক্কান (মুখ) নদীর তীরে কিছুটা পূর্বমুখী বাঁকে অবস্থিত। ইব্নে বতুতার পথ এ স্থান থেকে সিরাজ পর্যন্ত নদীর উপত্যকার উপরের দিকে। বাসা (ফাসা) এবং শিরাজের মাঝখানের পথে ছিল খাওরিস্তান শহর-এটাই সম্ভবতঃ ইব্নে বতুতার কাউরেস্তান (৩য় খণ্ড, ২২ টীকা দ্রষ্টব্য)।
৪। ১৩৪০ খ্রীষ্টাব্দে মুর সুলতান আবু হাসান স্পেনের অভ্যন্তরে সসৈন্য অভিযান করেন এবং তারিফার নিকটবর্তী রিয়ো স্যালাডু নামক স্থানে ক্যান্টিলের একাদশ আস্ সোর কাছে সেই একই বছরের ৩০শে অক্টোবর সম্পূর্ণ পরাজিত হন। আল ফসো ১৩৪২ খ্রীষ্টাব্দে আজেসিরাস অধিকার করে তার বিজয় সম্পন্ন করেন, কিন্তু বিভ্রাল্টার পুনঃ অধিকারের চেষ্টায় ১৩৫০ খ্রীষ্টাব্দে তিনি মৃত্যু বরণ করেন। সে সময়ের ব্রিাল্টার অবরোধের বিবরণ ইব্নে বতুতা তার পরবর্তী পরিচ্ছেদে উল্লেখ করেছেন।
৫। শেখ হাসান এবং সুলতান আবু সাইদের মাঝখানের সম্পর্ক ইব্নে বতুতা ইতিপূর্বেই বর্ণনা করেছেন (উপরের ১০০ পৃষ্ঠায়)। এই বড় শেখৃ হাসান আমির চুবানের পৌত্র ছোটো শেখ হাসানের সঙ্গে আট বছরের সশ্রামের পর জালাইর কিম্বা ইলকানি রাজত্ব স্থাপন করেন এবং পনেরো শতাব্দীর প্রথম দিকের বছরগুলি পর্যন্ত তারা ইরান এবং আজরবাইজান শাসন করেন।
৬। হিটু এবং আনা এখনো আমাদের ম্যাপে দেখা যায়। বাগদাদের উত্তর-পশ্চিমে ইউক্রেট নদীর তীরে অবস্থিত। হাদিজা, এখন কালাত হাবুলিয়া বলে অভিহিত। এটা আনার ৩৫ মাইল নিয়ে ছিল। এবং আনুবার ছিল পূর্বে ইরাকের অন্যতম একটি প্রধান নগর হিটের কিছু দূর নিমে ইসা খালের মাথায়। এটা হচ্ছে নৌ-চলাচল উপযোগী অন্যতম প্রথম খাল। এই খাল দ্বারা যুক্ত হয়েছে ইউফ্রেটের সঙ্গে তাইগ্রিস। ঘন লোকবসতী এবং বিপুল পরিমাণ ফলের জন্য হিট জেলা ছিল বিখ্যাত।
৭। রাহুবার অবস্থান ইউক্রেটের সঙ্গে যুক্ত কাবুর নদীর সম্মিলন স্থানের আঠারো মাইল নিয়ে নদীর পশ্চিমে একটি খালের ধারে।
৮। সুন্ন হচ্ছে মধ্য ইউফ্রেটস্ এবং পামিরার মধ্যবর্তী পথের একটি স্টেশন। পামিরা থেকে প্রায় ৩৫ মাইল উত্তর-পূর্বে অবস্থিত।
৯। ১ম পরিচ্ছেদের ২৮ টীকা দ্রষ্টব্য।
১০। এখন তুরস্কের একটি বৃহৎ শহর।
১১। এই মারী হচ্ছে প্রসিদ্ধ মহামড়ক”। এ বছরের মধ্যে এই মহামারী মুসলিম জগতে অবর্ণনীয় ধ্বংস সৃষ্টি করে। মোঙ্গল এবং তৈমুরলঙের আগমন অপেক্ষা এই দুর্ঘটনা কম ভয়ঙ্কর ছিল না। ইব্নে বতুতার হিসাব খুব বেশী আতিশয্যাপূর্ণ নয়-অবশ্য কতকগুলি হিসাব খুব বেশী ধরা হয়েছে। ঐতিহাসিক ইব্নে খালদুনের বাবা এই মহামারীতে তিউনিসে মৃত্যুপ্রাপ্ত হন। তিনি বলেন, “এই সর্বগ্রাসী মহামারী জাতিগুলিকে ধ্বংস করে দিয়েছে, নিয়ে গিয়েছে এ যুগের বংশধরদের, সভ্যতার অনেক অপূর্ব সম্পদ লুপ্ত করে দিয়েছেন এবং প্রাসাদরাজী ধূলিসাৎ হয়েছে-পথ এবং পথের নির্দেশন হয়েছে নিশ্চিহ্ন…..এ যেন স্রষ্টা নিজে তার সৃষ্টিকে অধঃপাতের মাঝে আহ্বান করেছেন এবং পৃথিবী তা মেনে নিয়েছে।”
১২। মরক্কোর ম্যারিনিদ রাজত্ব। উপক্রমনিকা ১৯ পৃঃ দ্রষ্টব্য।
১৩। “শ” বতে এখানে নিঃসন্দেহে ক্রিস্টানদের মনে করা হয়েছে-কিন্তু বাক্যটিতে কোননাক্রমেই কোনো সংঘবদ্ধ সামুদ্রিক যুদ্ধের উল্লেখ নেই। সে সময়ে একমাত্র খ্রীষ্টান রাষ্ট্র। ছিল সিসিলি যার সঙ্গে তিউনিসের ভালো সম্পর্ক ছিল না। এর য়্যাড়মিড়াল রোজার ডোরিয়া। ১২৮৯ খ্রীস্টাব্দের দিকে জেরবা অধিকার করেছিলেন। ১৩৩৫ সালে অন্যান্য দ্বীপসহ মুসলিমগণ এ স্থানটি পূর্ণ দখল করেন এবং পরবর্তী যুগে সিসিলিয়ানগণ কর্তৃক দ্বীপটি অধিকারের জন্য ব্যর্থ চেষ্টা চলেছিল। এটা খুব সম্ভব যে জাহাজটি খ্রীষ্টান জলদস্যুদের হাতে পড়েছিল সে সব শতাব্দীতে (মাস ল্যট্রির মতে) এদের অত্যাচার বারবারি জলদস্যুদের অপেক্ষা ছিল বেশী ভয়ঙ্কর। (Relations of I Afrique septentrlonale, ১০৪-৭ পৃঃ দ্রষ্টব্য)।
