অতঃপর কায়রো এসে হাজির হলাম। সেখানে এসে শুনলাম প্লেগে মহামারীর সময় দৈনিক একুশ হাজার লোকও মরেছে।১১ কায়রো থেকে সাইদ (আপার মিশর) হয়ে এলাম আয়ধাব। সেখান থেকে জাহাজে উঠলাম জুদ্দায় যাবার জন্যে। জুদ্দা থেকে মক্কা এসে হাজির হলাম ৪৯ হিজরীর ২২শে শাবান (১৬শে নভেম্বর, ১৩৪৮) তারিখে।
এ বছরের হজব্রত (২৮শে ফেব্রুয়ারী-২রা মার্চ) পালন করে সিরিয়ার এক কাফেলার সঙ্গে তায়বা (মদিনা) পৌঁছলাম। সেখান থেকে জেরুজালেম ও গাঁজা হয়ে আবার ফিরে এলাম কায়রো। কায়রো এসে জানতে পারলাম, আমাদের খলিফা আবু ইনের প্রচেষ্টায় আল্লাহ্ মরোক্কোর মারিণ১২ বংশের বিচ্ছিন্ন লোকদের পুণরায় একতাবদ্ধ করেছেন। আমরা শুনলাম আবু ইনান দেশের ছোট বড় সকলের প্রতি এমন অনুগ্রহ দেখিয়েছেন যে আপাময় সকলেই তার আনুগত্য স্বীকার করতে উদগ্রীব হয়ে উঠেছে। একথা শুনে তার রাজধানী দেখবার ইচ্ছা জাগলো আমার অন্তরে। তাছাড়া নিজের গৃহের স্মৃতিও তখন আমার মনকে উতলা করে তুলেছে, প্রবল আকাঙ্ক্ষা। জেগেছে মনে নিজের বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনদের দেখতে এবং স্বদেশে ফিরে যেতে। কারণ, সে দেশের তুল্য আর কোন দেশই আমার চোখে কখনও পড়েনি।
তখন আমি একজন তিউনিসবাসীর ছোট একখানা সওদাগরী জাহাজে ৫০ হিজরীর সফর মাসে (এপ্রিল-মে, ১৩৪৯) রওয়ানা হয়ে জেরবা পৌঁছলাম। আমি সেখান নেমে রইলাম আর জাহাজ চলে গেলো তিউনিসের দিকে। সেখানে সে জাহাজ শত্রুর কবলে১৩ গিয়ে পৌঁছল। জেবরা থেকে ছোট একখানা নৌকায় আমি কাবি (গাবেস) পৌঁছে আবু মারওয়ান ও আবুল আব্বাস নামক প্রসিদ্ধ ভ্রাতৃদ্বয়ের আতিথ্য গ্রহণ করলাম। তারা জেরবাও গাবেসের শাসনকর্তা মকির পুত্র। আমি তাদের সঙ্গে হজরতের জন্মদিন ফাতেহা দোয়াজ দাহারম পর্ব (১২ই রবিউল আউয়াল মোতাবেক ৩১শে মে) উদযাপন করলাম।
অতঃপর সেখান থেকে নৌকাযোগে সাফাঁকাস (Sfax) এলাম এবং সমুদ্রপথে গেলাম বুলিয়ানা১৪। কয়েকজন আরবের সঙ্গে সেখান থেকে পব্রজে তিউনিস শহরে যখন পৌঁছি তখন আরবরা তিউনিস অবরোধ করেছে। তিউনিসে ছত্রিশ দিন কাটাবার পর কাতালানদের সঙ্গে জাহাজে উঠলাম। জাহাজ সারদানিয়া (সারাদিনিয়া) দ্বীপে গিয়ে। পৌঁছল। খৃষ্টান অধিকৃত দ্বীপের অন্যতম দ্বীপ সারদানিয়া। এখানে চমৎকার একটি পোতায় আছে। পোতাশ্রয়টি চতুর্দিক কাঠ দিয়ে ঘেরা, এক জায়গায় একটি দরজা। এদের অনুমতি পেলেই কেবল সে দরজা খোলা হয় ১৫। দ্বীপে সংরক্ষিত শহর আছে। তার একটিতে গিয়ে সেখানে আমরা অনেকগুলো বাজার দেখতে পেয়েছিলাম। দ্বীপের লোকেরা ষড়যন্ত্র করেছিলো,আমরা দ্বীপ ছেড়ে রওয়ানা হলে তারা আমাদের পিছু ধাওয়া করবে এবং ধরে এনে ক্রীতদাস করে রাখবে। তাই টের পেয়ে আমি খোদার কাছে মান করলাম, খোদা যদি নিরাপদে আমাদের এ দ্বীপ থেকে যেতে দেন তা হলে। একাদিক্রমে দুমাস রোজা রাখবো। পরে আমরা সেখান থেকে রওয়ানা হয়ে দশদিন পর তেনেস পৌঁছি, সেখান থেকে পৌঁছি মাজুনা, মাজুনা থেকে মুস্তাঘানিম (মোস্তাঘানেম) এবং তিলিম সান (তেল্মসেন)। আমি আল-উৰ্বাদ গিয়ে শেখ আবু মাদিনের১৬ কবর জেয়ারত করি। তিলিমসান ছেড়ে আমি নাদ্রমা সড়ক ধরে চলতে থাকি এবং সেখান থেকে আখান্দাকান্ সড়কে গিয়ে শেষ ইব্রাহিমের আস্তানায় গিয়ে একরাত কাটাই। সেখান থেকে রওয়ানা হয়ে আজগানগানের কাছে পৌঁছলে পঞ্চাশ জন পদাতিক এবং দু’জন অশ্বারোহী আমাদের আক্রমণ করে। তখন আমাদের সঙ্গে ছিলেন তানজিয়ারের হাজী ইব্নে কারিয়াত এবং তার ভাই মোহাম্মদ। মোহাম্মদ পরে সমুদ্রের বুকে শহীদ হন। আমরা তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করবো বলে স্থির করে নিশান উড়িয়ে দিলাম। তার ফলে তারা আমাদের সঙ্গে সন্ধি করলো এবং খোদাকে ধন্যবাদ যে তাদের সঙ্গেই আমরা অগ্রসর হলাম। তারপর আমরা তাজা শহরে গিয়ে পৌঁছি। সেখানে গিয়ে খবর পাই আমার মাতা প্লেগ রোগে এন্তেকাল করেছেন। পরম দয়ালু খোদা তার আত্মার শান্তি বিধান করুন। পরে তাজা থেকে রওয়ানা হয়ে ৭৫০ হিজরীর সাবান মাসের শেষে এক শুক্রবার (১৩ই নভেম্বর,১৩৪৯) রাজধানী শহরে ফেজে পৌঁছি।
ফেজে পৌঁছে আমি পরম দানশীল আমাদের ইমাম, আমিরুল মোমেনিন হজরত আল-মুতাওয়াক্কিল আবু ইমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম। খোদা তাঁর মহত্ব বৃদ্ধি করুণ এবং শত্রুকে দুর্বল করুণ। তার পদমর্যাদার কাছে ইরাকের সুলতানের পদমর্যাদা, সৌন্দর্যের কাছে ভারতের বাদশাহের সৌন্দর্য, সদগুণের কাছে ইয়ামেনের সুলতানের মহৎ চরিত্র, সাহসের কাছে তুকী সম্রাটের সাহস, দয়ার কাছে গ্রীক সম্রাটের দয়া, জ্ঞানের কাছে জাভার ম্রাটের জ্ঞান আমি ভুলে গেলাম। আমি তার গৌরবময় রাজ্যে এসে আমার সফর শেষ করলাম। আমি নিঃসন্দেহ যে এ দেশটি সর্বপ্রকারে সকল দেশের সেরা দেশ। কারণ এখানে প্রচুর ফল পাওয়া যায় এবং চলমান পানির স্রোত ও পুষ্টিকর খাদ্যদ্রব্য কখনও নিঃশেষ হয় না। একসঙ্গে এতোগুলো গুণের সময় খুব কম দেশেই ঘটেছে।
পাশ্চাত্যের দেরহাম ছোট হতে পারে কিন্তু তার ব্যবহারিক মূল্য অত্যন্ত বেশী। আপনি যখন মিশর ও সিরিয়ার দেরহামের মূল্যের সঙ্গে এখানকার দেরহামের মূল্যের তুলনা করবেন তখন আমার কথার সত্যতা এবং পাশ্চ্যত্যের শ্রেষ্ঠতা উপলব্ধি করতে পারবেন। আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি মিশরে এক দেরহাম নাবার পরিবর্তে আঠারো আউন্স ছাগমাংস বিক্রি হয়। এক দেরহাম নাা পাশ্চাত্যের ছয় দেরহামের সমতুল্য।১৮ পক্ষান্তরে মূল্য যখন বেশী থাকে তখনও পাশ্চাত্যের দুই দেরহামে অর্থাৎ নাায় এক-তৃতীয়াংশে আঠারো আউন্স গোত পাওয়া যায়। মিশরে তরল মাখন (ঘি) আদৌ পাওয়া যায় না। মিশরের লোকেরা রুটীর সঙ্গে যে সব জিনিষ খায় পাশ্চাত্যের লোকেরা সেদিকে ফিরেও তাকায় না। তারা বেশীর ভাগ খায় প্রকাণ্ড। কড়াইতে তিল তেল দিয়ে রান্না করা মসুর বা মটর কলাই।১৯ বাসিল্লা নামে এক রকম মটর রান্না করে তারা জলপাই তেল সহ খায়; ছোট এক জাতের শশা সিদ্ধ করে তারা। দৈ মিশিয়ে খায়; তারা একই উপায়ে সালাড় তৈরী করে।২০ বাদাম গাছের কুঁড়িও তারা রান্না করে দৈ দিয়ে খায় এবং কচু রান্না করে খায়। পাশ্চাত্যে এ সব জিনিষ অতি সহজলভ্য। খোদা এখানকার অধিবাসীদের এ সব না খাইয়েও পারে কারণ, এখানে প্রচুর গোশত, ঘি, মাখন, মধু এবং অন্যান্য খাদ্য পাওয়া যায়। মিশরে কাঁচা শাকসব্জীও দুষ্প্রাপ্য। বেশীর ভাগ ফলমূলই সেখানে আসে সিরিয়া থেকে। সস্তার সময়ে এক দেরহাম নাায় তিন পাউণ্ড আঙ্গুর বিক্রি হয়। বারো আউন্সে তাদের এক পাউণ্ড।
