আমি উপরে বর্ণিত তারিখে যখন বাদদাদ পৌঁছি তখন বাগদাদ ও ইরাকের সুলতান ছিলেন শেখ হাসান ৫। ভূতপূর্ব সুলতান আৰু সাইদের তিনি ফুপাতো ভাই। শেখ হাসানের স্ত্রীকে যেমন আবু সাঈদ বিয়ে করেছিলেন তেমনি শেখ হাসানও আবু। সাঈদের মৃত্যুর পর তাঁর বিধবা স্ত্রী দিলশাদকে বিবাহ করেন এবং আবু সাঈদের ইরাক রাজ্য দখল করেন। দিলশাদ ছিলেন আমীর চুবানের পুত্র দিমাস্ক খাজার কন্যা। আমরা যখন বাগদাদে পৌঁছি সুলতান হাসান তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। তিনি গিয়েছিলেন সুর দেশের শাসনকর্তা সুলতার আবেগ আফরাসিয়াব-এর সঙ্গে যুদ্ধ। করতে।
বাগদাদ ছেড়ে আমরা গেলাম আনবার। আনবার থেকে পর পর এলাম হিত হাদিসা এবং আনা।
এটি পৃথিবীর অন্যতম সম্পদশালী ও উর্বর জেলা। এখানে রাস্তার দু’পাশে এতো দালান কোঠা যে হেঁটে যেতে মনে হবে কোনো বাজারের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। আগেই আমরা বলেছি, একমাত্র এ জেলা ছাড়া চীনের নদীর তীরবর্তী দেশগুলোর তুলনা হয় না। আনা থেকে রওয়ানা হয়ে পৌঁছলাম রাহবা শহরে। রাহবা সিরিয়ার সীমান্তে সবচেয়ে সুন্দর শহর। সেখান থেকে গেলাম আস্-সুনা নামক আরেকটি সুন্দর শহরে। এ শহরের অধিবাসীরা প্রধানতঃ পৃষ্টান। এ শহরের নাম আস-সুনা (গরম শহর) হবার কারণ হলো, এখানকার পানির উষ্ণতা। এখানে নারী ও পুরুষদের জন্য। স্নানাগার রয়েছে। এখানকার লোকেরা রাত্রে পানি আনে এবং ঠাণ্ডা হবার জন্য পানি ছাদের উপর রেখে দেয়।
অতঃপর আমরা গেলাম হজরত সুলেমানের শহর তাদমূর (পালমিরা)। এ শহরটি জিদের ৯ দ্বারা তার জন্যে নির্মিত হয়। সেখান থেকে বিশ বছর পরে আবার ফিরে এলাম দামাস্ক শহরে। আমার একজন স্ত্রীকে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় এখানে রেখে গিয়েছিলাম। ভারতে থাকাকালে শুনেছিলাম, সে পরে একটি পুত্র-সন্তান প্রসব করেছে। তাই শুনে আমি ভারতীয় মুদ্রায় চল্লিশটি স্বর্ণমুদ্রা দীনার পাঠিয়ে দেই পুত্রের নানার কাছে। তিনি ছিলেন মরক্কোর অন্তর্গত মিকনাসা (মেকুইনেজ) নামক জায়গার অধিবাসী। দামাস্কে পৌঁছে আমার ছেলের খবর নেওয়া ছাড়া আর কোনো চিন্তাই রইলো না মনে। সৌভাগ্যক্রমে মসজিদে গিয়ে নুরউদ্দিন আস্ শাখাইর দেখা পেলাম। তিনি ছিলেন এমাম এবং মালিক বংশের শেখ বা প্রধান ব্যক্তি। আমি তাঁকে সালাম জানালাম। কিন্তু তিনি আমাকে চিনতে পারলেন না। আমি তখন নিজের পরিচয় দিয়ে ছেলেটির কথা জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, বারো বছর হবে সে মরে গেছে।
তার কাছে শুনলাম, তাঞ্জিয়ারের একজন পণ্ডিত ব্যক্তি জাহিরিয়া একাডেমীতে বাস করছেন। কাজেই আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম আমার মা-বাবা ও আত্মীয় স্বজনের খবর জানবার জন্য। গিয়ে দেখলাম, তিনি একজন পূজনীয় শেখ। তাঁকে। সালাম করে আমার বংশ-পরিচয় দিতেই তিনি জানালেন, আমার পিতা এন্তেকাল করেছেন পনেরো বছর আগে। মাতা এখনও জীবিত আছেন। বছর শেষ হওয়া অবধি আমি দামাস্কে কাটালাম, যদিও খাদ্যদ্রব্য সেখানে সেবার দুর্মূল্য এবং সাত আউন্স পরিমাণ রুটির মূল্য এক দেরহাম নাকরা (প্রায় পাঁচ পেনি)। সেখানকার এক আউন্স মরক্কোর চার আউন্সের সমান।
দামাস্ক থেকে এলাম আলেপ্পো। আলেপ্পো আসাতে পথে পড়লো হিমস, হামা, মারা, ও সারমিন। এখানে এলে একটি ঘটনা ঘটলো। আইনটাবৃ১০ নামক শহরের বাইরে এক পাহাড়ের উপর বাস করতেন এক দরবেশ। প্রধান শেখ নামে তিনি পরিচিত। অনেক লোকজন আসততা সেখানে তার সঙ্গে দেখা করে দোয়া পাবার জন্যে। এছাড়া তিনি নিজে ছিলেন অবিবাহিত একজন মাত্র শিষ্য ছিল সঙ্গে তাঁর পরিচর্যার জন্য। এক দিন ধর্মোপদেশ দিতে-দিতে তিনি বললেন, আমাদের নবী (সাল্লাল্লাহু ওয়ালাম হে সাল্লাম) নারী ছাড়া থাকতে পারতেন না কিন্তু আমি তা পারি। এ জন্য কাজীর দ্বারা তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য সাবুদ নেওয়া হলো, প্রমাণও পাওয়া গেলো। ব্যাপারটা তখন প্রধান সেনাপতির গোচরীভূত করা হলো। শেখ ও তাঁর শিষ্য দোষ স্বীকার করলেন। তখন চার মোজহাবের বিচারকগণ তাদের প্রাণদণ্ডের বিধান দিলেন। যথা। সময়ে তাদের প্রাণদণ্ড হয়ে গেল।
জুন মাসের প্রথম দিকে আলেপ্পোতে খবর পেলাম গাঁজায় ভয়ানক প্লেগ দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন সেখানে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় হাজারেরও উপর। আমি হিমস গিয়ে দেখলাম সেখানেও প্লেগের প্রকোপ। যেদিন সেখানে পৌঁছলাম সেদিনের মৃত্যু সংখ্যা সেখানে তিনশ’। কাজেই আমি দামাস্কে রওয়ানা হয়ে গেলাম এবং বৃহস্পতিবার গিয়ে সেখানে পৌঁছলাম। সেখানকার বাসিন্দারা তখন তিন দিন থেকে রোজা পালন করছে। শুক্রবার কদম মোবারক মসজিদে এসে জমায়েত হলো, আগেই তা পুস্তকের প্রথমাংশে বলেছি। তখন খোদা তাদের প্লেগের কবল থেকে মুক্তি দেন। তাদের সেখানে দৈনিক মৃত্যুর সর্বাধিক সংখ্যা দু’হাজার চার শ’তে উঠেছিলো।
তারপর আমি আজালুন গেলাম, সেখান থেকে গেলাম জেরুজালেম। সেখানে গিয়ে দেখলাম প্লেগের প্রকোপ কমে গেছে। আমরা আবার হেবরণে ফিরে গেলাম, সেখান থেকে গেলাম গাঁজা। গাঁজায় গিয়ে দেখলাম প্লেগে লোক মরে অধিকাংশ জায়গা বিরাণ পড়ে আছে। কাজীর কাছে শুনলাম সেখানে দৈনিক এগারো শ’ লোক প্লেগে মরছে। আমরা সেখান থেকে দামিয়েত্তা এবং দামিয়েত্তা থেকে আলেকজান্দ্রিয়া গেলাম পজে। সেখানেও প্লেগের প্রকোপ তখন কমে এসেছে যদিও মৃত্যু-সংখ্যা দৈনিক এখানে এক হাজার আশি অবধি উঠেছিল।
