বিসবালিক অবস্থিত ছিল বর্তমান গুচেনের উপরে বা নিকটে। জন গেরিয়ার অন্তর্গত উরুমসির পূর্বে।
৩৪। এখানে ইব্নে বতুতা একজন তাতার প্রধানের সমাধি-ক্রিয়ার অনুষ্ঠানের যথার্থ বিবরণ দিয়েছেন। কিন্তু মনে হয় তিনি যেটা দেখেছেন সেটা ম্রাটের সমাধি-ক্রিয়া নয়–অবশ্য যদি বর্ণনাটি সরাসরি হয়ে থাকে।
৩৫। যেহেতু এই ফিরোজকে সম্পূর্ণ অপরিচিত বলে মনে হয়, এবং যেহেতু খানের আবাসস্থল ১৩৭১ খ্রীস্টাব্দে তোগন তাইমুরের মৃত্যুর পরবর্তীকাল পর্যন্ত কারাকুরামে স্থানান্তরিত হয়নি (অবশ্য যদি চীনে দলিল পত্র সত্য হয়ে থাকে), সেজন্য ১৩৫৬ খ্রীস্টাব্দের লেখা গ্রন্থে এই অংশের উপস্থিতি এখনো বর্তমান রয়েছে-সেটা এমন একটি সমস্যা যা ঐতিহাসিকের অপেক্ষা সাইকিক সোসাইটির অনুসন্ধানেই অধিক উপযোগী।
১২. সুলতান ফিরোজের কাছে
বারো
দেশে বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে শেখ বোরহানউদ্দিন ও অন্য সবাই আমাকে পরামর্শ দিলেন, বিশৃখলাবস্থা ভালভাবে দানা বাঁধবার আগেই দক্ষিণ চীনে ফিরে যেতে। তারা আমাকে সুলতান ফিরোজের কাছে নিয়ে গেলেন। সুলতান তার তিন জন অনুচর আমার সঙ্গে দিলেন এবং পথের সর্বত্র আমাকে অতিথির মতো ব্যবহার করতে লিখে দিলেন।
আমরা নদীর ভাটিপথে খাসা এবং সেখান থেকে কাজান ও জায়তুন এসে। পৌঁছলাম। জায়তুনে পৌঁছে ভারত যাত্রার জন্য তৈরি কয়েকখানা চীনদেশীয় নৌকা জাঙ্ক দেখতে পেলাম। সে সব জাঙ্কের একখানার মালিক ছিলেন জাভার (সুমাত্রা) শাসনকর্তা আল-মালিক আজ-জাহির। জাঙ্কের খালাসীরাও সবাই ছিল মুসলমান। এজেন্ট আমার পূর্ব-পরিচিত ছিলেন বলে আমার আগমনে খুব খুশী হলেন। অনুকুল। হাওয়ায় পাল খাঁটিয়ে দশ দিন চলার পরে আমরা যখন তাওলিসি’ দেশের কাছাকাছি এসেছি তখন হাওয়ার গতির পরিবর্তন ঘটলো, আকাশ মেঘে কালো হয়ে গেলো এবং প্রবল বৃষ্টিপাত আরম্ভ হলো। দশ দিন অবধি সূর্যের মুখ দেখতে পেলাম না। দশ দিন পরে এমন এক সাগরে এসে পৌঁছলাম যার নাম আমাদের জানা ছিলো না। খালাসীরা সবাই তখন শঙ্কাকুল হয়ে উঠলো। তারা চীনে ফিরে যেতে চায়। কিন্তু চীনে ফিরে যাবার প্রশ্ন তখন অবান্তর। আমরা তখন কোন্ সাগরের বুকে ভাসছি না বুঝেই বিয়াল্লিশ দিন কাটিয়ে দিলাম।
তেতাল্লিশ দিনের ভোরে প্রায় বিশ মাইল দূরে সাগরের বুকে দেখতে পেলাম একটি পর্বত। জাহাজের খালীসারা সবাই হতভম্ব। তারা বলাবলি করতে লাগলো আমরা এখন স্থলভাগের ধারে কাছেও নেই। সাগরে পর্বত আছে বলে আমাদের জানা নেই। বাতাস যদি আমাদের জাঙ্ক পর্বতের উপরে নিয়ে ফেলে তবে আর রক্ষা নেই। সবাই তখন। আল্লাকে স্মরণ করতে লাগলো। কেউ-কেউ নতুন করে তওবা করে নিল। আমরাও খোদার দয়া ভিক্ষা করতে লাগলাম এবং রসুলুল্লাহ্ যাতে আমাদের জন্য খোদার কাছে সুপারিশ করেন সেজন্য প্রার্থনা করতে লাগলাম। সওদাগরেরা অনেক টাকা-পয়সা খয়রাত করবেন বলে মান করতে লাগলেন। আমি নিজ হাতে একটি খাতায় তাদের মানতের কথা লিখে দিলাম। বাতাস একটু শান্ত হলো। তখন সুর্য উঠলে দেখতে পেলাম, পবর্তটি আকাশে মাথা তুলেছে, পবর্ত ও সাগরের মধ্যবর্তী স্থানে সুর্যের আলো এসে পড়েছে। আমরা তাই দেখে অবাক হয়ে গেলাম। খালাসীরা তখন কাঁদতে-কাঁদতে একে অপরের কাছ থেকে চির-বিদায় গ্রহণ করছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমাদের এ আবার কি হলো?
তারা বললো, আমার যাকে পবর্ত মনে করেছিলাম সে একটা রক’ পাখী। সে যদি একবার আমাদের দেখতে পায় তবে আর নিস্তার নেই।
আমরা তখন সেই পর্বত থেকে মাত্র দশ মাইল ব্যবধানে রয়েছি। খোদার অসীম অনুগ্রহে তখন বাতাসের গতি আমাদের অনুকুলে এলো। তার ফলে আমরা অন্যদিকে চালিত হলাম এবং সেটাকে আর দেখতে পেলাম না এবং তার স্বরূপও জানতে পেলাম না।
অবশেষে দু’মাস পরে আমরা জাভায় পৌঁছে সুমাত্রা শহরে পর্দাপণ করলাম। জাভার সুলতান তখন বিশাল একদল বন্দী নিয়ে এক অভিযান থেকে ফিরেছেন। তিনি আমাকে দুজন বালক ও দু’জন বালিকা পাঠিয়ে দেন এবং আমাকে সমাদরে স্থান দেন। সুলতানের ভ্রাতুস্পুত্রীর সঙ্গে তাঁর পুত্রের বিবাহে আমি উপস্থিত ছিলাম। এ-দ্বীপে দু’মাস কাটিয়ে আমি পুনরায় একটি জাঙ্কে আরোহণ করে যাত্রা শুরু করলাম। বিদায়কালে সুলতান আমাকে প্রচুর অগুরু, কর্পূর লবঙ্গ, চককাঠ উপহার দিলেন। তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চল্লিশ দিন পরে আমরা কালাম (কুইন) এসে পৌঁছলাম। এখানে। অবতরণ করে আমি মুসলমানদের কাজীর গৃহের সন্নিকটে বাস করতে লাগলাম। সেটা ছিল রমজান (জানুয়ারী ১৩৪৭) মাস। এখানকার প্রধান মসজিদে আমি ঈদের নামাজ আদায় করি। কালাম থেকে রওয়ানা হয়ে আমরা কালিকট গিয়ে কিছুদিন কাটাই। আমার ইচ্ছা ছিল দিল্লী ফিরে যাওয়া। কিন্তু ভালভাবে চিন্তা করার পরে ভয়ে দিল্লী যাত্রা স্থগিত রাখলাম। পুনরায় জাঙ্কে আরোহণ করে আটাশ দিন পর ধাফারী এসে পৌঁছলাম। তখন ৭৪৮ হিজরীর মহরম মাস(১৩৪৭এর প্রপ্রিল মাসের শেষাংশ)।
অতঃপর জাহাজে চড়ে আমরা ম্যাসকট নামক ছোট একটি শহরে এলাম। এখানে প্রচুর কাল আল-মাছ পাওয়া যায়। সেখান থেকে আমরা গেলাম কুরায়াত, শাবা, কাব্বা ২ ও কালহাত প্রভৃতি বন্দরে। এ সব বন্দরের কথা পুর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। এ সব শহর হরমুজ প্রদেশের অংশ বিশেষ যদিও এগুলোকে ওমান জেলার অন্তর্গত বলে ধরা হয়। সেখান থেকে আমরা হরমুজ গিয়ে হাজির হলাম। সেখানে তিন রাত কাটিয়ে গেলাম কাওরাস্তান, লার ও খুবালে। এ সবের কথাই আগে উল্লেখ করা হয়েছে। খুবাল থেকে এলাম কারজি। কারজিতে তিন রাত কাটিয়ে অন্যান্য কয়েকটি শহর ও গ্রাম পার হয়ে এলাম শিরাজ; শিরাজ থেকে ইসফাহান। সেখান থেকে তুস্তার (সুস্তার) হয়ে বস্। সেখানে পবিত্র যে সব কবর রয়েছে তা জেয়ারত করা হলো। এমনি করে মাশহাদ আলী ও হিলা হয়ে বাগদাদ এলাম ৪৮ হিজরীর শাওয়াল মাসে (জানুয়ারী, ১৩৪৮)। মরক্কো থেকে এসেছেন এমনি একজন লোকের সঙ্গে সেখানে আলাপ হলো। তারিফার বিপর্যয়ের খবর এবং খ্রীষ্টানদের আল-খাদ্ৰা (আল্ জেসিস) দখলের ৪ খবর পেলাম তার কাছে। ইসলামের যে ক্ষতি তাতে হয়েছে খোদা যেনো তা পূরণ করেন।
