এ দিনটি পালন করা হয় পবিত্র পর্বদিন হিসেবে। জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে নারী পুরুষ কেউ এ দিনের উৎসবে অনুপস্থিত থাকে না। সেদিন সবাই তারা শোকের পোশাক পরিধান করে। অমুসলিমরা পরে হাতাবিহীন সাদা ফতুয়া আর মুসলিমরা পরে লম্বা সাদা কোর্তা। কানের স্ত্রীরা এবং সভাসদগণ চব্বিশ দিন কবরের আশেপাশে তার ফেলে বাস করেন। কেউ-কেউ তার চেয়ে বেশী, এমন কি এক বছর অবধি সেভাবে কাটান। তাদের খাদ্য ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য দ্রব্য সরবরাহের জন্য সেখানে রীতিমত একটি বাজার বসে যায়। আমি যতদূর জানি, আজকাল এ-রকম রীতি আর কোনো জাতির মধ্যেই প্রচলিত নেই। ভারতীয় বিধর্মীরা এবং চীনের লোকেরা তাদের মৃতদেহ দাহন করে। অন্য সবাই মৃতদের দাফন করে কিন্তু আর কাউকে সে সঙ্গে দেয় না। বিশ্বস্ত লোকের মুখে শুনেছি, কাফ্রী দেশের অধিবাসীরা তাদের রাজা মারা গেলে একটি নাউস বা প্রকাণ্ড গর্ত খনন করে। তারপর সে গর্তে রাজার সঙ্গে তার কতিপয় সভাসদ ভৃত্য এবং প্রধান প্রধান বংশের ত্রিশটি ছেলে ও মেয়ের হাত পা ভেঙ্গে সমাহিত করে। তাদের সঙ্গে কয়েকটি পানপাত্রও দিয়ে দেওয়া হয়।
কানের হত্যার পরে তার ভাইপো ফিরোজ রাজ্য দখল করলে তিনি কারাকোরামে রাজধানী স্থাপন করা স্থির করেন। কারণ, এখান থেকে তার জ্ঞাতিভাই তুর্কীস্থানের রাজার ও ট্রান্সসোসানিয়ার৩৫ রাজ্য ছিল নিকটে। পরে কতিপয় আমীর, কানের হত্যাকালে যারা উপস্থিত ছিলেন না, তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে যোগাযোগ ব্যবস্থার বিঘ্ন ঘটায়, ফলে রাজ্যের সর্বত্র বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।
***
টিকা
পরিচ্ছেদ ১১
১। যে নদী উত্তর থেকে দক্ষিণে চীনাকে ভেদ করে ক্যান্টেনোর সমুদ্রে এসে পড়েছে সেই মহা নদীর বিবরণ পাঠ করলে মন হয় যে এ বিবরণ অনেক সময় প্রমাণ করছে যে ইব্নে। বতুতার চীন ভ্রমণ একটি নিছক গল্প। এ কথা মনে রাখতে হবে যে ইব্নে বতুতা চীনের বর্হিভাগে নিজে ভ্রমণ করেছেন সেটা ব্যতীত চীন সম্বন্ধে তার অধিক কিছু জানা ছিল না। এবং তিনি যে সব বিষয় সগ্রহ করেছেন সেগুলি বিন্নি সংবাদদাতাদের কাছ থেকে সংগৃহীত (তার সব সময় নির্ভরযোগ্যও ছিল না)-এবং স্থানে তিনি সে সময়ের সাধারণ মতকে পুণঃপ্রকাশ করেছেন। জীবনের নদী’ এর প্রথম অধ্যায়ে পিকিং এবং ইয়াংসির মধ্যস্থিত গ্রাও ক্যানাল। সমুদ্র উপকূলে অবস্থিত সওদারগণ আভ্যন্তরিক জল-পথের ব্যাপারে স্বল্পই জানতেন। এই জল পথ হ্যাংচাও এবং ইয়াংসিকে পশ্চিম নদী এবং ক্যান্টনের নদীর সঙ্গে সম্ভবতঃ সিয়াংকিয়াংয়ের ভিতর দিকে যুক্ত করেছিল এবং তার ফলে পিংকিয়াংয়ের মোহনাকে সমস্ত জল-পথ বলে মনে করেছিলেন। ইব্নে বতুতার এই বিবরণকে ব্যাখ্যা করা কঠিন যে জেতুন (তিসুয়ান-চাও-ফু) আভ্যন্তরিক জল-পথের দ্বারা ক্যান্টন এবং হ্যাংচাওয়ের সঙ্গে। এখানে বোধ হয় তিনি তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে কথা বলেছেন। কালিকট এবং কুইলনের মাঝখানে স্থলপথে ভ্রমণ সম্বন্ধে আমরা যেমন উপরে দেখেছি (পরিচ্ছেদ ৭, টীকা ১৭) ইব্নে বতুতা অপ্রয়োজনীয় বলে ভূভাগের বর্ণনা বাদ দিয়েছেন অথবা তার ভ্রমণকাল এবং তার দশ বছর পরে ভ্রমণ বৃত্তান্তের মৌখিক বিবৃতি দেওয়ার সময়ে সম্ভবতঃ সে ভুলে গিয়েছেন। এ কথা লিপিবদ্ধ করা কিছু অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে কতিপয় চীনে সহ অন্য সব লেখকও জেতুনকে সেই একই জল-পথের তীরে অবস্থিত বলে স্থির করেছেন। যেমন হ্যাংচাও উক্ত জল-পথের উপর রয়েছে, (খাসা বাক কুইবো)। (ইউল এবং ডান্ মজিক ছাড়াও আরও, হার্টম্যান, দার ইসলাম, ৪র্থ খণ্ড, ৪৩৪)।
২। পর্ডিনানের ফ্রাইয়ার ওড্ডারিকও মন্তব্য করেন ফাচোর সম্পর্কে, “পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মোরগ এখানে দেখতে পাওয়া যায়; কিন্তু তিনি আবার ক্যান্টনের রাজহাঁস সম্বন্ধে বলেন যে তারা “বৃহত্তর, সুন্দর এবং সস্তা পৃথিবীর যে কোনো স্থানের রাজহাঁস অপেক্ষা” (ক্যাথে ২য় খণ্ড, ১৮১, ১৮৫)।
৩। প্রথম যুগের একজন পর্যটক (Voyage de Marchand arabe Sulayman— en 851, অনুবাদক জি, ফেরাও, পৃঃ ৫৫) আমাদের বলছেন যে। চীনেগণ তাদের মৃত ব্যক্তিকে কবর দিতেন যেমন এখনো দিয়ে থাকেন। কিন্তু মার্কোপলো বার বার শবদাহের কথা উল্লেখ করেছেন-মনে হয় এটা চীন দেশে তখন একটি সাধারণ প্রথা ছিল।
৪। বালি কি বালিশ হচ্ছে মূলতঃ সাড়ে চার পাউন্ড ওজনের একটি ধাতব পিণ্ড। তেরো শতাব্দীর শুরুতে এটা ছিল স্তেপ অঞ্চলের প্রচলিত মুদ্রা। শব্দটা সম্ভব মোগলগণ চীনে ভাষাতে আমদানী করেছিলেন। চীনে কাগজের অর্থ সম্বন্ধে মার্কোপলো’ ১ম খণ্ড, ৪২৩ ff. দ্রষ্টব্য।
৫। মার্কোপলোর মতে ব্যবহার-করা নোটের অধিকারীকে নতুন নোট গ্রহণ করার সময় তার মূল্যের উপর তিন পারসেন্ট খরচ দিতে হতো (১ম খণ্ড, ৪২৫)।
৬। ক্যাথে (খিটে) প্রথমে মুসলিমগণ ব্যবহার করেন এং তাদের থেকে ইউরোপীদের পর্যটক এবং ধর্মপ্রচারকগণ ব্যবহার করেন তেরো থেকে ষোলো শতাব্দীর মাঝে। শব্দটি ব্যবহৃত হয় চীনের উত্তর অংশ সম্বন্ধে দক্ষিণ অংশের সিন্ বা খাশ চীনের বিপরীত নাম হিসেবে। নামটি এসেছে কিতে কি খিতে তুর্কীদের থেকে। এরা একটি রাজ্য স্থাপন করেন। (লিয়ায়ে রাজ্য) এবং দশ ও এগারো শতাব্দীতে পিকিংয়ে রাজত্ব করেন। সিকিম চীন (চীনা) নাম খুব সম্ভব সেই একই প্রকার গৃহীত হয়েছে তা-সিন্ রাজত্ব থেকে (২৫৫-২০৯ খ্রীঃ পূর্ব শতাব্দী)।
