পরদিন আমরা শহরের পঞ্চমাংশ বা বৃহত্তম অংশে প্রবেশ করলাম। এখানে সাধারণ লোকদের বাস। এখানকার বাজারগুলো উত্তম। বাজারে অনেক দক্ষ কারিকর আছে। এ শহরের নামে যে উৎকৃষ্ঠ শ্রেণীর কাপড় পাওয়া যায় তা শহরের এ অংশেই তৈরি হয়। আমরা এখানকার শাসনকর্তার মেহমান হিসেবে একরাত কাটালাম। পরের দিন গেলাম শহরের ষষ্ঠ অংশে, যে দরজা দিয়ে সেখানে প্রবেশ করলাম তার নাম মাঝির দরজা। বড় নদীর তীরে অবস্থিত এ অংশে নাবিক, জেলে সূতার মিস্ত্রীর বাস। সে সঙ্গে আছে তীরন্দাজ ও পদাতিক সৈন্যেরা। তারা সবাই সুলতানের গোলাম। তাদের সঙ্গে অন্য কোনো শ্রেণীর লোক এখানে বাস করে না। এদের সংখ্যাও কম নয়। আমরা সেখানেও শাসনকর্তার মেহমান হয়ে এক রাত কাটালাম। আমীর কোয়ার্টে আমাদের জন্য খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য-সহ একটি জাহাজ যাত্রার জন্য সজ্জিত করালেন। এবং আমাদের সুখ-সুবিধা বিদানের জন্য একজন পারিষদও পাঠালেন। আমরা চীনের। এ শেষ শহর ত্যাগ করে খিতা (ক্যাথে) নামক দেশে প্রবেশ করলাম।
ক্যাথে পৃথিবীতে একটি সর্বোত্তম আবাদী জমিপূর্ণ দেশ। এ দেশের কোথাও এতোটুকু জমি অনাবাদী নেই। তার কারণ, কোনো জমি অনাবদী পড়ে থাকলেও তার বাসিন্দা বা আশেপাশের লোকদের সে জমির কর দিতে হয়। খাসা শহর থেকে খান বালিক (পিকিং) শহর অবধি এ নদীর উভয় তীরে ফলের বাগান, গ্রাম ও মাঠ দেখতে পাওয়া যায়। খাসা থেকে খান্-বালিক চৌষট্টি দিনের পথ। এ অঞ্চলের কোথাও মুসলমানদের দেখা পাওয়া যায় না। ক্কচিৎ মুসলমান সফরকারীরা এখানে আসেন। কারণ, এ অঞ্চল মুসলমানদের স্থায়ীভাবে বসবাসের যোগ্য নয়। এখানে কোনো বড় শহর নেই। অধিকাংশই গ্রাম ও বিস্তৃত২৯ মাঠ। মাঠগুলো শস্য, ফলের গাছ ও ইক্ষু প্রভৃতিতে পূর্ণ। ইরাকের আনবার ও আনা মধ্যবর্তী চার দিনের পথ বিস্তৃত মাঠ ছাড়া এমন বিস্তৃত মাঠ আমি দুনিয়ার আর কোথাও দেখিনি। আমরা প্রতি রাত্রেই কোনো গ্রামে গিয়ে নামতাম এবং আমাদের জন্য সুলতানের মেহমান হিসাবে বরাদ্দকৃত রসদাদি গ্রহণ করতাম।
এভাবে আমরা খান-বালিক শহর-যা-খানিকু ৩০ নামেও পরিচিত, সফর শেষ করলাম। তাদের সম্রাট কানের রাজধানী খান-বালিক এ সম্রাটের রাজ্য চীন ও ক্যাথে অবধি বিস্তৃত। আমরা এখানে পৌঁছে রীতি অনুসারে শহরের দশ মাইল দূরে থাকতে আমাদের জাহাজ নোঙ্গর করলাম। আমাদের আগমন সংবাদ নৌ-সেনাপতিদের লিখিতভাবে জানানো হলে তারা আমাদের বন্দরে প্রবেশের অনুমতি দিলেন। বন্দরে। প্রবেশের পরে আমরা শহরে অবতরণ করলাম। পৃথিবীর বৃহত্তম শহরের ভেতর এটিও একটি। এ শহরটি চীন দেশের শহরের ধরনে নির্মিত নয়। চীন দেশের শহরের ভেতরেই বাগান থাকে। অন্যান্য দেশের মতো এখানকার বাগান নগর-প্রাচীরের বাইরে। শহরের মধ্যস্থলে সুলতানের প্রাসাদ একটি দূর্গের ন্যায়। তার বর্ণনা পরে। দেওয়া হবে। আমি এখানে সাগার্জের শেখ বোরহানউদ্দিনের সঙ্গে অবস্থান করি। ভারতের সুলতান একেই চল্লিশ হাজার দীনার পাঠিয়ে ভারতে যাবার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন কিন্তু ইনি সে টাকা গ্রহণ করে নিজের দেনা পরিশোধ করেন এবং ভারতে যেতে অস্বীকার করে চীন যাত্রা করেন। এখানে কান তাকে সদর-আল-জিহান উপাধি দিয়ে তার রাজ্যের সমস্ত মুসলমানদের শীর্ষে তাকে স্থান দিয়েছেন। লুর দেশে যেমন শাসনকর্তাকে বলা হয় ‘আবেগ’ ৩১ এখানে তেমনি যিনি রাজ্য পরিচালনা করেন তাকে বলা হয় কান। এ কানের নাম পাশায় ৩২। দুনিয়ার বুকে পাশায়ের এ রাজ্যের চেয়ে বড় রাজ্য অপর কোনো বিধর্মীর নেই। তার প্রাসাদ শহরের মধ্যস্থলে। অবস্থিত। এটিই তিনি বাসস্থানরূপে ব্যবহার করেন। প্রাসাদের বহুলাংশ কাষ্ঠদ্বারা সূচারুভাবে নির্মিত।
আমরা যখন রাজধানী খান-বালিকে পৌঁছি তখন কান অনুপস্থিত ছিলেন। কানের ভ্রাতৃ সম্পৰ্কীয় ফিরোজ নামক এক ব্যক্তি কারাকোরাম জেলায় এবং ক্যাপের৩৩ বিশ বালিগে বিদ্রোহ করেছিলেন বলে কান তাকে দমন করতে গেছেন। উল্লিখিত জায়গা থেকে রাজধানী আবাদী অঞ্চলের ভেতর দিয়ে তিন মাসের পথ। কান রাজধানী ত্যাগ করলে আমীরদের অধিকাংশ তাঁর আনুগত্য অস্বীকার করে তাঁকে পদচ্যুত করাতে চায়, কারণ তিনি ইয়াসাক’ বা তাদের পূর্বপুরুষ চেংগিস খানের উপদেশাবলী মেনে চলেন না। এ চেংগিস খাই কয়েকটি মুসলিম দেশ ধ্বংস করেন। আমীররা কানের বিদ্রোহী ভাইপোর কাছে গিয়ে কানকে সিংহাসন ছেড়ে দিতে লিখিতভাবে জানান এবং খানসা শহর তার ভরণ-পোষণের জন্য রাখতে বলেন। তিনি তাতে অস্বীকৃত হন। ফলে তাদের ভেতর যুদ্ধ হয়। সে যুদ্ধে তিনি পরাজিত ও নিহত হন।
আমাদের রাজধানীতে পৌঁছবার কয়েকদিন পরেই আমরা এ খবর শুনতে পাই। শহরটি সজ্জিত করা হয় এবং একমাস অবধি বাশী জয়-ঢাক প্রভৃতি বাদ্য-বাজনা ও নানাবিধ আমোদ-প্রমোদের ব্যবস্থা হয়। অতঃপর নিহত কান এবং সে সঙ্গে তার জ্ঞাতিভ্রাতা ও অন্যান্য প্রায় শতেক নিহত ব্যক্তিকে সেখানে আনা হয়। তারপর মাটী খনন করে মাটীর নীচে প্রকাও একটি প্রকোষ্ঠ তৈরি করা হয়। প্রকোষ্ঠটি মূল্যবান আসবাবপত্রে সজ্জিত করে কানের দেহ রাখা হয় সেখানে। কানের সঙ্গে তার অস্ত্রশস্ত্র এবং প্রাসাদের স্বর্ণ ও রৌপ্যের মূল্যবান পাত্ৰাদিও ভূগর্ভে রক্ষা করা হয়। সর্বশেষে সেই প্রকোষ্ঠে দেওয়া হয় কানের চারজন বাদী ও প্রধান পরিচারিকাদের দু’জন পানপাত্র বহন করা ছিল যাদের কাজ। তারপর প্রকোষ্ঠের দরজা চিরকালের জন্য বন্ধ করে সে জায়গায় মাটী চাপা দিয়ে বেশ বড়ো একটি টিলা তৈরি করা হয়। তখন তারা চারটি ঘোড়া নিয়ে আসে সেখানে। ঘোড়াগুলো পরিশ্রান্ত হয়ে থেমে না-যাওয়া অবধি কানের কবরের চারপাশে দৌড়াতে থাকে। ইত্যবসরে কবরের উপর কাঠের একটি ঘর নির্মাণ করা হয়। তারপর ঘোড় চারটি সেখানে ঝুলিয়ে রাখা হয় তাদের লেজ থেকে মাথা অবধি৩৪ একটি করে কাঠের দণ্ড ঢুকিয়ে। কানের উপরোক্ত আত্মীয়দেরও এমনি করে ভূগর্ভস্ত প্রকোষ্ঠে রাখা হয় তাদের অস্ত্রশস্ত্র ও গৃহের তৈজসপত্রসহ। আত্মীয়দের মধ্যে দশজন ছিলেন প্রধান। তাদের প্রত্যেকের কবরের উপর ঝুলানো হয় তিনটি করে শূলবিদ্ধ ঘোড়া। বাকি সবার কবরের উপরে ঝুলানো হয় একটি করে।
