একদিন তাদের সঙ্গে ঘোড়ায় চড়ে বের হয়ে আমি চতুর্থ শহরে বা শহরের চতুর্থাংশে গিয়ে প্রবেশ করলাম। এখানেই রাজধানী এবং প্রধান শাসনকর্তা কোয়ার্টে এখানে বাস করেন। আমরা প্রবেশদ্বারে পৌঁছতেই আমার সঙ্গীদের পৃথক করে নেওয়া। হলো। তখন উজির এসে আমাকে প্রধান শাসনকর্তার প্রাসাদে নিয়ে গেলেন। এ উপলক্ষ্যেই তিনি সিরাজের দরবেশ জালালউদ্দিনের দেওয়া আলখেল্লাটি নিয়ে নেন। সে কথা আগেই বলেছি। শহরের ছয়টি অংশের মধ্যে এ অংশটি সবচেয়ে বেশি সুন্দর। সুলতানের গোলাম ও ভৃত্য ছাড়া এখানে আর কেউ বাস করে না। এ অংশের ভেতর দিয়ে তিনটি নহর বয়ে গেছে। তার একটি খালের মতো। বড় নদী থেকে তা এসেছে। এ নদী দিয়ে শহরের ছোট-ছোট নৌকায় খাদ্যদ্রব্য ও কয়লা এসে পৌঁছে। অনেক প্রমোদতরীও এখানে আছে। শহরের মধ্যস্থলে একটি কেল্লা,২৩ আকারে বিশাল। কেল্লার মধ্যস্থলে শাসনকর্তার বাসস্থান। কেল্লায় অন্তর্গত অর্ধবৃত্তাকার খিলান-শ্রেণীতে। বহু সংখ্যক কারিগর বসে পোষাক পরিচ্ছদ ও অস্ত্রপাতি তৈরি করে। আমীর কোয়ার্টে বলেছেন এক সময়ে মোল শ’ দক্ষ কারিগর এবং তাদের প্রত্যেকের অধীনে তিন বা চারজন করে শিক্ষানবিশ ছিল। তারা সবাই ছিলো কানের গোলাম। তাদের সবারই গায়ে শিকল বেড়ি লাগানো। দূর্গের বাইরে তারা বাস করে। শহরের বাজার অবধি যাবার অনুমতি তাদের আছে কিন্তু প্রবেশদ্বারের বাইরে যাবার অনুমতি নেই। প্রতিদিন শাসনকর্তার সম্মুখ দিয়ে এক-এক বারে এক শ’ জন করে হটিয়ে নেওয়া হয়। তখন তাদের কাউকে খুঁজে না পেলে তার পরিচালক বা রক্ষককে দায়ী করা হয়। দশ বছর এভাবে কেউ কাজ করলে প্রচলিত রীতি অনুসারে তাকে শৃঙ্খলমুক্ত করা হয়। তখন সে ইচ্ছে মতো আগের কাজও করতে পারে অথবা কানের রাজত্বের মধ্যে থেকে অন্য কাজও করতে পারে কিন্তু তাকে এলাকার বাইরে যাবার অনুমতি দেওয়া হয় না। এমনি করে বয়স যখন তার পঞ্চাশ বছর হয় তখন আর তাকে কাজ করতে হয় না। সরকারী খরচে তার ভরণ-পোষণ চলে।২৪ অনুরূপভাবে অন্যেরাও যখন পঞ্চাশে পদার্পণ করে অথবা কমবেশী পঞ্চাশ বছর উত্তীর্ণ করে তবে তারাও সরকারী ভাতা পায়। তারপর ষাট বছর বয়স হলে তাকে শিশু বলে গণ্য করা হয়, এবং আইনগতভাবে সে তখন অপরাধের সাজা পাবার অযোগ্য। চীন দেশে বৃদ্ধদের বিশেষ সম্মানের চোখে দেখা হয়। তখন তাদের বলা হয় ‘আতা’ অর্থাৎ পিতা।
আমীর কোয়াটেই চীনের প্রধান আমীর ২৫। আমীর তার প্রাসাদে আমাদের মুসলমান হিসাবে গ্রহণ করেন এবং আমাদের উপলক্ষ্যে একটি ভোজের আয়োজন করেন। শহরের গণ্যমান্য লোকেরা সে ভোজ-সভায় যোগদান করেন। এ ধরণের ভোজকে তারা বলে তওয়া২৬। এজন্য আমীর মুসলমান বাবুরি ব্যবস্থা করেন। ভোজ্যবস্তু যাতে হালাল হয় সেজন্য হারাই জানোয়ার জবাই করে রান্না করে। একজন বিশিষ্ট আমীর হওয়া সত্ত্বেও তিনি স্বহস্তে আমাদের খাদ্য পরিবেশন করেন। এবং গোশত স্বহস্তে কেটে দেন। আমরা তিনদিন তার প্রাসাদে মেহমান ছিলাম। আমাদের যাত্ৰা কালে তিনি তার ছেলেকে আমাদের সঙ্গে খাল অবধি এগিয়ে দিতে পাঠান। এখানে আমরা একটি জাহাজে গিয়ে উঠলাম। জাহাজটি দেখতে বারুদবাহী জাহাজের মতো। গায়ক ও বাদকদল সহ আমীরজাদা আরেকটি জাহাজে গিয়ে উঠলেন। গায়কগণ চীন আরবী ও ফারসী ভাষায় গান গেয়ে আমাদের শুনালো। আমীরজাদা ফাসীর সুরের একজন ভাল সমঝদার। গায়করা যখন আমাদের একটি ফাসী গান গেয়ে শুনালো তখন তিনি সে গানটি বার বার গাইতে বললেন। তাতে সে গানটি আমার মুখস্থ হয়ে গেলো। চমৎকার সে গানটি হলো–
Ta’ dil bimihnat da’dim
dar hahr-i fikr ustadim
Chun dar namaz istadim
qavi dimihrab andarim.২৭
উজ্জ্বল রঙের রঙীন পাল ও চন্দ্রাতপ খাটানো অনেক জাহাজ নিয়ে বহু লোক খালে এসে জড়ো হয়েছে। তাদের জাহাজগুলোও রং করা হয়েছে। তারা তখন কৃত্রিম যুদ্ধ আরম্ভ করলো ও লেবু ও কমলালেবু২৮ একে অপরকে নিক্ষেপ করতে লাগলো। আমরা সন্ধ্যায় আমীরের প্রাসাদে ফিরে সে রাত্রি সেখানেই কাটালাম। গায়ক ও বাদকরা সেখানে ছিল, তারা সুললিত সুরে গান গেয়ে শুনালো।
সে রাত্রে সেখানে একজন যাদুকর ছিলো। সে কানেরই একজন ক্রীতদাস। আমীর তাকে হুকুম করলেন তোমার কিছু খেলা দেখাও আমাদের।
লোকটি কাঠের একটি বল বের করলো। বলটির গায়ে কয়েকটি ছিদ্র এবং চামড়ার ফালি লাগানো। বলটি সে শূন্যে ছুঁড়ে মারতেই তা উর্ধ্বে উঠতে-উঠতে আমাদের দৃষ্টির বাইরে চলে গেলো। গ্রীষের গরমে আমরা প্রাসাদের দরবার কক্ষের মধ্যস্থলে বসেছিলাম। লোকটির হাতে এক গাছি দড়ি ছাড়া আর কিছুই রইল না। তখন সে তার একজন শাগরেদকে ডেকে সেই দড়ি বেয়ে উপরে উঠতে বললো। অবশেষে সেও দড়ি বেয়ে উঠতে-উঠতে আমাদের দৃষ্টির বাইরে চলে গেলো। যাদুকর তিনবার শাগরেদের। নাম ধরে ডাকলো কিন্তু কোনো সাড়া শব্দ পাওয়া গেলো না। তখন রাগের ভাণ করে একখানা ছোরা হাতে নিয়ে সেও দড়ি বেয়ে উঠে অদৃশ্য হয়ে গেল। তারপর সেই শাগরেদের একখানা কাটা হাত পড়লো উপর থেকে, পরে একখানা পা, তারপর বাকি হাত, পা এবং ধড়টা। সবশেষে পড়লো তার মাথা। তখন সে নিজে নেমে এলো হাঁপাতে হাঁফাতে। তার সমস্ত কাপড়-জামা রক্ত রঞ্জিত। নেমে এসে সে আমীরের সামনের মাথা চুম্বন করে চীন ভাষায় কি যেনো বললো। আমীরও তাকে কি যেনো হুকুম করলেন। তখন যাদুকর ছেলেটির হাত পা ঠিক জায়গা মতো লাগিয়ে একটি লাথি। মারলো। সঙ্গে সঙ্গে সে সুস্থ দেহে উঠে দাঁড়ালো। বিষয়ে আমার হৃদকম্প হতে লাগলো। ভারতের সুলতানের দরবারে একবার এ রকম একটি ব্যাপার দেখে আমার ঠিক এমনি অবস্থাই হয়েছিলো। তখন তারা আমাকে কিছু ঔষধ এনে দেওয়ায় আমি সুস্থবোধ করলাম। কাজী আখতারউদ্দিন আমার পাশেই বসেছিলেন। তিনি বললেন, খোদার কসম করে বলতে পারি, দড়ি বেয়ে ওঠা-নামা, হাত-পা কাটা কিছুই নয়,–সবই ভেলকি।
