এবং কেউ-কেউ দিনে শহর পাহারা দেয়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দেওয়ালের মধ্যবর্তীস্থানে। বাস করে অশ্বারোহী সৈন্যেরা এবং একজন জেনারেল যিনি শহরের শাসনকার্য
পরিচালনা করেন। তৃতীয় দেওয়ালের মধ্যে বাস করে মুসলমানরা। এখানেই আমরা। শেখের বাড়ীতে আশ্রয় গ্রহন করলাম। চতুর্থ দেওয়ালের মধ্যে চীনাদের বাস। শহরের চারটি এলাকার মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড়। এ শহরের একটি প্রবেশদ্বার থেকে অপরটির দূরত্ব তিন থেকে চার মাইল। আগেই বলেছি এখানে প্রত্যেকেরই নিজের বাড়ী, বাগান ও জমি আছে।
আমি কানজানফুতে থাকতে একদিন বিশেষ গণ্যমান্য একজন ডাক্তারের প্রকাণ্ড একখানা জাহাজ সেখানে এসে ভিড়লো। তিনি সিউটার মওলানা কিয়ামউদ্দিন নামে পরিচিত। তিনি আমার সঙ্গে দেখা করবেন কিনা জিজ্ঞাসা করা হলো। নাম শুনে তাঁর সঙ্গে দেখা করার আগ্রহ হলো। প্রচলিত অভিবাদনাদির পরে কথাবার্তা শুরু করে আমার মনে হলো তিনি আমার পূর্ব পরিচিত লোক। তার দিকে একাগ্রভাবে চাইতে দেখে তিনি অবশেষে বলে উঠলেন, আপনি আমার দিকে এমনভাবে চেয়ে আছেন যে দেখে মনে হয় আপনি আমাকে চেনেন।
কাজেই আমিও তখন বললাম, আপনি কোথা থেকে এখানে এসেছেন?
‘সিউটা থেকে তিনি জবাব দিলেন।
আমি বললাম, আমি এসেছি তাজিয়ার থেকে।
একথা বলায় তিনি পুনরায় আমার সঙ্গে অভিবাদনের আদান-প্রদান করলেন। তিনি চোখের পানি ছেড়ে দিলেন, সমবেদনায় আমারও চোখ অশ্রু সজল হয়ে উঠলো। অতঃপর আমি বললাম, আপনি কি ভারতে গিয়েছেন?
তিনি বললেন, হ্যাঁ, রাজধানী দিল্লী আমি গিয়েছি।
একথা বলায় আমারও তাকে মনে পড়লো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি আল-বুশরী?
জবাবে তিনি বললেন, হ্যাঁ!
আমার মনে পড়লো, দাড়ী-গোঁফ না-উঠতে কিশোর ছাত্র অবস্থায় তাঁর মাতুল মারসিয়ার আবুল কাসেমের সঙ্গে দিল্লী এসেছিলেন। আমি তার বিষয়ে সুলতানকে বলায় তিনি তাকে তিন হাজার দীনার দিয়েছিলেন এবং দিল্লীর দরবারে থাকবার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি চীনদেশে যাবার জন্য তৈরি হয়েছেন বলে সে আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন। চীনে এসে তিনি যথেষ্ট উন্নতি করেছেন এবং প্রভূত ধনসম্পত্তির। মালিক হয়েছেন। তার কাছে শুনলাম, তার পঞ্চাশ জন শ্বেতকায় গোলাম এবং সমসংখ্যক বাদী আছে। অন্যান্য অনেক উপহার সামগ্রীর সঙ্গে তিনি আমাকে দু’জন গোলাম ও দুজন বাদী উপহার দেন। পরবর্তী এক সময়ে আমি তার এক ভাইয়ের দেখা। পাই কাফ্রীদের দেশে (নিগ্রোল্যান্ড)। দু’ভায়ের বাসস্থান কততা দূরে অবস্থিত।
কানজানতে পনেরো দিন কাটিয়ে আবার যাত্রা শুরু করলাম। চীনদেশে যতো ভালকিছুই থাক, আমার কাছে এদেশ আকর্ষনীয় মনে হলো না। এদেশের বদ্ধমূল নীচতা ও ধর্মহীনতা আমার মনকে বিশেষভাবে পীড়িত করেছে। ঘরের বাইরে গেলেই নজরে পড়তো নানা রকম ন্যাক্কারজনক ব্যাপার। তা দেখে আমার এতো দুঃখ হতো যে নিতান্ত প্রয়োজন না-হলে আমি ঘরের বার হতাম না। চীনে যখনই আমার কোনো মুসলমানের সঙ্গে দেখা হতো তখনই মনে হতো স্বধর্মী একজন আত্মীয়ের দেখা পেলাম। ডাক্তার আল-বুশরী আমার প্রতি এতটা সদয় ছিলেন যে, চারদিনের পথ বায়াম কুলু ২১ পৌঁছা অবধি তিনি আমাদের সঙ্গে এলেন। এ ছোট শহরটিতে শুধু চীনাদের বাস। তাদের কিছু সংখ্যক সৈনিক, বাকি সবাই সাধারণ শ্রেণীর লোক। সেখানে মাত্র চার ঘর মুসলমানের বাস। তারা সবাই আমার এ জ্ঞানী বন্ধুর মুরিদ। আমরা তিন দিন তাদের একজনের গৃহে কাটিয়ে আবার রওয়ানা হলাম।
আমরা পূর্বের নিয়ম মতই এক গ্রামে মধ্যাহ্ন ভোজনের জন্য এবং রাত্রের আহারের জন্য অন্য গ্রামে গিয়ে থেমে নদী পথে চলতে লাগলাম। এমনি করে সতেরো দিন পরে আমরা পৌঁছলাম কাসা (হংচৌ) শহরে। ২২ পৃথিবীতে আমি যত শহর দেখেছি তার। ভেতর এ শহরটিই সর্ববৃহৎ। স্বাভাবিকভাবে হেঁটে এবং প্রয়োজনমত থেমে এ শহরটির এপাশ থেকে ওপাশ অবধি যেতে তিন দিন সময় লাগে। এ শহরটিও চীনের পূর্ব-বর্ণিত নিয়মে তৈরি। এখানেও প্রত্যেকেরই নিজের বাড়ী ও বাগান আছে। এ শহরটি ছয় ভাগে বিভক্ত। সে সব বিবরণ পরে দেওয়া হবে। আমরা সেখানে পৌঁছলে অধিবাসীদের একটি দল এলো আমাদের সঙ্গে দেখা করতে শ্বেতপতাকা, জয়ঢ়াক, বাঁশী প্রভৃতি নিয়ে। এ দলে ছিলেন কাজী শেখ-উল-ইসলাম এবং এ শহরের একজন প্রধান বাসিন্দা মিশরের ওসমান ইব্নে আফফানের পরিজনবর্গ নগরের শাসনকর্তা ও তাঁর কর্মচারীদের নিয়ে আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এলেন। আমরা নগরে প্রবেশ করলাম।
খানসা শহরের ছয়টি অংশ। প্রত্যেক অংশই পৃথক প্রাচীরে ঘেরা এবং সব কয়টি অংশ ঘিরে বাইরেও একটি প্রাচীর আছে। শহরের প্রথমাংশে প্রহরী ও তাদের পরিচালকের বাসস্থান। কাজীর কাছে শুনেছি, তাদের সংখ্যা বারো হাজার। তাদের সেই পরিচালকদের বাসায় আমরা প্রথম রাত্রি কাটালাম। দ্বিতীয় দিন আমরা শহরের দ্বিতীয়াংশে যে দরজা দিয়ে ঢুকলাম তার নাম য়িহুদী দরজা। এখানে বাস করে বহু সংখ্যক য়িহুদী, খৃষ্টান ও সূর্য ও পূজার। তুর্কী। এ অংশের শাসনকর্তা একজন চীনবাসী। আমাদের দ্বিতীয় রাত্রি তার গৃহেই কাঠে। তৃতীয় দিনে আমরা শহরের তৃতীয় অংশে প্রবেশ করি। এখানে মুসলমানদের বাস। এটি শহরের একটি চমৎকার অংশ। বাজারগুলো অন্যান্য মুসলিম দেশের বাজারের মতোই সাজানো গোছানো। এখানে। মসজিদ মোয়াজ্জিন সবই আছে। আমরা শহরে ঢুকেই শুনতে পেলাম জহুরের নামাজের আজান দেওয়া হচ্ছে। এখানে আমরা ওসমান ইব্নে আফফানের গৃহে স্থান পেলাম। তিনি একজন বিত্তশালী ব্যবসায়ী এবং এ শহরকে খুব পছন্দ করেন বলে নিজের গৃহ। এখানে তৈরি করেছেন। তাঁর নামানুসারে শহরের এ অংশ ওসমানিয়া নামে পরিচিত। তিনি এখানে যথেষ্ট সম্মান ও প্রভাব প্রতিপত্তির অধিকারী। তিনিই কানসা শহরের প্রধান মসজিদটা তৈরি করিয়েছেন এবং মসজিদের নানা রকম উন্নতি সাধন করেছেন। এখানকার মুসলমানদের সংখ্যা বিপুল। আমরা পনেরো দিন তাদের সঙ্গে কাটাই। প্রত্যেক দিন ও রাত্রেই আমাদের জন্য নতুনভাবে অতিথি সঙ্কারের ব্যবস্থা হয়। তারা প্রত্যেকদিনই আমাদের জন্য উপাদেয় খাদ্যের ব্যবস্থা করেছে এবং শহরের নিত্য নূতন জায়গায় আমাদের নিয়ে বেড়াতে বের হয়েছে।
