বন্দর রক্ষক আমার সম্বন্ধে সবিশেষ জ্ঞাত হবার পরে আমার ভারত থেকে আগমন সম্বন্ধে তাদের সম্রাট কানকে১৩ পত্র লিখে জানালেন। কানকে লিখিত চিঠির জবাব আসবার আগে যাতে আমি সিন্ (সিন-আস-সিন)-তাদের কথায় সিন-কালান১৪ জেলা দেখে আসতে পারি সেজন্য বন্দর রক্ষককে অনুরোধ করলাম আমার সঙ্গে একজন লোক পরিচালক হিসেবে দিতে। এ জেলাটি তারই এলাকাধীনে। তিনি আমার অনুরোধ রক্ষা করে একজন কর্মচারী আমার সঙ্গে দিলেন। আমাদের দেশের যুদ্ধ জাহাজের মতো একটি নৌকায় নদীর উজান পথে আমরা রওয়ানা হলাম। এ নৌকার বৈশিষ্ট্য এই যে, দাড়িরা মাঝখানে দাঁড়িয়ে দাঁড় টানে এবং যাত্রীরা বসে আগে ও পিছনের দিকে। তাদের দেশে জন্মে এমনি এক ধরনের গাছের তৈরি চাদোয়া খাটানো হয় নৌকায়। এ জিনিষ দেখতে শনের মতো কিন্তু আসলে শন নয়, শনের চেয়েও সুক্ষ্ম (সবতঃ ঘাসের তৈরি কাপড় বা মাদুর) আমরা এ নদীর উজান পথে পাল খাঁটিয়ে যেতে সাতাশ দিন। কাটালাম। প্রত্যেকদিন দুপুরের দিকে আমরা কোনো গ্রামের কাছে এসে নৌকা বাঁধতাম এবং সেখান থেকে প্রয়োজনীয় জিনিষ কিনে নিতাম এবং জহুরের নামাজ পড়ে নিতাম। তারপর বিকেলে গিয়ে আরেকটি গ্রামে হাজির হতাম। এমনি করেই আমাদের দিন কাটছিলো সিন-কালান বা সিন-আস-সিন পৌঁছা অবধি। জয়তুনে এবং এখানে চীনে মাটীর জিনিষ তৈরি হয়। এর ধারে কাছেই আবেহায়াত নদী সমুদ্রে এসে মিশেছে। এজন্য জায়গাকে তারা পানির সভা’ (The Metting of the waters) বলে। এর আকারের জন্য এবং বাজারের উত্তৰ্ষতার জন্য সিন-কালান একটি প্রথম শ্রেণীর শহর। বড় বাজারগুলোর ভেতর একটি হলো চীনে মাটীর বাজার। এখান থেকে চীনে মাটীর জিনিষপত্র চীনের সর্বত্র, ভারত এবং ইয়েমেনে রপ্তানী হয়। এ শহরের মধ্যস্থলে প্রকাণ্ড। একটি মন্দির আছে। মন্দিরে নয়টি তোরণ। প্রত্যেক তোরণেই মন্দিরের বাসিন্দাদের যাবার জন্য আসন পাতা রয়েছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় তোরণের মধ্যস্থলে একটি জায়গায় অন্ধ ও খঞ্জেরা বাস করে। মন্দিরের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ থেকে তাদের খোরপোষ। সরবরাহ করা হয়। সব কয়টি তোরণের মধ্যেই অনুরূপ ব্যবস্থা আছে। মন্দিরের অভ্যন্তরে রুগ্নব্যক্তিদের জন্য একটি হাসপাতাল আছে, রান্নার জন্য একটি ঘরও আছে। আর আছে ডাক্তার ও খাদ্য পরিবেশনকারী কর্মীদল। শুনেছি, জীবিকার্জনে অক্ষম বৃদ্ধেরা এ মন্দির থেকে তাদের খোরপোষ পায়, আর পায় অনাথ ও নিঃসম্বল বিধবারা।
তাদের একজন রাজা এ মন্দির তৈরি করে গেছেন এবং এ শহর, শহরের গ্রাম ও ফল-বাগিচার আর মন্দিরের জন্য দান করে গেছেন। এ রাজার একটি প্রতিকৃতি মন্দিরে রক্ষিত আছে। তারা তার পূজা করে।
এ শহরের এক অংশে মুসলমানদের বাসস্থান। সেখানে তাদের মসজিদ, মুসাফিরখানা, বাজার প্রভৃতি আছে। তাদের একজন কাজী ও একজন শেখও আছেন। চীনের প্রতি শহরেই একজন করে শেখ-উল-ইসলাম থাকবার নিয়ম। তার কাছে মুসলমানদের সব কিছু ব্যাপার জানানো হয় এবং তিনি সেখানকার মুসলমান সমাজ ও সরকারের মধ্যস্থতা করেন। কাজী তাদের মধ্যকার আইন-সংক্রান্ত বিষয়ের মীমাংসা করেন। আমার বাসস্থান ছিলো আওহাদউদ্দিন নামে সিজারের একজন খ্যাতনামা ব্যক্তির গৃহে। তিনি ছিলেন অমায়িক প্রকৃতির একজন বিত্তশালী ব্যক্তি। আমি তার সঙ্গে চৌদ্দ দিন ছিলাম। এ সময়ে কাজী ও অন্যান্য মুসলমানদের কাছ থেকে একটার পর একটা উপহার অনবরত আমার কাছে এসেছে। প্রতিদিন তারা নতুন একটা আনন্দোৎসবের ব্যবস্থা করে গীতবাদ্যসহ সুসজ্জিত নৌকায় এসে তাতে যোগদান করতো। সিন-কালান শহরের পরে বিধর্মী বা মুসলমানদের কোনো শহরই নেই। শুনেছিলাম, সেখান থেকে ইয়াজুজ-মাজুজ দূর্গ প্রাচীর ষাট দিনের পথ। এর মধ্যবর্তী স্থানে যাযাবর বিধর্মীদের বাস। সুযোগ পেলেই তারা নরমাংস ভক্ষন করে১৮। সেজন্য সে দেশে কেউ যায় না। আমিও সিন-কালানে এমন কারও দেখা পাইনি যে দূর্গ প্রাচীরে গিয়েছে অথবা গিয়েছে এমন লোকের সঙ্গে আলাপ করেছে।
আমার জয়তুনে ফিরে আসবার কয়েকদিন পরেই কানের হুকুমনামা এসে পৌঁছলো। তিনি আমাকে বিশেষ সম্মানের সঙ্গে, আমার ইচ্ছানুসারে জলপথে, নতুবা স্থলপথে রাজধানীতে নিয়ে যেতে লিখলেন। নদীপথে ভ্রমণ করাই আমার পছন্দসই বলে শাসনকর্তাদের ব্যবহারের উপযোগী করে তৈরি একখানা জাহাজ ঠিক করা হলো আমার। যাত্রার জন্য। শাসনকর্তা তার কর্মচারীদের আমার সঙ্গে দিলেন। তিনি নিজে এবং কাজী মুসলমান ব্যবসায়ীরা আমার জন্য অনেক খাদ্যদ্রব্যও পাঠালেন। আমরা রাজকীয় অতিথি হিসাবে যাত্রা করলাম। কোনো এক গ্রামে গিয়ে আমরা মধ্যাহ্নভোজন করতাম। এবং অপর এক গ্রামে গিয়ে করতাম সান্ধ্যভোজন। দশ দিন পর আমরা কানজান পৌঁছি। ফলের বাগানে আবৃত একটি প্রশস্ত সমতলভূমিতে কানজান বেশ বড় একটি শহর। ফলের বাগানের জন্য শহরটিকে দামাস্কের ঘুটা২০ বলে মনে হয়। আমরা সেখানে পৌঁছলে কাজী, শেখ-উল-ইসলাম এবং ব্যবসায়ীরা পতাকা, ঢাক-ঢোল, বাঁশী প্রভৃতি বাদ্যবাজনাসহ দেখা করতে এলেন। তাঁরা আমাদের জন্য ঘোড়া এনেছিলেন। কাজেই আমরা সেখান থেকে ঘোড়ায় চড়ে রওয়ানা হলাম এবং তাঁরা পায়ে হেঁটে আমাদের আগে-আগে চলতে লাগলেন। কাজী ও শেখ-উল-ইসলাম ছাড়া আর কেউ আমাদের সঙ্গে ঘোড়ায় চড়লেন না। স্বয়ং শাসনকর্তাও তার কর্মচারীদের নিয়ে আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। কারণ, সুলতানের অতিথিদের তারা খুব সম্মানের চোখে দেখে। এভাবে আমরা শহরে এসে পৌঁছলাম। এ শহরের চারটি দেওয়াল। প্রথম ও দ্বিতীয় দেওয়ালের মধ্যে বাস করে সুলতানের গোলামগণ। তাদের কেউ-কেউ রাত্রে
