যখন কোনো মুসলমান সওদাগর চীনের কোনো শহরে উপস্থিত হয় তখন তাকে তার পছন্দ মতো সেখানকার কোনো মুসলমান ব্যবসায়ীর গৃহে অথবা হোটেলে থাকার স্বাধীনতা দেওয়া হয়। যদি সে ব্যবসায়ীর সঙ্গেই থাকতে পছন্দ করে তবে তার টাকা কড়ি গৃহস্বামী ব্যবসায়ীর কাছে গচ্ছিত রাখা হয়। পরে বিশেষ সততা ও বদান্যতার সঙ্গে গৃহস্বামী সে টাকা কড়ির থেকে অতিথির ব্যয় বাবদ খরচ করে। অতিথির বিদায়ের সময় হলে সে টাকাকড়ি গণনা করা হয়। গণনায় কোনো কারণে কম হলে টাকার ভারপ্রাপ্ত গৃহস্বামী তা পূরণ করে দেন। অতিথি যদি কোনো হোটেলে থাকতে চায় তবে তার টাকাকড়ি রাখা হয় হোটেলের মালিকের হেফাজতে। অতিথির যা কিছু প্রয়োজন। মালিক তার সবই কিনে দেয় এবং পরে একটি হিসাব দাখিল করে। অতিথিদের মধ্যে যদি কেউ উপপত্নী রাখতে ইচ্ছে করে তবে হোটেল-মালিক একটি বালিকা-বাদী সংগ্রহ করে তাদের জন্য পৃথক বাসস্থান ঠিক করে দেয় এবং উভয়ের খাদ্য সরবরাহ করে। বাদীর মূল্য সেখানে কম, তবু চীনের সবাই তাদের পুত্রকন্যাদের বিক্রি করে। এ কাজকে তারা অবমাননাকর মনে করে না। ক্রেতার সঙ্গে ক্রীতদাস বা দাসীদের যেতে বাধ্য করা হয় না। পক্ষান্তরে তারা যেতে চাইলেও কোনো প্রকারে তাদের বাধা দেওয়া হয় না, ঠিক সে রকম, কোনো লোক যদি সেখানে এসে বিয়ে করতে চায় তবে তাও সে করতে পারে কিন্তু লাম্পট্যে অর্থ ব্যয় করতে পারে না। তারা বলে, মুসলমানদের ভেতর আমরা একথা আলোচনা হতে দিতে পারি না যে তাদের লোকেরা কেউ এদেশে এসে বিত্ত নষ্ট করেছে। কারণ, আমাদের এদেশ উচ্ছল জীবন যাপন ও অসামান্য সৌন্দর্যের (স্ত্রীলোক) দেশ।
বিদেশী সফরকারীদের জন্য চীন একটি নিরাপদ ও সুশৃঙখল দেশ। একজন লোক সঙ্গে বহু টাকাকড়ি নিয়েও অকুতভয়ে নয় মাসের পথ একাকী চলে যেতে পারে। নিম্ন উপায়ে তারা তার নিরাপত্তা বিধান করে। এ দেশে পথের প্রত্যেক বিরতিস্থানেই একজন কর্মচারীর নিয়ন্ত্রণাধীনে একটি করে সরাইখানা আছে। তার অধীনে কিছু অশ্বারোহী ও পদাতিক সৈন্য সেখানে রাখা হয়। প্রতিদিন সন্ধ্যায় বা তার পরে সেই কর্মচারী তার কেরানীসহ সেখানে আসে এবং যারা সেখানে রাত্রিবাস করবে তাদের নাম-ধাম লিখে নেয়। তারপর নামের সেই তালিকা সিল মোহর করে রেখে সরাইখানায় তালাবদ্ধ করে রাখে। পরের দিন সূর্যোদয়ের পরে কেরানীসহ সেই কর্মচারী পুনরায় এসে অতিথিদের প্রত্যেকের নাম ধরে ডাকে এবং তাদের পূর্ণ বিবরণী তালিকায় লিখে রাখে। তারপর পরবর্তী সরাইখানায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য তাদের সবাইকে একটি লোকের হাওলা করে দেয়। সে লোক অতিথিদের যথাস্থানে পৌঁছে দিয়ে সেই সরাইখানা থেকে এ মর্মে লিখিয়ে আনে যে অতিথিরা সবাই সেখানে নিরাপদে পৌচেছে। পরিচালক লোকটি যদি লিখিত-চিঠি না দাখিল করতে পারে তবে তাদের নিরাপত্তার জন্য তাকেই দায়ী করা হয়। সিন-আস-সিন থেকে খান-বালিক অবধি তাদের দেশের সর্বত্রই এ নিয়ম প্রচলিত রয়েছে। এসব সরাইখানায় সফরকারীর প্রয়োজনীয় সবকিছু এমনি কি হাঁস মুরগী অবধি থাকে। পক্ষান্তরে ভেড়া এখানে খুবই কম।
এবার আমাদের সফরের বিবরণী শুরু করা যাক। সমুদ্রযাত্রার শেষে প্রথম যে শহরে আমরা এসে পদার্পন করি তার নাম জয়তুন। যদিও জয়তুন শব্দের অর্থ জলপাই, তথাপি এ দেশের কোথাও জলপাই নেই। এমন কি সমগ্র চীনে বা ভারতে কোথাও জলপাই নেই। কাজেই এটি একটি জায়গার নামমাত্র। জয়তুন একটি বিস্তীর্ণ শহর। দামেস্ক রেশম নামে পরিচিত। রেশম ও সার্টিনের বয়ন-কার্য এ শহরেই হয়। খাসা ও খান্ বালিকের কাপড়ের চেয়েও এখানকার কাপড় উন্নত ধরণের। জয়তুনের বন্দর পৃথিবীর বড় বন্দরগুলোর অন্যতম, অথবা সবচেয়ে বড় বন্দর। আমি এ বন্দরে প্রায় শতেক বড় জাঙ্ক একত্র দেখেছি এবং ছোট জাঙ্ক এতো হাজার হাজার দেখেছি যে গুণে শেষ করা যায় না। সমুদ্রের একটি বৃহৎ খড়ি ভেতর দিকে এসে বড় নদীর সঙ্গে মিশে এ বন্দরের সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের নিজেদের দেশের শহর সিজিলমাসর১০ মতো চীনের এ শহরের এবং অন্য সমস্ত শহরের মধ্যস্থলে একটি লোকের ফলের বাগান, মাঠ ও বাসস্থান রয়েছে। এ জন্য এখানকার শহরগুলো বিস্তৃত। মুসলমানরা অন্য শহর থেকে। পৃথক শহরে বাস করে।
যে আমীর সুলতানের জন্য উপহার সামগ্রী নিয়ে দূত হিসেবে ভারতে গিয়েছিলেন, জয়তুন শহরে পৌঁছে সেদিন তাঁর দেখা পেলাম। ইনি আমাদের সঙ্গে আসতে পথে জাহাজডুবি হয়েছিলেন। আমাকে দেখেই ইনি সাদর সম্ভাষণ জানিয়ে বন্দর-রক্ষকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন এবং আমি যাতে ভাল বাসস্থান পাই তার ব্যবস্থা করে। দিলেন১১। মুসলমানদের কাজী, শেখ-উল-ইসলাম এবং প্রধান প্রধান ব্যবসায়ীরা এসে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। ব্যবসায়ীদের ভেতর ছিলেন তাব্রিজের শরাফউদ্দিন। ভারতে পৌঁছে এর কাছ থেকেই আমি টাকা ধার করেছিলাম এবং ইনি আমার সঙ্গে বিশেষ সদয় ব্যবহার করেছিলেন। তিনি কোরআনে হাফিজ ছিলেন এবং সর্বদা কোর আন আবৃত্তি করতেন। এসব ব্যবসায়ীরা বিধর্মীদের দেশে যে অবস্থায়ই বাস করুক না। কেননা, মুসলমানদের দেখলে অত্যন্ত খুশী হতেন। তারা বলতেন, “ইনি ইসলামের দেশ। থেকে এসেছেন। তারপর তারা নিজেদের সম্পত্তির দশম অংশও (Tithe) তাকে দিতেন যাতে সেও তাদেরই মতো ধনী হতে পারে১২। জয়তুনে তখন যে সব প্রসিদ্ধ শেখ বাস করতেন তাঁদের মধ্যে কাজারুনের বোরহানউদ্দিনও ছিলেন। শহরের বাইরে তার একটি আস্তানা আছে। ব্যবসায়ীরা কাজারুনের শেখ আবু ইসহাকের উদ্দেশ্যে যা-কিছু মানত করে তা এখানেই আদায় দেয়।
