চীন দেশের মোরগ মুরগী আকারে খুব বড়–এমন কি আমাদের দেশের রাজহাঁসের চেয়েও বড়। এখানকার মুরগীর ডিম আমাদের দেশের রাজহাঁসের ডিমের চেয়েও বড়। কিন্তু এখানকার রাজহাঁস মোটেই বড় নয়। আমরা একবার একটা মুরগী কিনে রান্নার আয়োজন করছিলাম। দেখলাম একটা মুরগীর গোশত একপাত্রে ধরে না। কাজেই দু’পাত্রে তা রাখতে হলো। এখানকার মোরগ আকারে প্রায় উটপাখীর সমান। অনেক সময় মোরগের গায়ের সমস্ত পালক ঝরে পড়ে যায়, তখন তার বিশাল লাল। দেহটা মাত্র অবশিষ্ট থাকে। সর্ব প্রথম আমি একটা চীনা মোরগ দেখতে পাই কালাম শহরে। আমি সেটাকে উটপাখী ভেবে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু তার মালিক আমাকে বলেছিলো, চীনে কোনো কোনো মোরগ এর চেয়েও বড় হয়। সে সত্যি কথাই যে বলেছিলো তা এখন নিজেই দেখে বুঝতে পারলাম।
চীনের অধিবাসীরা বিধর্মী। তারা হিন্দুদের মতো পুতুল পূজা করে এবং মৃতদেহ দাহ করে ৩। চীনের রাজা চেংঙ্গিস খার বংশধর একজন তাতার। প্রতি শহরেই মুসলমানদের বসবাসের জন্য একটি পৃথক মহল্লা আছে। সেখানে শুক্রবার নামাজের জন্য এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানের জন্য মসজিদও আছে। এখানে মুসলমানদের সম্মান ও শ্রদ্ধার চোখে দেখা হয়। বিধর্মী চীনারা শূকর ও কুকুরের মাংস ভক্ষণ করে এবং বাজারেও তা বিক্রি হয়। তারা ধনী ও সঙ্গতিপন্ন কিন্তু তাদের খাদ্যে ও পোষাকে তা বুঝা যায় না। একজন বিরাট ধনী সওদাগর ধন দৌলতের যার সীমা নেই, তাকেও দেখা যায় সাধারণ একটি শার্ট পরে থাকতে। কিন্তু একটি ব্যাপারে চীনারা গর্ব করতে পারে। তা হলো তাদের সোনা-রূপার বাসন। তাদের প্রত্যেকের হাতে দেখা যায় একটি লাঠি। লাঠিতে ভর করে তারা হাঁটে এবং লাঠিকে তারা তৃতীয় পা’ বলে। রেশমের প্রচলন এখানে খুব বেশী। কারণ, রেশমের গুটিপোকা এখানে ফলের উপরে লাগে এবং ফল খেয়েই বাঁচে। তাদের জন্য বিশেষ কোনো যত্ন নিতে হয় না। সেজন্য রেশমের। প্রচলন এতো বেশী যে নিতান্ত গরীবদের পর্যন্ত তা ব্যবহার করতে দেখা যায়। সওদাগরদের অভাবে রেশমের কোনো মূল্যই সেখানে থাকতো না। এক টুকরো সূতী। কাপড়ের পরিবর্তে চীনে বেশ কয়েক টুকরো রেশমী কাপড় পাওয়া যায়। এদের ব্যবসায়ীদের একটি রীতি এই, যার যা সোনা বা রূপা আছে তার সব গালিয়ে একটি তাল তৈরি করে। অনেক সময় তার ওজন হয় কম বেশী এক হর। পরে সে তাল ঘরের দরজার উপর রেখে দেয়।
চীনের লোকেরা কেনা-বেচায় সোনার দীনার বা রূপার দেরহাম ব্যবহার করে না। সোনা বা রূপা যাই তারা পায় সব গালিয়ে পূর্ববর্ণিত মতে তাল তৈরি করে রাখে। দেশের সমস্ত বেচা-কেনা চলে রাজার মোহরাঙ্কিত হাতের তালুর সমান কাগজের সাহায্যে। এরকম পঁচিশ টুকরো কাগজে হয় এক বালিশট। অর্থের পরিমাণ হিসাবে এক বালিশট আমাদের এক দিনারের সমান ৪। ক্রমাগত হাত বদল হতে-হতে এসব নোট যখন ছিঁড়ে যায় তখন আমাদের টাকশালের মতোই এক অফিসে নিয়ে ছেঁড়ার পরিবর্তে নতুন নোট পাওয়া যায়। এ পরিবর্তনের জন্য কোনো রকম মূল্য দিতে হয় ৫ না। কারণ যারা এসব নোট তৈরি করে তারা সুলতানের নিকট হতে নিয়মিত বেতন পেয়ে থাকে। এ অফিসের পরিচালনভার দেওয়া হয় প্রধান একজন আমীরের উপর। যদি কেউ একটি রৌপ্য দেরহাম বা দীনার নিয়ে কোনো কিছু কিনতে বাজারে যায় তবে জিনিষের বিনিময়ে কেউ তা নিতে রাজী হয় না বা তার প্রতি মনোযোগ দেয় না। তার। দেরহাম বালিশটে পরিবর্তন করার পরে তাই দিয়ে যা-খুশী সে কিনতে পারে।
চীন এবং ক্যাথের ৬ সকল বাসিন্দাই কাঠকয়লার পরিবর্তে তাদের দেশের এক রকমের মাটীর তাল ব্যবহার করে। এ মাটী আমাদের দেশের সাজিমাটীর মতো এবং রঙও সাজিমাটির মতো। সাজিমাটীর বোঝা বহনের জন্য হাতি ব্যবহৃত হয়। এ মাটী তারা কাঠকয়লার আকারে ভাঙ্গে এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। তখন এ মাটী কাঠকয়লার মতোই জ্বলতে থাকে, কিন্তু এ মাটীর আগুনের উত্তাপ কাঠকয়লার আগুনের উত্তাপের চেয়ে অনেক বেশী। এ মাটী পুড়ে ছাই হলে সে ছাই পানি দিয়ে ছানানো হয়। পরে তাই শুকিয়ে আবার রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয়। এমনি করে পুড়ে একেবারে নিঃশেষ হওয়া অবধি এ জিনিষ বার-বার ব্যবহার করা হয়। এ জিনিষের কাদার সঙ্গেই পাথর মিশিয়ে এরা যে বাসন কোসন তৈরি করে তা আগেই বলা হয়েছে।
চীনের সমস্ত অধিবাসীই শিল্পী হিসাবে অত্যন্ত নিপুণ, শিল্পে তাদের পূর্ণ দক্ষতা। তাদের এ বৈশিষ্ট্য সর্বত্র বিদিত এবং অনেক লেখকই তাদের গ্রন্থে এ বিষয়ে বার বার উল্লেখ করে গেছেন। সূক্ষ্ম প্রতিকৃতি অঙ্কণে গ্রীক বা অন্য কোনো দেশের শিল্পীর সঙ্গেই তাদের তুলনা হয় না। কারণ, অঙ্কনশিল্পে তারা অপূর্ব দক্ষতার পরিচয় দিয়ে থাকে। তাদের এ অসামান্য গুণের একটি দৃষ্টান্ত আমি নিজেই পেয়েছি। আমি দ্বিতীয়বার এমন। কোনো শহরে ফিরে আসিনি যেখানে প্রথম বারে আমাদের দেখে তাদের অঙ্কিত আমার। ও আমার সঙ্গীদের ছবি দেওয়ালের গায়ে বা কাগজের টুকরায় ঝুলানো অবস্থায় বাজারে দেখেছি। যে শহরে সুলতান বাস করেন সে শহরে এসে চিত্রশিল্পীদের বাজারের ভেতর দিয়ে আমি ও আমার সঙ্গীরা সুলতানের প্রাসাদে গিয়েছিলাম। আমাদের পরণে ছিল ইরাকী ধরণের পোষাক। বিকেলে প্রাসাদ থেকে ফিরবার সময় সেই পথেই এসে দেখতে পেলাম আমার ও সঙ্গীদের ছবি কাগজে একে তারা দেওয়ালে লাগিয়ে রেখেছে। আমরা তখন একে অপরের ছবি পরীক্ষা করে দেখলাম, প্রতিটি ছবি একেবারে নিখুঁতভাবেই আঁকা হয়েছে। শুনেছি, সুলতানের হুকুমে তারা এ-ছবি এঁকেছে। আমরা যখন প্রাসাদে উপস্থিত ছিলাম তখন তারাও সেখানে গিয়েছে এবং আমাদের অলক্ষ্যে সেখানে বসে এ ছবি এঁকে এনেছে। তাদের দেশে যারা যায় তাদের সবারই ছবি এঁকে রাখা এ দেশের একটি প্রচলিত রীতি। বস্তুতঃ এমন নিখুঁতভাবে তারা একাজ করে যে, কেউ যদি কোনো অপরাধ করে দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয় তবে তার ছবি দূর দুরান্তে পাঠানো হয়। তারপরে তার খোঁজ করা হয় এবং ছবির অনুরূপ কাউকে পেলে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
