৩। কাঁঠাল গাছ সম্বন্ধে ইউল এবং বার্ণেল, হসন-জসন দ্রষ্টব্য।
৪। জামুন হচ্ছে এক প্রকার ক্ষুদ্রাকৃতি ফল। দেখতে জলপাইর মতো, কিন্তু মিষ্টি। এ সম্বন্ধে ইব্নে বতুতা প্রথম দিকের অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন। এটা জাম্ব অথবা রোজ-আপেলের মতো নয়। উভয়টি সম্বন্ধে হস-জসন দেখুন।
৫। কিছু রকমের সরকারী অফিস সম্বন্ধে ‘গৃহশ্রেণী’ বলে যে শব্দ অনুদিত হয়েছে সে সম্বন্ধে আমার সন্দেহ রয়েছে। সঠিক ব্যাকরণ অনুসারে সারহা’ শব্দটি ‘গৃহশ্রেণী’ সম্পর্কে ব্যবহৃত হতে পারে (যেমন অনুবাদে হয়েছে)। কিন্তু খুব সম্ভব এটা বন্দরের নাম।
৬। মূল-জাওয়া সাধারণতঃ জাভা দ্বীপকে মনে করা হয়েছে-কিন্তু ইউল বিভিন্ন যুক্তি সহকারে এটাকে মালয় উপদ্বীপ বলে সাব্যস্ত করেছেন। এই মত অনুসারে কাকুল বন্দর এবং শহর মালয় উপদ্বীপের পূর্ব সদ্র উপকূলে অবস্থিত বলে ধরতে হয় এবং সেটা কেলান্টানের নিকটবর্তী।
কামারা নিশ্চিত ভাবেই খামের, ক্যাম্বোডিয়ার পুরাতন নাম। এটা সিয়াম উপসাগরের বিপরীত দিকে অবস্থিত। (ক্যাথে, ৪র্থ খণ্ড, ১৫৫)।
৭। এই কিছুটা আক্রমণমূলক বাক্য ছিল অমুসলিমদের সালাম জানাবার পদ্ধতি (cf. ২১৪ পৃঃ)-আচ্ছালাম আলায়কুম (আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক) কথাটি কেবল মুসলিমদের প্রতি প্রযোজ্য। যদিও ইব্নে বতুতাকে মাঝে-মাঝে এ নিয়ম ভাঙতে দেখা যাছে।
৮। স্থির সমুদ্রকে’ এ স্থানে ইব্নে বতুতা আরব-পার্শিয়ান নাম ‘আল-বাহার আল্-কাহল নামে অভিহিত করেছেন। অন্য সমসাময়িক লেখকগণও বিভিন্ন নামে এর উল্লেখ করেছেন। (যেমন কালো সমুদ্র, অন্ধকার সমুদ্র) এটা সর্ব পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত। সেজন্য এটা মনে হয় আমাদের চীনে সমুদ্র বা কতকগুলি নিকটবর্তী সমুদ্রের সঙ্গে সম্পর্কে রয়েছে। ইব্নে বতুতার বর্ণনায় কথাগুলি থেকে দেখা যায় যে এটা নিয়মিত পথের উপরে ছিল।
৯। রাজা তাওয়ালিসি এবং তার কেলুকারী নগরের পরিচয় নির্ধারণে ইব্নে বতুতার ব্যাখ্যাকারীগণ তাদের সমস্ত বিচক্ষণতার ব্যবহার করেছেন। সেলিবিস, তকিন, ক্যাম্বোডিয়া, কোচিন-চীন, কোয়ানসি প্রদেশ, ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জ, সুলু দ্বীপমালা প্রভৃতি অনেক স্থানের কথা বলা হয়েছে। ইউল অন্যগুলি অপেক্ষা শেষ সিদ্ধান্তটি বেশী সম্ভব বলে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু এ কথাও তার আগে স্বীকার করেছেন “কিঞ্চিৎ সন্দেহে ভরে- তাওয়ালিসির ব্যাপারে আলাসের। সে অংশে আমাদের খোঁজ নিতে হবে যেটা পরলোকগত কাপ্তেন গালিভারের সামুদ্রিক সার্ভের মধ্যে রয়েছে।” বর্ণনার বিস্ময়কর বিষয় যোদ্ধা রাজকুমারীর অস্তিত্ব নয়- সেটা হচ্ছে তার তুর্কী নাম (ইব্নে বতুতা ইতিপূর্বেই তার নাম দিয়েছেন সুলতান উজবেক ধানের চতুর্থা রাণী রূপে।) এবং তুর্কী ভাষা। ডাক্তার ভন মাজিক অনুসরণে ইউল বলছেন যে সেই বীরঙ্গনা নারীর পরাক্রমের কাহিনী হয়তো কেদখানের শক্তিশালিনী কন্যা আইজাকুকের গল্প থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। এ কাহিনী হয়তো ইব্নে বতুতা শুনেছেন সমুদ্রচারী নাবিকদের কাছে থেকে। আইজাকুক প্রকৃতপক্ষে তুর্কী নাম। খুব সম্ভব ইব্নে বতুতা এটা একই উচ্চারণমূলক উরদুজা। নামের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেছেন। কেননা বিদেশী নামের ব্যাপারে তার স্মৃতিশক্তি খুব ভালো ছিল না। এ ভাবে কেকারী প্রকৃতপক্ষে ভারতের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত একটি সমুদ্র বন্দরের নাম ছিল (পরিচ্ছেদ ৯, টীকা ৩ দ্রষ্টব্য)- এটাকে সম্ভবতঃ ইব্নে বতুতা রাজা “তেয়ালিসির বন্দরের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেছেন। (ক্যোথে, ৪র্থ খণ্ড, ১৫৭-৬০; মার্কোপলো, ২য় খণ্ড, ৪৬৫; জি, ফেরাও, টেস্ট রিলেটিক্স এ লা একস্ট্রীম ওরিয়েন্ট (৪৩১-৩)>।
১১. সম্পদশালী চীন
এগারো
প্রচুর ফল, শস্য ও স্বর্ণ রৌপ্য প্রভৃতি সম্পদে সম্পদশালী চীন একটি বিশাল দেশ। সম্পদের দিক থেকে প্রতিযোগিতা করতে পারে দুনিয়ায় এমন দেশ আর নেই। খান বালিকা (পিকিং) শহরের কাছে বানরের পর্বত (Mountain of Apes) নামক পর্বতমালা থেকে আবে-হায়াত (water of Life) নামক একটি নদী এ দেশের মধ্যে। দিয়ে দীর্ঘ ছ মাসের পথ অবধি বয়ে গিয়ে সিন-আস-সিন (ক্যান্টন) অবধি পৌচেছে। মিশরের নীল নদের মতো এ নদীর দু’তীরে রয়েছে গ্রাম, মাঠ, ফলের বাগান ও বাজার। শুধু নীল নদের তুলনায় এ নদীর তীরবর্তী দেশগুলো অধিকতর শস্য-শ্যামল এবং জনবহুল। নদীর স্রোতে চালিত কলও এখানে বেশি। মিশরের মতো এমন কি মিশরের চেয়ে উৎকৃষ্টতর প্রচুর ইক্ষু চীনে জন্মে আর জন্মে কুল ও আঙ্গুর। চীন দেশের কুল দেখবার আগে আমি ভাবতাম দামেস্কের ওসমানী কুলের সমতুল্য কুল আর কোথাও নেই। খারিজম ও ইসপাহানের মতো এখানে চমৎকার তরমুজও পাওয়া যায়। আমাদের দেশে যেসব ফল আছে তার সবই এখানে পাওয়া যায়। তার কতকগুলো সমকক্ষ কতকগুলো উদ্ধৃষ্ট। এখানে যবও প্রচুর জন্মে। এমন উৎকৃষ্ট যব আমি কোথাও দেখিনি। এখানকার মসুর ও মটর সম্বন্ধেও একই কথা বলা চলে।
চীনা বাসন-কোসন কেবল মাত্র জয়তুন ও সিন-কালান শহরে তৈরী হয়। এ অঞ্চলের কোনো কোনো পাহাড়ের মাটী কাঠকয়লার মতোই জ্বলে। সে মাটী দিয়েই এ সব তৈরি করা হয়। পরে আমরা সে বিষয় আলোচনা করবো। এ মাটী তারা তাদের এক রকম পাথরের সঙ্গে মিশ্রিত করে। তারপর তিন দিন অবধি তা আগুনে পুড়িয়ে তার। উপর পানি ঢালে। এর ফলে এক রকম কাদা তৈরি হয়। সে কাদা পরে গাঁজানো হয়। একমাসকাল গাঁজানো কাদা দিয়ে উৎকৃষ্ট শ্রেণীর বাসন-কোসন (Porcelain) তৈরি হয়। তার বেশি দিন দরকার হয় না। দশদিন গাঁজানো কাদার তৈরি জিনিষ নিকৃষ্ট। এখানে এসব চীনেমাটীর জিনিষের দাম আমাদের দেশের অতি সাধারণ বাসন কোসনের সমান অথবা তার চেয়েও কম। এসব ভারতে এবং অন্যান্য দেশে চালান হয়। এমন কি এসব জিনিষ পশ্চিমে আমাদের দেশ অবধি গিয়ে পৌঁছে। এখানকার বাসন-কোসন অন্য যে কোনো বাসনের তুলনায় উৎকৃষ্ট।
