অতঃপর আমরা তাবালিসির রাজ্যে এসে পৌঁছলাম। তাবালিসি এখানকার রাজার নাম। এ দেশটি বিশাল। এ দেশের রাজা চীনের রাজার বিরোধী বা প্রতিদ্বন্দ্বী। রাজার অনেকগুলো জাঙ্ক আছে। চীনেরা কতগুলো শর্ত মেনে না-নেওয়া পর্যন্ত তিনি তাদের সঙ্গে এ সব জাঙ্কের সাহায্যে যুদ্ধ করেন। এখানকার বাসিন্দারা পৌত্তলিক। দেখতে তারা সুশ্রী এবং শরীরের গঠন তুর্কীদের মতো। তাদের গাত্রবর্ণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে লালচে। এরা যেমন সাহসী, তেমন যুদ্ধে পটু। মেয়েরা অশ্বারোহণ করে এবং তীরন্দাজ হিসেবেও তারা পটিয়সি। যুদ্ধক্ষেত্রেও তারা পুরুষের মতোই সমান দক্ষ। কায়লুকারী শহরের এক বন্দরে আমরা বাস করেছি। তাদের যে সব সুন্দর ও বড় শহর আছে তার। ভেতর এটি একটি। পূর্বে এ শহরে তাদের রাজপুত্র বাস করতেন। বন্দরে এসে আমরা নোঙ্গর কতেই সৈন্যরা এগিয়ে এলো। আমাদের কাপ্তেন রাজপুত্রের জন্য কিছু উপহার। দ্রব্য নিয়ে তাদের কাছে গেলেন। রাজপুত্রের কথা জিজ্ঞেস করায় সৈন্যরা জানালো, রাজা তাকে অন্য একটি জেলার শাসনকর্তা নিযুক্ত করেছেন এবং এখানকার শাসনভার দিয়েছেন তার কন্যা উরদূজার উপর।
আমরা যেদিন কায়লুকারী পৌঁছি তার পরদিন এ রাজকুমারী তাঁর রীতি অনুযায়ী। জাহাজের কাপ্তেন, কেরানী, সওদাগর, আড়কাঠি, পদাতিকদের সেনাপতি ও তীরন্দাজদের সেনাপতিকে এক ভোজসভায় আমন্ত্রণ করলেন। কানে তাঁর সঙ্গে আমাকে নিয়ে যেতে চাইলেন। আমি তাতে স্বীকৃত হলাম না। কারণ, বিধর্মীদের খাদ্য গ্রহণ আমাদের জন্য ধর্মানুমোদিত নয়। তারা রাজকুমারীর কাছে যেতেই, কেউ অনুপস্থিত আছে কিনা তিনি জানতে চাইলেন। কাপ্তেন বললেন, একজন লোক শুধু আসেনি। তিনি একজন বখশী (তাদের ভাষায় কাজী) এবং তিনি আপনার খাদ্য গ্রহণ করেন না।
একথা শুনে তিনি আমাকে ডাকতে হুকুম করলেন। জাহাজের লোকজনসহ তার রক্ষীরা এসে আমাকে রাজকুমারীর সঙ্গে দেখা করার অনুরোধ জানালো। আমি গিয়ে। দেখলাম তিনি পূর্ণ রাজকীয় শানশওকতের সঙ্গে বসে আছেন। তাঁকে অভিবাদন জানাতে তুকী ভাষায় তিনি জবাব দিলেন এবং আমি কোন দেশ থেকে এসেছি জিজ্ঞেস করলেন। আমি বললাম, ভারত থেকে এসেছি।
তিনি বললেন, মরিচের দেশ?
হ্যাঁ।
অতঃপর তিনি এদেশ-ওদেশের নানা ব্যাপার জিজ্ঞাসা করলেন। আমার জবাব শুনে তিনি বললেন, আমি নিশ্চয়ই একবার ভারত অভিযান করে জয় করবো। সে দেশের ধনসম্পদ ও সৈন্যবল আমাকে আকর্ষণ করে।
আমি বললাম, হ্যাঁ, তাই করুন।
তিনি আমাকে পোশাক, দুটি হাতি বোঝাই চাউল, দুইটি মহিষ, দশটি ভেড়া, চার পাউন্ড সিরাপ, চারটি মর্তমান (বড় বৈয়াম) দিতে হুকুম করলেন। বৈয়ামগুলিতে আদা, মরিচ, লেবু, ও আম অতি ছিলো।
কাপ্তেন বললেন, এ যুবরাজ্ঞীর সেনাদলে এমন সব নারী, পরিচারিকা ও ক্রীতদাসী আছে যারা পুরুষের মতোই যুদ্ধ করতে পারে। তিনি নিজে তার নারী-পুরুষ সৈন্যদের সঙ্গে অভিযানে যান এবং বিশেষ বিশেষ যোদ্ধাদের সঙ্গে একক যুদ্ধ করেন। কাপ্তেন একথাও বললেন, কোন এক যুদ্ধে তাঁর অনেক সৈন্য মারা যায়, তার ফলে তারা পরাজয়। বরণ করতে বাধ্য হয়। কিন্তু তখন তিনি নিজে শত্রু সৈন্য ভেদ করে অগ্রসর হন এবং যে রাজার সঙ্গে যুদ্ধ হচ্ছে তার সম্মুখে গিয়ে তাকে মারাত্মকভাবে বর্শা দ্বারা আঘাত করেন। ফলে সেখানেই তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হন এবং তার সৈন্যদল পলায়ন করে। যুবরাজ্ঞী তখন বর্শায় বিদ্ধ করে রাজার মস্তকটি নিয়ে আসেন। অতঃপর রাজার আত্মীয়েরা বহু অর্থের বিনিময়ে সে মস্তকটি ফিরিয়ে নেয়। যখন তিনি ফিরে এলেন তখন তাঁর পিতা তাঁকে এ-ঘরের শাসনভার দেন। আগে এর শাসনভার ন্যস্ত ছিল তাঁর ভাইয়ের উপর। কাপ্তেন আরো বললেন, অনেক যুবরাজ তাকে বিয়ে করার প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলেন; কিন্তু তিনি বলেছেন, একক যুদ্ধে যিনি তাকে পরাজিত করতে পারবেন তিনি তাকে ছাড়া আর কাউকেই বিয়ে করতে রাজী নন। যুদ্ধে পরাজিত হবার ভয়ে কেউ আর এ প্রস্তাব নিয়ে অগ্রসর হয়নি।
অতঃপর তাবালিসির দেশ ছেড়ে অনুকূল বাতাসে দ্রুত পাল খাঁটিয়ে আমরা সতেরো দিন পরে চীন দেশে গিয়ে পৌঁছলাম।
***
টিকা
পরিচ্ছেদ ১০
১। বারানাকর স্থানটি ইনে বতুতা কর্তৃক এর অধিবাসীদের যে বিবরণ দেওয়া হয়েছে সে অনুসারে পূর্বে আন্দামান বা নিকোবর দ্বীপগুলির অন্যতম বলে স্থির করা হয়। ইউল দেখিয়েছেন এটাকে বর্ষার অন্তর্গত আরাকানের প্রধান ভূমিতে অবস্থিত নিগ্রেস দ্বীপের নিকটবর্তী স্থান বলে। কিন্তু ইব্নে বতুতার গ্রন্থে দেখা যাচ্ছে যে এটা কোনো দেশের নাম নয়, বরঞ্চ জাতির নাম (ক্যাথে, ৪র্থ খণ্ড, ৯২; মার্কোপলো ২য় খণ্ড, ৩০৯-১২)।
২। জাওয়া নামটি সাধারণতঃ প্রয়োগ করা হয়েছে মালয়ের ব্যাপারে। জাওয়া (ক্ষুদ্র) হচ্ছে সুমাত্রা, এবং জাওয়া (বৃহত্তর) হচ্ছে খাশ জাওয়া দ্বীপ এখন সে দ্বীপটিকে জাভা বলা হয়। সুমাত্রায় ইসলামের পরিবর্তন হয় ক্রমে ক্রমে দক্ষিণ ভারতের সওদাগর এবং ধর্মপ্রচারকগণ কর্তৃক তেরো শতাব্দীতে। সেই একই শতাব্দীতে শেষ যুগ থেকে দ্বীপটিতে শুরু হয় মুসলিম শাসন- সম্ভবতঃ সুমাত্রা শহর প্রতিষ্ঠার কিছু বছর আগে। আল-মালিক আজ-জহির পদবী গ্রহণ করেন বিস্নি মুসলিম শাসক।
