কাকুলা বন্দরে পৌঁছে আমরা দেখলাম, কতকগুলো জাঙ্ক জলদস্যুদের উপর অভিযান চালাবার জন্যে এবং অপর যে জাঙ্কই তাদের প্রতিরোধ করতে আসুক তাদের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধাতে তৈরি হয়ে আছে।
আমরা বন্দরে নেমে গেলাম। সুন্দর পাথরের দেওয়াল দিয়ে ঘেরা কাকুলা একটা চমৎকার শহর। দেওয়ালটি এতো চওড়া যে, তিনটি হাতি উপর দিয়ে পাশাপাশি যেতে পারে। শহরের বাইরে প্রথম যা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো ভারবাহী হাতি ভারতীয় মুসাব্বর বয়ে নিয়ে চলেছে। এখানকার লোকেরা বাড়ীতে মুসাব্বর জ্বালায়। আমাদের। জ্বালানী কাঠের যা দাম এদের জন্য মুসাব্বরের দামও তাই, অনেক সময় তারও কম। অবিশ্যি তাদের নিজেদের ভেতর বেচাকেনার সময়ই দর সস্তা। বাইরের লোকের কাছে এক বোঝা মুসাব্বরের পরিবর্তে এরা এক থান সূতী কাপড় আদায় করে। কারণ, সূতী কাপড় এ দেশে রেশমী কাপড়ের চেয়েও মূল্যবান। এদেশে হাতির প্রাচুর্য খুব বেশী। এখানকার লোকেরা হাতির পিঠে আরোহণ করে এবং মালামাল বহনের জন্যও ব্যবহার করে। প্রত্যেক লোককেই দেখা যায় যে, তার হাতীগুলো বাড়ীর দরজায় বেঁধে রেখেছে। প্রত্যেক দোকানদার অবধি বাড়ী ফিরে যাওয়া বা মালামাল আনয়নের জন্য নিজের কাছে হাতি রাখে। চীনে এ কালে (উত্তর চীনে) হাতি সম্বন্ধে একই ব্যবস্থা।
মূল-জাওয়ার সুলতান একজন বিধর্মী। তাকে দেখলাম প্রাসাদের বাইরে একটি বেদীর পাশে মাটিতে বসে আছেন। তার সঙ্গে ছিলেন রাজকর্মচারিগণ। সৈন্যরা তাঁর সামনে দিয়ে কুচকাওয়াজ করে যাচ্ছিল। সবাই পদাতিক সৈন্য, কারণ একমাত্র সুলতানের নিজস্ব ঘোড়া ছাড়া আর কোনো ঘোড়া নেই। আরোহণ ও যুদ্ধের জন্য হাতি ছাড়া অন্য কোন জানোয়ারও সেখানেই নেই। সুলতানকে আমার কথা বলায় তিনি আমাকে ডেকে পাঠান। আমি এগিয়ে গিয়ে বললাম, যারা সত্য ধর্ম পালন করে তাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। তারা আসোলাম’ শব্দটি ছাড়া আর কিছুই বুঝতে পারলো না। সুলতান আমাকে অভ্যর্থনা জানালেন এবং আমার বসবার জন্য একখানা কাপড় এনে বিছিয়ে দিতে বললেন। আমি তখন দোভাষীকে বললাম, সুলতান নিজে মাটিতে বসলে আমি কি করে কাপড়ের উপর বসতে পারি?
দোভাষী বললেন, এটা তার অভ্যেস।….
আপনি মেহমান এবং প্রসিদ্ধ একজন সুলতানের কাছ থেকে এসেছেন বলে ইনি আপনাকে সম্মান দেখাচ্ছেন।
তখন আমি বসলাম। ভারত সুলতানের কথা সংক্ষেপে জিজ্ঞেস করে তিনি বললেন, আপনি একজন মেহমান হিসাবে তিন দিন আমাদের সঙ্গে থাকবেন। পরে আপনি চলে যেতে পারেন।
সুলতান যখন দরবারে বসেছেন তখন তার সামনে একজন লোক ছুরি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ছুরিখানা অনেকটা পুস্তক বাধাইকারীদের যন্ত্রের মতো। নিজের ঘাড়ের উপর সেই ছুরিখানা রেখে সে অবোধ্য ভাষায় লম্বা একটি বক্তৃতা দিলো। তারপর দু’হাতে শক্ত করে সে ছুরি ধরে নিজের গলা কেটে ফেললো। ছুরিখানা এত তীক্ষ্ণ ধার ছিলো এবং সে তা ধরে ছিল এমন শক্তভাবে যে তার মাথাটা কেটে মাটিতে পড়ে গেলো। তার এ কাণ্ড দেখে আমি অবাক হয়ে রইলাম। সুলতান আমাকে বললেন, আপনাদের দেশে এমন কেউ করে কি?
আমি বললাম, এ ধরণের ব্যাপার জীবনে আমি দেখিনি।
তিনি হেসে বললেন, এরা আমাদের গোলাম। আমাদের প্রতি অনুরাগ দেখানোর জন্য এরা এভাবে আত্মাহুতি দেয়।
লাশটাকে সরিয়ে নিয়ে তিনি পোড়াবার হুকুম দিলেন। সুলতানের প্রতিনিধি, রাজকর্মচারী, সৈন্য ও নাগরিক সবাই লাশটির সত্তারের জন্য চলে গেলো। সুলতান মৃত ব্যক্তির স্ত্রী, পুত্রকন্যা ও ভ্রাতাদের জন্য পর্যাপ্ত ভাতার ব্যবস্থা করে দিলেন। এ ঘটনার পর মৃত ব্যক্তির আত্মীয়দের সম্মান অনেক বেড়ে গেলো।
সেদিন দরবারে উপস্থিত একজন লোক আমাকে বলেছিলো, ঐ মৃত ব্যক্তি লম্বা বক্তৃতা দিয়ে ঘোষণা করছিলো, সে সুলতানকে ভালবাসে, সুলতানের ভালবাসার জন্য সে নিজের জান কোরবান করছে। কারণ, তার পিতাও সুলতানের পিতাকে ভালবেসে নিজের জান কোরবান করে গেছেন এবং পিতামহ কোরবান করেছেন সুলতানের পিতামহের ভালবাসায়।
অতঃপর আমি দরবার থেকে চলে এলাম। সুলতান আমাকে তিন দিনের উপযোগী দ্রব্যসম্ভার পাঠিয়ে দিলেন।
সদ্রপথে পুনরায় যাত্রা শুরু করে চৌত্রিশ দিন পর আমরা নিশ্চল এক সমুদ্রে এসে পড়লাম। এ সমুদ্রের পানির রং লালচে ধরণের। লোকে বলে, নিকটস্থ একটি জায়গার মাটির রংয়ের দরুণ পানির রং এমন হয়েছে। সমুদ্রের বুকে হাওয়া বাতাস, ঢেউ বা কোনো রকম সচলতার কোনো চিহ্ন নেই, যদিও এর বিস্তৃতি বিশাল। এ কারণেই প্রতিটি চীন দেশীয় জাঙ্কের সঙ্গে তিনটি করে নৌকা থাকে। আগেই তা উল্লেখ করা হয়েছে। তারা জাঙ্ক টেনে নেয়, দাঁড় বেয়ে এগিয়ে নেয়। তাছাড়াও প্রত্যেক জাঙ্কে মাস্তুলের মতো বড় বিশখানা করে দাঁড় আছে। প্রায় ত্রিশজন করে দাড়ী। দু’লাইনে সামনা সামনি দাঁড়িয়ে প্রতিটি দাঁড় টানে। দাঁড়গুলোর সঙ্গে কাছির মতো মোটা দু’গাছি দড়ি বাঁধা থাকে। একদল দড়িটি নিজেদের দিকে টেনে ছেড়ে দেয়, তখন আবার অপর দল সেটা নিজেদের দিকে টানে। এ রকম করতে-করতে তারা গানের সুরে সাধারণতঃ লা-লা শব্দ করে। এ সমুদ্রে আমাদের সাইত্রিশ দিন কাটে। আমাদের এ অগ্রগতিতে নাবিকরা বিস্মিত হয়ে গেলো। কারণ, এ সমুদ্র পার হতে সাধারণতঃ চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ দিন পর্যন্ত লাগে। বিশেষ অনুকুল অবস্থার মধ্যেও সবচেয়ে কম চব্বিশ দিন সময়। এ সমুদ্রে কাটে।
