প্রাসাদের দিকে এগিয়ে যেতে-যেতে আমরা কাছাকাছি গিয়ে দেখলাম, পথের দু’পাশে মাটিতে কতকগুলো বর্শা পুতে রাখা হয়েছে। এ অবধি এসে ঘোড়া থেকে নামতে হবে তারই নির্দেশ দিচ্ছে বর্শাগুলো। ঘোড়ার পিঠে যারা আসে এর বেশী তারা যেতে পারে না। আমরা তাই এখানে এসে ঘোড়া থেকে নামলাম। দরবার-গৃহে পৌঁছে সুলতানের প্রতিনিধির সঙ্গে আমাদের দেখা হলো। তিনি উঠে আমাদের সঙ্গে মোসাফাহ করলেন। আমরা তার সঙ্গে গিয়ে বসলে তিনি আমাদের আগমন-বার্তা সুলতানকে লিখে সইমোহর করে একজন ভৃত্যের হাতে দিলেন। চিঠির অপর পৃষ্ঠে সুলতানের লিখিত জবাব নিয়ে ভৃত্য ফিরে এলো। অত:পর একজন ভৃত্য নিয়ে সে একটি বাফশা বা কাপড়ের থলে হাতে দিলেন। চিঠির অপর পৃষ্ঠে সুলতানের লিখিত জবাব নিয়ে ভৃত্য। সুলতানের প্রতিনিধি থলেটি নিয়ে আমাকে হাত ধরে ছোট একটি ঘরে নিয়ে হাজির করলেন। তিনি দিনের বেলা বিশ্রামের সময় এ ঘরে কাটান। তাই বাফশা থেকে তিনটি আঙরাখা বের করা হলো। তার একটি খাঁটি রেশমী, আরেকটি রেশম ও সূতার মিশ্রণ, অপরটি রেশম ও লিনেন। অ্যাপ্রন জাতীয় আরও তিনটি পোশাক যাকে এরা বলে অন্তর্বাস, বিভিন্ন ধরনের আরও তিনটি মধ্যবাস (middle clothing), উলের তিনটি আলখেল্লা, তার একটি শাদা এবং তিনটি পাগড়ী। তাদের রীতি অসুসারে পায়জামার পরিবর্তে একটি অ্যাপ্রন ও একটি করে প্রত্যেক রকমের পোশাক পরে নিলাম। আমার সঙ্গীদেরও তাই করতে হলো। আহারের পর আমরা প্রাসাদ ত্যাগ করে ঘোড়ায় চড়ে কাঠের দেওয়ালঘেরা একটি বাগানে গিয়ে হাজির হলাম। বাগানের মধ্যস্থলে কাঠের তৈরী একটি ঘর। সূতী মখমল কাপড়ের ফালি দিয়ে কয়েকটি মেঝে মোড়া হয়েছে। ফালিগুলোর কয়েকটি রঙীন, বাকি কয়েকটি রঙীন নয়। আমরা প্রতিনিধির সঙ্গে সেখানে বসলাম। অতঃপর আমীর দৌলাসা দুজন বাদী ও দু’জন গোলাম নিয়ে এসে বললেন, সুলতান বলেছেন, এ উপহার তার ক্ষমতার উপযোগী, ভারতের সুলতান মোহাম্মদের উপযোগী নয়। এরপর প্রতিনিধি চলে গেলেন, আমীর দৌলাসা রইলেন আমাদের সঙ্গে।
আমীরের সঙ্গে এভাবে আমার আলাপ পরিচয় হলো যেননা, তিনি দিল্লীর সুলতানের কাছে দূত হিসাবে এসেছেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, সুলতানের সঙ্গে দেখা করতে পারি?
তিনি বললেন, সুলতানের সঙ্গে দেখা করবার আগে মুসাফেরকে পথের ক্লান্তি দূর করবার জন্য তিন রাত্রি বিশ্রাম করতে হয়। এই আমাদের দেশের রীতি।
আমরা তিনদিন সেখানে কাটালাম। দৈনিক তিনবার আমাদের খাবার দেওয়া হতো। প্রতি ভোরে ও সন্ধ্যায় দেওয়া হতো ফল ও দুর্লভ ধরনের মিষ্টি। চতুর্থ দিনটি ছিলো শুক্রবার। আমীর এসে বললেন, নামাজের পরে আজ আপনি মসজিদের রাজকীয় চত্বরে সুলতানের দেখা পাবেন।
নামাজ শেষে আমি সুলতানের কাছে যেতে তিনি আমার সঙ্গে মোসাফাহ্ করলেন, আমি তাকে কুর্নিশ করলাম। তাঁর বাঁ পাশে আমাকে বসিয়ে তিনি সুলতান মোহাম্মদ ও আমার সফরের বৃত্তান্ত জিজ্ঞাসা করলেন। আসরের নামাজ অবধি তিনি মসজিদের মধ্যেই কাটালেন। নামাজের পর একটি কামরায় ঢুকে তিনি পোশাক পরিবর্তন করে এলেন। সাধারণতঃ ধর্মশাস্ত্রজ্ঞ ব্যক্তিরা যে ধরনের পোশাক পরেন, শুক্রবার মসজিদে আসতে সুলতান সে রকম পোশাক পরেন। পোশাক পরিবর্তন করে তিনি তার রাজকীয় পোশাক রেশমী ও সূতী আলখেল্লা পরিধান করলেন। মসজিদের বাইরে এসে তিনি প্রবেশদ্বারে দেখলেন হাতি ও ঘোড়া তৈরি রয়েছে। সুলতান যখন হাতিতে সওয়ার হন। তখন তাঁর সঙ্গীরা যান ঘোড়ায়, আর সুলতান মোড়ায় চড়লে বাকি সবাই হাতিতে। এ ক্ষেত্রে তিনি সওয়ার হলেন একটি হাতির পিঠে। কাজেই আমরা ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে। তার সঙ্গে দরবার-গৃহে হাজির হলাম। আমরা নির্দিষ্ট স্থানে (যেখানে বর্শা রয়েছে) গিয়ে ঘোড়া থেকে নামলাম, কিন্তু সুলতান হাতির পিঠেই প্রাসাদের যেখানে দরবার বসেছে সেখানে নিজের আসনের সামনে উপস্থিত হলেন। কয়েকজন পুরুষ গায়ক এসে তাঁর সামনে গান গেয়ে গেলো। তারপর আনা হলো কয়েকটি ঘোড়া। রেশমী কাপড়ে সে সব ঘোড়র পিঠ আচ্ছাদিত, পায়ে সোনার ঘুঙুর, গলায় জরির কাজ করা রেশমী কাপড়। এ ঘোড়াগুলো তার সামনে এসে নৃত্য করতে লাগলো। যদিও এ জিনিস আমি দিল্লীর শাহী-দরবারে দেখেছিলাম, তবু ঘোড়ার নৃত্য দেখে আশ্চর্য হলাম।
সুমাত্রার শাহী-দরবারে পনেরো দিন কাটালাম। এদিকে চীন-যাত্রার মৌসুম তখন এসে গেছে। কারণ, বছরের যে-কোন সময়ে চীনে যাত্রা করা সম্ভব নয়। কাজেই সুলতানের কাছে যাত্রা শুরু করার অনুমতি চাইতে হলো। তিনি আমাদের জন্য একটি জাঙ্ক বা চীন দেশীয় নৌকার সাজসরঞ্জাম ঠিক করে যাত্রার উপযোগী করে দিলেন এবং পথের জন্য খাদ্যদ্রব্য ও অনেক উপহার দিলেন। খোদা যেন তাকে এর প্রতিদান দেন। সুলতানের একজন পারিষদ এসে উপহার দ্রব্য জাঙ্কে পৌঁছে দিয়ে গেলেন। আমরা একাধিক্রমে একুশ রাত তার রাজ্যের উপকূল ঘেঁষে নৌকা চালিয়ে এলাম। একুশ দিন চলার পর বিধর্মীদের দেশ মূল-জাওয়া এসে পৌঁছলাম। এ দেশটির দৈর্ঘ্য দু’মাসের পথ। এখানে প্রচুর সুগন্ধি মসল্লাপাতি, কাকুলি ও কামারি নামক উক্তৃষ্ট মুসাব্বর পাওয়া যায়। কাকুলা ও কামারা এ রাজ্যের দুটি অংশ। এ নামানুসারে মুসাব্বরের নাম কাকুলি ও কামারি হয়েছে। সুমাত্রার সুলতানের রাজ্যে শুধুমাত্র ধূপ, কর্পূর, সামান্য পরিমাণ লবণ, ও ভারতীয় মুসাব্বর পাওয়া যায়; কিন্তু এ সব দ্রব্যের বেশীর ভাগই পাওয়া যায় মূল-জাওয়ায়।
