৮। লখিনাওতি (লক্ষমনওয়াতি) মানে লক্ষনাবতী হচ্ছে গৌড়ের পুরাতন নাম। এটা অনেক দিন বাংলার মুসলিম শাসকদের রাজধানী ছিল। এ শহর তারা জয় করেছিলেন ১২০৪ খ্রীষ্টাব্দে। মালদহের নিকটে এর ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। বাংলাদেশের তিনটি জেলা এ নাম গ্রহণ করেছিল (টীকা ১৩ দ্রষ্টব্য)। এ জেলা তিনটি ছিল গঙ্গা এবং ব্রহ্মপুত্রের মাঝখানে।
৯। এ কথা ইউল সম্পূর্ণভাবে স্থির করেছেন যে (ক্যাথে, ৪র্থ খণ্ড, ১৫১-৫) ইব্নে বতুতা যে জেলাটি ভ্রমণ করেছিলেন সেটা সিলেট। সেখানে শাজালালের সমাধি এখনো সম্মানিত হয়ে থাকে (শেখ জালালউদ্দীন) কামরু বলে যে স্থানটির নাম করা হয়েছে সেটা শুদ্ধভাবে কামরূপ। এটা আসামে যুক্ত একটি জেলার নাম। এ স্থানের ইন্দোচীনে জনসাধারণ মোঙ্গলিয়ান চরিত্রের পরিবাহক।
১০। নীল নদী হচ্ছে মেঘনা। বারাকের বাম তীরে অবস্থিত। বারাক এর একটি শীর্ষস্থানীয় নদী। এখানে এখনো একটি টিলা বা নিচু পাহাড় রয়েছে। একে বলা হয় হাবাং-হবিগঞ্জের কিছুটা দক্ষিণে অবস্থিত।
১১। সোনার গাঁও ঢাকা থেকে ১৫ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে। এটা ছিল মুসলিমগণের বঙ্গদেশের অন্যতম পুরাতন রাজধানী এবং এর নাম দেওয়া হয়েছিল বাংলার তিনটি জেলার একটিকে। তৃতীয়টি ছিল সাতগাঁও।
১০. বরাহনকদের দেশে
দশ
আমরা বরাহনকদের দেশে এসে পৌঁছলাম। এরা ইতর শ্রেনীর লোক এবং কোনো ধর্ম মানে না। সাগরের পাড়ে ঘাস দিয়ে ছাওয়া নল খাগড়ার তৈরী কুঁড়ে ঘরে এরা বাস করে। এদের প্রচুর কলাগাছ ও পান-সুপারীর গাছ আছে। এদের পুরুষদের গঠন আমাদেরই মতো, শুধু মুখটির আকৃতি কুকুরের মুখের মতো, কিন্তু মেয়েদের বেলা আবার তা নয়। তারা যথেষ্ট সুন্দরী। পুরুষরা উলঙ্গ থাকে, এমন কি লজ্জাস্থানও আবৃত করে না। সময় সময় নলের তৈরী একটি থলে এদের কোমর থেকে ঝুলতে দেখা যায়। মেয়েরা গাছের পাতা দিয়ে দেহের সম্মুখ ভাগ আবৃত রাখে। তাদের মধ্যে ভিন্ন মহল্লায় বাংলা ও সুমাত্রার বহু মুসলমান বাস করে। এখানকার অধিবাসীরা সমুদ্রের তীরে এসে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কেনাবেচা করে এবং হাতির সাহায্যে পানি বয়ে এনে তাদের সরবরাহ করে। কারণ, সমুদ্রোপকূল থেকে পানি অনেক দূরে। সেখানে গিয়ে ব্যবসায়ীদের তারা পানি আনতে দেয় না। কারণ, মেয়েরা সুশ্রী পুরুষদের দেখে তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা করবে বলে তারা আশঙ্কা করে। এদেশে হাতি প্রচুর; কিন্তু সুলতান ছাড়া সে সব কেউ বিক্রি করতে পারে না। তিনি কাপড়ের বিনিময়ে হাতি বিক্রি করেন।
তাদের সুলতান আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন হাতিতে চড়ে। হাতির পিঠে চর্মের জিন। তিনি নিজেও পরেছেন ছাগচর্মে তৈরী নোমওয়ালা পোশাক। মাথায় তিন রঙের রেশমী ফেটি বাঁধা। হাতে নলের একটি বর্শা। তাঁর সঙ্গে বিশজন আত্মীয়। তারাও হাতি চড়ে এসেছে। আমরা সুলতানকে কিছু মরিচ, আদা, দারুচিনি, মালদ্বীপের শুঁটকি মাছ, বাংলাদেশের কাপড় উপহার দিলাম। তারা নিজেরা কাপড় ব্যবহার করে না; কিন্তু ভোজের সময় তারা হাতি কাপড়ে আবৃত করে। এ দ্বীপে যে সব জাহাজ ভিড়ে তার প্রতিটি জাহাজ থেকেই সুলতান একটি বাঁদী, একজন শ্বেতকায় গোলাম, একটি হাতিকে আবৃত করবার উপযোগী যথেষ্ট কাপড় এবং নিজের স্ত্রীর কোমরে ও পায়ের আঙ্গুলে ব্যবহারের জন্য স্বর্ণালঙ্কার আদায় করেন। যদি কেউ তা দিতে অস্বীকার করে তবে তারা জাদু চালনা করে এবং তার ফলে সমুদ্রে এমন ঝড় ওঠে যে, সে ব্যক্তি তাতেই ধ্বংস হয় বা ধ্বংসের কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছে।
এদের ছেড়ে পঁচিশদিন পর আমরা জাওয়া (সুমাত্রা) গিয়ে পৌঁছি। জাওয়া থেকেই জাওয়ী নামক ধূপের নামকরণ হয়েছে। অর্ধদিনের পথ দূরে থাকতেই এ দ্বীপটি আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়। দ্বীপটি যেমন উর্বর তেমনি শস্য-শ্যামল। দ্বীপের সর্বত্রই নারকেল সুপারী, লবঙ্গ, ভারতীয় মুসব্বর, কাঁঠাল, আম, জাম, মিষ্টি লেবু ও বেত গাছ দেখা যায়। টিনের টুকরা ও চীন দেশীয় অশোধিত সোনার সাহায্যে এখানকার বাসিন্দারা ব্যবসা-বাণিজ্য করে। সুগন্ধযুক্ত যে-সব গাছপালা এখানে জন্মে তার অধিকাংশই বিধর্মীদের অধিকৃত অঞ্চলে। মুসলিম অঞ্চলে এ সব গাছের প্রাচুর্য কম। আমরা পোতাশ্রয়ে পৌঁছলে দ্বীপের লোকেরা ছোট-ছোট নৌকায় নারিকেল, কলা, আম ও মাছ নিয়ে আমাদের কাছে এলো। এ সব জিনিস সওদাগরদের উপহার দেওয়া তাদের একটি রীতি। ব্যবসায়ীরাও সাধ্যমত তাদের এ উপহার প্রকারান্তরে ফিরিয়ে দেয়। নৌসেনাপতির প্রতিনিধিও আমাদের জাহাজে এলেন। আমাদের সঙ্গীয় সওদাগরদের সঙ্গে আলাপ-পরিচয়ের পরে তিনি আমাদের তীরে যাবার অনুমতি দিলেন। কাজেই আমরা তীরবর্তী একটি বন্দরে নেমে গেলাম। সমুদ্রোপকূলে এটি একটি বৃহৎ গ্রাম। সারহা নামক অনেক ঘর এখানে আছে। শহর থেকে এ জায়গাটা চার মাইল দূরে। নৌ-সেনাপতির প্রতিনিধি আমার সম্বন্ধে সুলতানকে চিঠি লেখায় তিনি আমীর দৌলাসাকে কাজী ও অন্যান্য আইনজ্ঞ লোকদের আমার সঙ্গে দেখা করতে হুকুম করলেন। সুলতানের একটি ঘোড়া এবং আরও কয়েকটি ঘোড়া সঙ্গে নিয়ে তারা দেখা করতে এলেন। আমি ও আমার সঙ্গীরা ঘোড়ায় চড়ে সুলতানের রাজধানী সুমাত্রায় রওয়ানা হলাম। কাঠের দেওয়াল দিয়ে ঘেরা সুমাত্রা একটি বড় ও সুদৃশ্য শহর। জাওয়ার সুলতান আল-মালীক আজ-জহির একজন বিশেষ খ্যাতনামা উদার প্রকৃতির শাসক। তিনি ধর্মশাস্ত্রজ্ঞদের প্রতি বিশেষ অনুরাগী। তিনি সর্বদাই বিধর্মীদের বিরুদ্ধে জেহাদে নিযুক্ত আছেন এবং অভিযান চালনা করেন। তাহলেও তিনি একজন সহৃদয় প্রকৃতির লোক। তিনি পায়ে হেঁটেই শুক্রবার জুম্মার নামাজে যান। তাঁর প্রজারাও সানন্দে ধর্মযুদ্ধে যোগদান করে ও স্বেচ্ছায় অভিযানে অংশগ্রহণ করে। আশেপাশের সমস্ত বিধর্মীর উপর এদের আধিপত্য বেশী। শান্তিরক্ষার জন্য বিধর্মীরা কর দান করে।
