অতঃপর বোরহানউদ্দিন সে পত্ৰখানা বের করলেন। সেটি পাঠ করে ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে শেখ জালালউদ্দিনের এ নিখুঁত জ্ঞানের পরিচয় পেয়ে আমি বিস্ময় বোধ করলাম। এ ব্যাপারে যা-কিছু ঘটেছে সবই আমি শেখ বোরহানউদ্দিনকে খুলে বললাম। তিনি বললেন আমার ভাই জালালউদ্দিন এসবের চেয়েও অনেক বেশী কিছু করতে পারেন। …আমি শুনেছি, প্রতিদিন তিনি মক্কায় ফজরের নামাজ আদায় করেন এবং প্রতি বছর হজ করেন। কারণ আরফা এবং হজের সময় তিনি কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে যান কেউ তা বলতে পারেন না।
শেখ জালালউদ্দিনের কাছে বিদায় নিয়ে আমি হাজং পৌঁছি। কামারু পর্বত থেকে উৎপন্ন একটি নদীর দু’পাড়ে বিস্তীর্ণ এ সুন্দর শহরটি। নদীটির নাম নীল নদী।১০ এ নদী পথেই বাংলা ও লক্ষ্মণাবতী যেতে হয়। মিশরের নীল নদের মতো এই নদীটির দু’পাশে অনেক স্রোতচালিত কল, ফলের বাগান ও গ্রাম রয়েছে। মুসলমান সুলতানদের শাসনাধীনে এখানে বিধর্মীরা বাস করে। তাদের উৎপন্ন অর্ধেক শষ্য জরিমানা স্বরূপ কর্তন করা হয়। তাছাড়া তাদের ট্যাক্স আদায় দিতে হয়। আমরা পনেরো দিন অবধি এ নদী দিয়ে ভাটির দিকে এগিয়ে গেলাম; নদীর দু’পাশে গ্রাম ও ফলের বাগান দেখে মনে হচ্ছিল আমরা যেন একটি বাজারের ভেতর দিয়ে চলেছি। অসংখ্যা নৌকা চলাচল করছে এ নদীতে। প্রত্যেক নৌকায় একটি করে ঢাক। এক নৌকার সঙ্গে অপর একটি নৌকার দেখা হলেই উভয়ে নিজ নিজ ঢাক পিটায় এবং একে অপরকে অভিবাদন। জানায়। সুলতান ফখরউদ্দিনের হুকুম, দরবেশদের কাছ থেকে এ নদীতে চলাচলের জন্য কোনো কর আদায় করা হবে না। তাদের কারো খাদ্যের সংস্থান না থাকলে খাদ্যও দিতে হবে। কোনো দরবেশ শহরে এলে তাকে অর্ধ দীনার দেওয়া হয়। পূর্ব বর্ণিত মতে পনেরো দিন নদীপথে চলে আমরা সোনারকাওয়ান১১ এসে পৌঁছলাম। এখানে এসে একটি নৌকা পেলাম যেটা যাভা (সুমাত্রা) যাত্রার জন্য তৈরী। এখান থেকে সুমাত্রা চল্লিশ দিনের পথ। আমরা সেই নৌকায় আরোহণ করলাম।
***
পরিচ্ছেদ ৯
১। হরকাতু আরকটের আধুনিক শহর হতে পারে না। এটা অনেক উত্তরে অবস্থিত। এ ছিল কেবল একটি দূর্গ। কাজেই এর অবস্থান জায়গা সন্দেহজনক। যদিও এর নাম আরকট জেলার সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত (তামিল আৰু-কাদু’ ছয়টি অরণ্য)।
২। জালাল উদ্দীনকে দিল্লীর সুলতান মুহাম্মদ মাবারের সামরিক শাসক পদে নিযুক্ত করেন (মুসলিমগণ এ দেশটি ১৩১১ সালে অধিকার করেছিলেন)। ১৩৩৮ সালে ইনি নিজকে স্বাধীন বলে ঘোষণা করেন এবং এর পাঁচ বছর পরে নিহত হন। অতঃপর পর্যায়ক্রমে কয়েকজন সেনাপতি সিংহাসনে বসেন। এদের মধ্যে গিয়াসুদ্দীন ছিলেন তৃতীয়।
৩। কারোম্যাণ্ডেল সমুদ্র উপকুলের অনেক প্যাটাস এবং প্যাটাসের মধ্যে ফ্যাটানকে সঠিকভাবে নির্ধারণ করা কঠিন। মধ্য যুগীয় মাবারের প্রধান বন্দর ছিল কাবেরি, পাটুআনাম কাবেরির একটি মুখে–১৩০০ খ্রীষ্টাব্দের এক জলপ্লাবনে স্থানটি বিনষ্ট হয়েছে বলে বলা হয়।
এটাই যদি ইব্নে বতুতার ফ্যাটান হয়ে থাকে তবে এর ধ্বংসকালের তারিখ হবে ১৩৫০ সালের। কাছাকাছি (মার্কোপলো, ২য় খণ্ড, ৩৩৫-৩৬)। ফ্যাটান হয়তো নাগাপইম। পরবর্তী শতাব্দীগুলিতে এটা এক গুরুত্বপূর্ণ পোতাশ্রয় ছিল। ইউনূসের মতে স্থানটি আরো অনেক দক্ষিণে রামনাদের কাছাকাছি-এটা অসম্ভব হবে যদি আরুকটের সঙ্গে হারকাতু নামের কোনো সম্বন্ধ বিবেচনা করা হয়। (টীকা ১ দ্রষ্টব্য)। মাবার পরিভ্রমণের কোনো এক সময়ে কিম্বা ফ্যাটান থেকে কালামের পানে সফরের সময় মনে হয় ইব্নে বতুতা কেলুকারির ক্ষুদ্র বন্দরে উপনীত হয়েছে। এটা রামনাদের ১০ মাইল দক্ষিণে। পরে এটাকে তিনি লাগিয়েছেন চীন সমুদ্রের কোনো এক স্থানে (পরিচ্ছেদ ১০ টীকা দ্রষ্টব্য)। এটা আশ্চর্য যে ইব্নে বতুতা কেয়াল বা মার্কোপলোর কেইল বন্দরের কথা উল্লেখ করেননি। এটা তামনাপারনি নদীর ডেলটার তুতিকরিনের দক্ষিণে সে সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য বন্দর ছিল (মার্কোপলো, ২য় খণ্ড, ৩৭০-৪ দ্রষ্টব্য)।
৪। ইউলের বর্ণনা অনুসারে এটাকে পিজন আইল্যাণ্ড’ বলে স্থির করা হয়েছে, অনুরের (হিনাওর) ২৫ মাইল দক্ষিণে।
৫। সুদূর পূর্বাঞ্চলে ইব্নে বতুতার যে কোনো ভ্রমণ ইতিহাসের সঙ্গে এ উক্তির সামঞ্জস্য সাধন করা কঠিন। বর্ণনার গতিধারার দিক দিয়ে বিচার করে দেখলে এই দ্বিতীয় সফর তার মালদ্বীপ থেকে যাত্রার এক বছর পরবর্তী কালের পরে ছাড়া হতে পারে নাই।
৬। সুদকাওয়ান স্থানটিকে অনেক সাতগাঁও বলে স্থির করেছেন। এটা হুগলী শহরের উত্তর পশ্চিমে হুগলী নদীর তীরে অবস্থিত একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত শহর। হিন্দু শাসনের যুগ থেকে পর্তুগীজগণ কর্তৃক হুগলীর প্রতিষ্ঠা কাল পর্যন্ত এটা ছিল বাংলাদেশের ব্যবসায়ী রাজধানী। ইউল এটাকে চিটাগং বলে স্থির করেছেন। এটা সাতগাঁও অপেক্ষা সুবিধাজনক বন্দর ছিল। এবং ইব্নে বতুতা একে “মহাসমুদ্রের তীরবর্তী” বন্দর বলে বর্ণনা করেছেন। সুলতান ফকরুদ্দীনের সঙ্গে চিঠাগাংয়ের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না সেটা অনিশ্চিত (cf, Book of Duarte Barbosa; ২য় খণ্ড, ১৩৯)।
৭। জুন হচ্ছে ইব্নে বতুতার যমুনা নামের লিপ্যান্তর। এখানে এটা ব্ৰহ্মপুত্রকে বোঝাচ্ছে (৫২ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)।
