সাদকাওয়ান থেকে আমি কামারু পর্বতের দিকে রওয়ানা হই। সেখান থেকে কামারু এক মাসের পথ। বিশাল এ পর্তমালা চীন ও মৃগনাভির দেশ ঘুরবাত (তিব্বত) পর্যন্ত বিস্তৃত। এ পাবর্ত্য অঞ্চলের অধিবাসীরা দেখতে তুর্কীদের মতো। তারা অত্যন্ত কষ্টসহি। ক্রীতদাস হিসাবে তাদের মূল্য অন্য যে কোনো জাতীয় ক্রীতদাসের। চেয়ে বহুগুণ বেশী। এখানকার লোকেরা তাদের যাদবিদ্যা প্রদর্শনের জন্য বিখ্যাত। আমার এ পার্বত্য অঞ্চলে ভ্রমণের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল তাব্রিজের শেখ জালালুদ্দিন নামক একজন প্রসিদ্ধ ধর্মপ্রাণ সাধু ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করা। তার বাসস্থান থেকে দুদিনের পথ দুরে থাকতেই আমি তাঁর চারজন শিষ্যের দেখা পেলাম। তারা আমাকে জানালেন শেখ তার সঙ্গী দরবেশদের বলেছেন, “পশ্চিম দেশের একজন সফরকারী তোমাদের কাছে এসেছেন, তোমরা গিয়ে তাকে অভ্যর্থনা করো।” আমার সম্বন্ধে তিনি কিছুই জ্ঞাত। ছিলেন না। তার উপর এ ব্যাপার নাজেল হয়েছে। আমি তাদের সঙ্গে গুহার বাইরে। অবস্থিত তার আস্তানায় গিয়ে হাজির হলাম। সেখানে কোনো রকম আবাদী জমি নেই। কিন্তু মুসলমান ও অ-মুসলমান নির্বিশেষে সেখানকার অধিবাসীরা নানারকম উপহার। দ্রব্য নিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে আসে। সে-সব উপহার ও মানতের জিনিসপত্রেই। মুসাফের ও দরবেশদের ব্যয় নির্বাহ হয়। শেথের নিজের প্রয়োজন মিটানোর জন্য রয়েছে এক মাত্র গরু। প্রতি দশদিন অন্তর তিনি গরুর দুধ খেয়ে ইফতার করেন। একমাত্র তার চেষ্টায়ই এ পার্বত্যাঞ্চলের অধিবাসীরা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছে। এ উদ্দেশ্য নিয়েই তিনি এদের ভেতর বাস করছেন। আমি তার সামনে গিয়ে হাজির হলে তিনি দাঁড়িয়ে আমাকে অভ্যর্থনা জানালেন এবং কোলাকুলি করলেন। আমার দেশ ও সফর সম্বন্ধে তিনি জিজ্ঞাসাবাদ করলে আমি যথাযথ উত্তর দিলাম। তিনি তখন বললেন, আপনি আরবদের সফরকারী।
তাঁর শিষ্যদের যারা উপস্থিত ছিলো তারা বললো, মওলানা, ইনি আরবদের ছাড়া অন্যদেরও সফরকারী।
তখন শেখ তাদের কথার পুনরাবৃত্তি করে বললেন, হাঁ অন্যদেরও সফরকারী। কাজেই একে সম্মান করো।
তারা আমাকে আস্তানার ভেতর নিয়ে গেলো। আমি তিনদিন তাদের আতিথ্যে কাটালাম।
শেখের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে দেখলাম, তিনি ছাগলের লোমে তৈরী একটি আলখেল্প পরিধান করে আছেন। আলখেল্লাটি দেখে আমার পছন্দ হলে মনে-মনে বললাম, আহা, শেখ যদি এটি আমাকে দান করতেন। পরে তার কাছে যখন বিদায় নিতে গেলাম, তিনি উঠে গুহার এক কোণে গিয়ে আলখেল্পটি খুলে এসে আমার গায়ে পরিয়ে দিলেন এবং নিজের মাথার গোলটুপিটিও আমার মাথায় দিলেন। নিজে এলেন তালি লাগানো একটি পোশাকে। দরবো আমাকে বললেন, শেখ সচরাচর এ আলখেল্লাটি পরিধান করেন না। শুধু আমি এখানে এলেই এটি পরিধান করে তিনি বলেছেন, “মরক্কোর অধিবাসী এ আলখেল্লাটি চেয়ে নেবেন। তার থেকে এটি নেবেন একজন বিধর্মী সুলতান। এটি আমার ভাই সাঘার্জের বোরহানউদ্দিনকে দেবেন। তাঁর জন্যই এটি তৈরী হয়েছে।”
তাঁদের মুখে একথা শুনার পর আমি বললাম, এ পোশাকের ভেতর দিয়ে আমি শেখের দোয়া লাভ করেছি। এটি পরে মুসলমান বা বিধর্মী কোনো সুলতানের সাক্ষাতেই আমি যাবো না।
একথা বলে আমি শেখের কাছে বিদায় নিয়ে এলাম। তারপর চীন সফরে গিয়ে বহুদিন পরে থানসা (হ্যাং-চৌ-ফু) শহরে এসে হাজির হলাম। এখানে এসে লোকের ভিড়ে আমি সঙ্গীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লাম। তখন আমার পরিধানে ছিলো সেই আলখেল্লাটি। সেখানে ঘটনাক্রমে এক রাস্তায় দেখা হলো সেখানকার উজির ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গদের সঙ্গে। আমার উপর নজর পড়তেই তিনি আমাকে কাছে ডেকে হাত ধরে আমার আগমনের কারণ জিজ্ঞাসা করলেন এবং কথা বলতে-বলতে সুলতানের প্রাসাদে নিয়ে হাজির করলেন। এখানে পৌঁছে আমি বিদায় নিতে চাইলাম, কিন্তু তিনি আমার কথায় আদৌ কান দিলেন না। তিনি আমাকে সুলতানের কাছে নিয়ে হাজির করলেন। সুলতান আমাকে সুলতানদের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। আমি তার কথার জবাব দেবার সময় তিনি আলখেল্লাটির দিকে নজর দিলেন এবং এটি তার পছন্দ হলো। উজির তখন আমাকে বললেন, এটি খুলে ফেলুন।
আমি তার কথা অমান্য করতে পারলাম না। কাজেই সুলতান সে আলখেল্লাটি নিয়ে আমাকে দশটি জামা, একটি ঘোড়া ও জিন এবং কিছু অর্থ দিতে হকুম করলেন। এ ঘটনায় আমি রাগান্বিত হয়েছিলাম কিন্তু পরে মনে পড়লো শেখের কথা। তিনি বলেছিলেন, একজন বিধর্মী সুলতান একদিন এ আলখেল্লাটি নিয়ে নেবেন। তার সে ভবিষ্যদ্বাণী এভাবে পূর্ণ হওয়ায় আমার বিস্ময়বোধ করতে লাগল।
পরের বছর খান-বালিক (পিকিং) শহরে আমি সম্রাটের প্রাসাদে প্রবেশ করলাম এবং শেখ বোরহানউদ্দিনের দরগা খুঁজে বের করলাম। দেখলাম, সেই আলখেল্লাটি গায়ে দিয়ে তিনি তখন পড়তে বসেছেন। বিস্মিত হয়ে সেটি হাতে নিয়ে আমি পরীক্ষা করতে লাগলাম। তাই দেখে তিনি বললেন, আগে থেকেই সব জানেন তবে আর পরীক্ষা করছেন কি? আমি বললাম, সত্যই। এ আলখেল্লাটি খান্সার সুলতান আমার কাছ থেকে নিয়েছিলেন।
“এটি খাস করে আমার ভাই জালালউদ্দিন আমার জন্যই তৈরী করেছিলেন। তিনি আমাকে লিখে জানিয়েছিলেন অমুক অমুকের হাত দিয়ে আলখেল্পটি তোমার কাছে গিয়ে পৌঁছবে।”
