আমি ফাত্তানে ফিরে এসে দেখলাম, আটখানা জাহাজ ইয়েমেনে রওয়ানা হয়েছে। তার একটিতে আমি আরোহণ করলাম। পথে চারটি যুদ্ধ জাহাজের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়। জাহাজগুলো কিছু সময়ের জন্য আমাদেরও কাজে নিযুক্ত করে। পরে তারা। প্রত্যাবর্তন করলে আমরা কালাম (কুইন), চলে আসি। তখন অবধি আমি রোগের প্রকোপ কাটিয়ে উঠতে পারিনি বলে সেখানে তিন মাস কাটালাম। তারপর হিনাওরে সুলতান জামালউদ্দিনের কাজে যাওয়ার জন্য জাহাজে উঠলাম। হিনাওর ফাঁকানুর দ্বীপের মধ্যবর্তী ছোট একটি দ্বীপে আমরা যখন পোঁছেছি তখন বিধর্মীদের বারোখানা যুদ্ধজাহাজ আমাদের আক্রমণ করে। প্রচণ্ড যুদ্ধের পরে তারা আমাদের পরাজিত করলো এবং প্রয়োজনের জন্য রক্ষিত আমার সব কিছু সম্বল তারা নিয়ে গেলো। সেই সঙ্গে ছিলো অলঙ্কারাদি, সিংহলের রাজার দেওয়া জহরত, কাপড়-চোপড়, সফরের প্রয়োজনীয় খাদ্য ও অন্যান্য জিনিস যা ধর্মপ্রাণ লোক ও দরবেশের কাছে পেয়েছিলাম। সবকিছু গিয়ে তখন বাকী ছিলো আমার পরিধানের পায়জামা। সে জাহাজে যারা ছিলো। তাদের সবারই জিনিসপত্র রেখে নামিয়ে দেওয়া হলো তীরে। আমি ফিরে এলাম কালিকটে। সেখানে এসে একটি মসজিদে উঠলাম। একজন মৌলভী আমাকে একটি জামা দিলেন; সেখানকার কাজী দিলেন একটি পাগড়ী। একজন ব্যবসায়ী আরও একটি জামা দিলেন।
কালিকটে থাকতেই আমি জানতে পারি উজির জামালউদ্দিনের মৃত্যুর পরে সুলতানা খাদিজার (মালদ্বীপের) সঙ্গে উজির আবদুল্লার বিয়ে হয়েছে এবং আমার যে স্ত্রীকে গর্ভবতী অবস্থায় ছেড়ে এসেছিলাম সে একটি পুত্র সন্তান প্রসব করেছে। কাজেই আমি সেই দ্বীপপুঞ্জে যাবার বিষয় চিন্তা করতে লাগলাম। কিন্তু উজির আবদুল্লার সঙ্গে শক্রতার কথা মনে পড়ায় (দৈববানী লাভের আশায়) আমি কোরান খুলে একটি পৃষ্ঠায় পেলাম–ফেরেস্তাগণ নেমে এসে বলবে, ‘ভয় করোনা, দুঃখ করোনা। কাজেই নিজকে খোদার উপর সোপর্দ করে আমি যাত্রা করলাম। দশদিন পর কান্নালুস অবতরন করলে সেখানকার শাসনকর্তা এসে আমাকে অভ্যর্থনা জানালেন এবং মেহমান হিসাবে রেখে। আমার জন্য নৌকার বন্দোবস্ত করে দিলেন। দ্বীপের কয়েকজন তখন উজির আবদুল্লাহর কাছে গিয়ে আমার আগমনের সংবাদ দিলো। তিনি আমার সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং কে আমার সঙ্গে এসেছেন জানতে চান। তাঁকে জানানো হয় যে, আমি আমার দুই বছর বয়স্ক পুত্রকে নেবার জন্য এসেছি। এ খবর পেয়ে ছেলের মা এসে উজিরের কাছে নালিশ করে। উজির তাকে বলেন, আমার পক্ষ থেকে তার ছেলে নিয়ে যেতে আমি বাধা দেবো না। উজির আমাকে মহল দ্বীপে যাবার জন্য পীড়াপীড়ি করেন এবং যাতে সহজেই আমার গতিবিধি লক্ষ্য করা যায় তজ্জন্য তার প্রাসাদের মিনারের সামনে একটি গৃহে আমাকে থাকতে দেন। আমার পুত্রকে আমার সামনে আনা হলে আমার মনে হলো, সেখানে রেখে আসাই সমীচীন। কাজেই তাকে তাদের কাছেই রেখে এলাম। পাঁচদিন সেখানে অবস্থানের পরে সেখান থেকে তাড়াতাড়ি চলে আসাই সঙ্গত মনে হলো। কাজেই আমি চলে আসবার জন্য সুলতানের অনুমতি চাইলাম। উজির আমাকে ডেকে পাঠালেন। তাঁর কাছে যেতেই পাশে বসিয়ে তিনি আমার কুশলাদি জিজ্ঞাসা করলেন। তার সঙ্গেই আমি আহার করলাম এবং যে চিলচীতে হাত ধোন একই সঙ্গে সে চিলমূচীতে হাত ধূলাম। তিনি অন্য কারো সঙ্গে একাজ করেন না। পান আনা হলে আমি বিদায় নিয়ে এলাম। তিনি আমাকে একটি পোশাক ও অনেক কড়ি উপহার পাঠালেন। আমার প্রতিও তিনি সহৃদয় ব্যবহার করেছিলেন।
অতঃপর পুনরায় যাত্রা করলাম। দীর্ঘ তেতাল্লিশ রাত্রি সমুদ্রের বুকে কাটিয়ে আমরা বাঙ্গালা (বাংলা) দেশে পৌঁছলাম। এ বিশাল দেশে প্রচুর চাউল উৎপন্ন হয়। সারা। পৃথিবীতে আমি এমন কোনো দেশ দেখিনি যেখানে জিনিসপত্রের মূল্য বাংলার চেয়ে কম। পক্ষান্তরে এ একটি অন্ধকার (gloomy) দেশ। খোরাসানের লোকেরা বলে বাংলা ভাল জিনিসে পরিপূর্ণ একটি নরক। (A hell full of good things) এক দেরহামে আটটি মোটাতাজা মুরগী, দু’দেরহামে একটি মোটাতাজা ভেড়া এখানে বিক্রি হতে আমি দেখেছি। তাছাড়া ত্রিশ হাত লম্বা উৎকৃষ্ট ধরনের সূতী কাপড় মাত্র দু’দীনারে এখানে বিক্রি হতে দেখেছি। এক স্বর্ণ দীনারে অর্থাৎ মরক্কোর আড়াই স্বর্ণদীনারে এখানে একজন সুন্দরী ক্রীতদাসী বালিকা বিক্রি হয়। সমুদ্রোপকুলে বাংলার যে বৃহৎ শহরে আমরা প্রবেশ করি তার নাম সাদকাওয়ান। এ শহরের কাছেই গঙ্গা ও জুন নদী একত্র মিলিত হয়ে সাগরে পড়েছে। গঙ্গা নদীতে হিন্দুরা তীর্থ করতে আসে। এখানে নদীতে প্রকাও একটি নৌবহর আছে। তার সাহায্যে এরা লক্ষ্মণাবতীর অধিবাসীদের সঙ্গে যুদ্ধ করে।
বাংলার সুলতান তখন ফখরউদ্দিন। শাসনকর্তা হিসাবে তিনি উৎকৃষ্ট ছিলেন। মুসাফেরদের বিশেষতঃ দরবেশ ও সূফীদের প্রতি তিনি বিশেষ অনুরাগ প্রদর্শন করতেন। এ প্রদেশের অধিপতি ছিলেন সুলতান নাসিরউদ্দিন। দিল্লীর সুলতান তার এক পৌত্রকে কারারুদ্ধ করেন। সুলতান মোহাম্মদ সিংহাসন আরোহণের পর তাকে মুক্ত করে দেন। শর্ত ছিলো নাসিরউদ্দিন তার রাজত্বের অর্ধেক তাকে দান করবেন। কিন্তু পরে তিনি সে শর্ত ভঙ্গ করলে সুলতান মোহাম্মদ তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ করেন ও তাঁকে হত্যা করে নিজের বেগমের কোনো আত্নীয়ের উপর এ দেশের শাসনভার অর্পণ করেন। এ ব্যক্তিও সৈন্যদের দ্বারা নিহত হন। তখন লক্ষ্মণাবতী থেকে এসে এ-রাজ্য দখল করেন। আলী শাহ্। ফখরউদ্দিন যখন দেখলেন রাজত্ব সুলতান নাসিরউদ্দিনের বংশধরদের হস্তচ্যুত হয়ে গেছে (তিনি তাঁদেরই অনুগত ছিলেন) তখন সাদকাওয়ানে ও বাংলায় বিদ্রোহ করে তিনি নিজকে স্বাধীন নবাব বলে ঘোষণা করেন। তাঁর সঙ্গে আলী-শার। ঘোরতর যুদ্ধ হয়। শীত ও বর্ষায় ফখরউদ্দিন নদীপথে লক্ষ্মণাবতীর উদ্দেশে অভিযান করতেন। কারণ তিনি নৌবলে বিশেষ বলীয়ান ছিলেন। কিন্তু আলী শাহর স্থল-সৈন্য কম ছিলেন বলে তিনি শীত-বর্ষা ছাড়া অন্য সময়ে স্থলপথে অভিযান চালাতেন। আমি সাদকাওয়ানে এসে সুলতানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিনি, কারণ তিনি ভারত সুলতানের বিরোধী ছিলেন বলে আমার সাক্ষাতের ফলাফল সম্বন্ধে আমি সন্দিহান ছিলাম।
