তখন নৌ-সেনাপতি তাঁকে বললেন, আগামী তিন মাসের ভেতর সে-দ্বীপে জাহাজ নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
সে-কথা শুনে সুলতান আমাকে বললেন, বেশ, অবস্থা যদি তাই হয় তবে বর্তমান কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ফাত্তানে চলুন। সেখান থেকে মুত্রা (মাদুরা) যাবেন এবং সেখান থেকেই অভিযান করা হবে।
যে-অঞ্চলের ভেতর দিয়ে আমাদের যেতে হলো সে-অঞ্চলটি ছিলো গাছগাছাড়ায় ও নলখাগড়ায় পূর্ণ। নিরবচ্ছিন্ন সে-বন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পথ করে যাওয়া সাধ্যাতীত ব্যাপার। সুলতান হুমকি দিলেন, সেনাদলের প্রতিটি লোক, ছোট বড় নির্বিশেষে একটি করে কুঠার হাতে নিয়ে যাবে গাছ ও আগাছা কেটে পথ করবার জন্য। অতঃপর শিবির সন্নিবেশ করা হলে অশ্বারোহী সুলতান তার সেনাদলসহ অগ্রসর হলেন এবং সৈন্যগণ ভোর হতে দ্বিপ্রহর অবধি গাছ কেটে চললো। দ্বিপ্রহরে খাবার দেওয়া হয়, দলের পর দল এসে সৈন্যরা তখন আহার শেষ করে। আবার সন্ধ্যাবধি গাছ কাটার কাজ। জঙ্গলে যে সব বিধর্মীদের সঙ্গে তাদের দেখা হতো তাদের সবাইকে স্ত্রীপুত্রসহ তারা বন্দী করে শিবিরে নিয়ে আসততা। সৈন্যরা চতুর্দিকে কাঠের বেষ্টনী দিয়ে তাদের শিবির সুরক্ষিত করতো। বেষ্টনীর চারটি দরজা থাকতো। বেষ্টনীর বাইরে থাকতো তিন ফিট উঁচু কয়েকটি মঞ্চ। সে সব মঞ্চে রাত্রে আগুন জ্বালিয়ে রাখার নিয়ম। সেই অগ্নিকুণ্ডের পাশে গোলামদের বা পদাতিকদের একজন পাহারাদার থাকে। তার হাতে থাকে সরু বেতের একটি আঁটি। যদি রাত্রে কোনো বিধর্মীদল শিবির আক্রমণের চেষ্টা করে তবে পাহারাদাররা সবাই নিজ নিজ বেতের আঁটি আগুনে জ্বালায় এবং সে আলোতে রাত্রি দিনের মতো আলোকিত হয়ে ওঠে। তখন ঘোড়সওয়ার ছুটে যায় বিধর্মীদের উদ্দেশ্যে।
আগের দিন যে সব বিধর্মীদের ধরা হয়েছিলো পর দিন ভোরে তাদের চারভাগ করে কাঠের বেষ্টনীর চার দরজায় শুলে চড়ানো হলো। তাদের মেয়েদের এবং ছোট ছোট শিশুদেরও কেটে ফেলা হলো এবং মেয়েদের চুল খোটার সঙ্গে বেঁধে রাখা হলো। তারপর আবার শিবির সন্নিবেশ করে যথারীতি জঙ্গল কেটে পথ করা শুরু হলো। সেখানে যেসব বিধর্মী পাওয়া গেল তাদের প্রতিও পূর্বের মতোই ব্যবহার চললো। নারী। ও শিশুহত্যার এ রীতি অত্যন্ত কাপুরুষোচিত কাজ। এ ধরণের কাজ অন্য কোনো রাজা করেছেন বলে আমার জানা নেই। এ অপরাধের জন্যই খোদ এ রাজার ধ্বংস ত্বরান্বিত করেন।
আমি শিবির ছেড়ে ফাত্তানে গিয়ে পৌঁছলাম। ফাত্তান নামক উপকুলবর্তী বড় শহরে চমৎকার একটি পোতাশ্রয় আছে। পোতাশ্রয়ের বড় বড় স্তম্ভের উপরে স্থাপিত একটি মঞ্চ আছে। কাঠের নির্মিত একটি আবৃত সিঁড়ি মঞ্চ অবধি উঠে গেছে। স্থানটি শক্ৰদ্বারা কখনো আক্রান্ত হলে এরা তাদের সমস্ত জাহাজ এনে এ মঞ্চের সঙ্গে বাঁধে এবং তাতে। সৈনিক এবং তীরন্দাজদের এনে রাখে, ফলে শত্রুরা আক্রমণের কোনো সুযোগ পায় না। এ শহরে পাথরে নির্মিত সুন্দর একটি মসজিদ আছে। প্রচুর আঙ্গুর ও চমৎকার বেদানা এখানে পাওয়া যায়। আমি এখানে ধর্মপ্রাণ শেখ মোহাম্মদ নিশাপুরীর সাক্ষালাভ করি। যেসব পাগলা দরবেশ কাঁধে অবধি লম্বা বাবরী চুল রাখেন তিনি ছিলেন তাঁদেরই একজন। তাঁর সঙ্গে একটি সিংহ ছিলো, তিনি সিংহটিকে পোষ মানিয়েছেন। পোষমানা এ সিংহ দরবেশদের সঙ্গেই উঠাবসা ও আহার করতো। তার। সঙ্গে আরও প্রায় ত্রিশ জন দরবেশ থাকতেন। তাঁদের একজনের ছিলো একটি সুদৃশ্য হরিণ। যদিও সিংহ হরিণ একই জায়গায় বসবাস করতো তবু সিংহ কখনোও হরিণের অনিষ্ট করতো না। আমি যখন ফাত্তানে তখন সুলতান অসুস্থ হয়ে শহরে এলেন। আমি তার সঙ্গে দেখা করে একটি উপহার দিয়ে এলাম। তিনি সেখানে বাস করতে এসে নৌসেনাপতিকে ডেকে বললেন, দ্বীপপুঞ্জে অভিযানের জন্য জাহাজগুলোকে সাজসজ্জায় তৈরী করা ছাড়া অন্য কোনো কাজ করবেন না। তিনি উপহারের মূল্য ফেরৎ দিবার ইচ্ছাও প্রকাশ করলেন; কিন্তু আমি তাতে রাজী হইনি। পরে অবশ্য এজন্য আমি দুঃখিত হয়েছিলাম, কারণ, তিনি এন্তেকাল করেন এবং আমি কিছুই পেলাম না। তিনি এক পক্ষকাল ফাত্তানে কাটিয়ে রাজধানীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন; কিন্তু আমি সেখানে আরও পক্ষকাল কাটালাম।
অতঃপর আমিও তার রাজধানী মুত্রা (মাদুরা) শহরে এলাম। মুত্রা প্রশস্ত রাস্তাঘাটযুক্ত একটি বড় শহর। আমি এসেই দেখলাম শহরটি প্লেগের কবলে পড়েছে। এ রোগে যে আক্রান্ত হয় দ্বিতীয় বা তৃতীয় অথচ বড়জোড় চতুর্থ দিনে মৃত্যুবরণ করে। ঘরের বাইরে যখন গিয়েছি তখন রোগাক্রান্ত ও মৃত ছাড়া আর কাউকে দেখিনি। মুত্রায় পৌঁছে সুলতান ও তাঁর মাতা, স্ত্রী ও পুত্রকে রোগাক্রান্ত অবস্থায় পেলেন। তিনদিন শহরে কাটিয়ে তিনি তিন মাইল দূরে এক নদীতে গিয়ে বাস করতে লাগলেন। আমি সেখানে তাঁর সঙ্গে গিয়ে মিলিত হলে তিনি কাজীর গৃহের পাশে আমাকে বাস করতে হুকুম করলেন। এর ঠিক পনরো দিন পরেই সুলতান এন্তেকাল করলেন। এবং তার ভাইপো নাসিরউদ্দিন তার স্থলাভিষিক্ত হলেন। নতুন সুলতান হুকুম করলেন তাঁর পিতৃব্যের ইচ্ছানুসারে দ্বীপে অভিযানের জন্য নিযুক্ত সমস্ত জাহাজ আমার হেফাজতে। দিতে হবে। পরে আমিও সাংঘাতিক এক প্রকার জ্বরে আক্রান্ত হলাম। এ অঞ্চলে এ রকম জ্বর অত্যন্ত মারাত্মক বলে আমার মনে হয়েছিলো যে, আমার শেষ দিন ঘনিয়ে এসেছে। তখন আল্লাহ আমাকে তেঁতুলের সন্ধান দিলেন। তেঁতুল এ অঞ্চলে প্রচুর জন্মে। আমি প্রায় আধসের পরিমাণ তেঁতুল পানিতে গুলে তাই পান করলাম। তার ফলে তিন দিন শিথিল অবস্থায় কাটানোর পর খোদা আমাকে আরোগ্য করলেন। এ ঘটনার পরে এ শহরের উপর আমি বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠলাম এবং সুলতানের কাছে বিদায়ের প্রার্থনা জানালাম। তিনি আমাকে বললেন, আপনি যাবেন কেননা? দ্বীপে অভিযানের মাত্র এক মাস বাকি। জাহাপনার (মৃত সুলতান) ইচ্ছানুযায়ী আপনাকে সব কিছু না-দেওয়া পর্যন্ত আপনি অপেক্ষা করুণ। আমি অসম্মতি জানালাম। তখন তিনি আমার ইচ্ছামতো যে কোনো জাহাজে রওয়ানা হবার সুযোগ দিলেন এবং সেভাবে ফাত্তানে চিঠি লিখে দিলেন।
