২। মালদ্বীপ কালু-বিলি-মাস’, কালো বোনিতো মাছ আগুনে পুড়ানোর পর কালো হয়ে যায় বলে এর নাম কালো রাখা হয়েছে।
৩। “সন্দ্বীপের পাহাড়” হচ্ছে আদমের পর্বত চূড়া। সন্দ্বীপ হচ্ছে সিলনের পুরাতন আরবী এবং পার্শিয়ান নাম। (এর উদ্ভব হয়েছে সংস্কৃত ‘সিংহল দ্বীপ থেকে মানে সিংহের আবাস দ্বীপ)। ইহা পরে পালি ভাষায় সিহালাম= সেল্যান=সেলনে রূপান্তরিত হয়।
৪। সিলনের পুরাতন সিনহালিজ রাজ্য ১৩১৪ খ্রীষ্টাব্দের দিকে পাণ্ডিয়াজগণ আক্রমণ করে-এদের নিজেদের রাজ্য ছিল মাবারের অন্তর্গত মাদুরায়–এটা অন্ততঃ খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দী পর্যন্ত বর্তমান ছিল-তারপর তখন সেটা ছিল মুসলিমদের হাতে। আক্রমণকারীদের নেতা ছিলেন আরিয়া চক্রবর্তী। কিন্তু ইব্নে বতুতার মুরব্বী সম্ভবতঃ সেই একই নামের কোনো পরবর্তী সেনাপতি। ইনি ১৩৭১ সালে কলম্বো এবং অন্যত্র দূর্গ নির্মাণ করেছিলেন। পাণ্ডিয়াদের বসতস্থান ছিল জান্না দ্বীপে।
৫। আদম পর্বত চূড়ার গর্তটিকে মুসলিমগণ আদমের পায়ের চিহ্ন বলে সম্মান করে থাকেন। ব্রাহ্মণ এবং বৌদ্ধগণও এটাকে সমভাবে ভক্তি করে থাকেন। তারা মনে করেন এটা শিবের এবং বুদ্ধের পদচিহ্ন।
৬। কুনাকার নিশ্চয়ই কর্ণেগ্যালি (কুরুনাগালা)। এটা পুরাতন সিংহলী রাজবংশের সেই সময়ের আবাস স্থল। কুনার নামটি সংস্কৃত কুনওয়ার “রাজকুমার” বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
৭। এ শিকলগুলি এখনো বর্তমান রয়েছে।
৮। দিনওয়ার (এটা ঠিকভাবে কুর্দিস্তান অন্তর্গত মধ্যযুগীয় একটি শহরের নাম কিরমানশার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত) এখানে দিওয়ানদারার জায়গায় বসেছে। বিষ্ণুর প্রসিদ্ধ মন্দিরের স্থান এটা (১৫৮৭ খ্রীষ্টাব্দে পুর্তুগীজগণ এটা ধ্বংস করেন)। স্থানটি দা হেডের নিকটে। সিলনের সর্বশেষ দক্ষিণে।
০৯. মা’বার যাবার পথে
নয়
আমাদের মা’বার যাবার পথে হঠাৎ সমুদ্রে ঝড় উঠলো এবং পানিতে জাহাজ প্রায় ভর্তি হয়ে গেলো। অথচ জাহাজে আমাদের কোনো অভিজ্ঞ পদপ্রদর্শক ছিলো না। অল্পের জন্য আমাদের জাহাজ পাহাড়ের ধাক্কায় ভেঙ্গে চুরমার হবার হাত থেকে রেহাই পেলো। তারপরে জাহাজ এসে এক চড়ায় ঠেকে গেলো। আমরা প্রায় মৃত্যুর মুখোমুখি এসে পড়েছিলাম। জাহাজ হালকা করার জন্য যাত্রীরা নিজেদের মালপত্র সবই সমুদ্রে নিক্ষেপ করে একে-অপরের কাছে শেষ বিদায় নিয়ে রেখেছিলো। আমরা জাহাজের মাস্তুলটি কেটে সমুদ্রে ফেলে দিলাম। নাবিকরা তাই দিয়ে তৈরী করলো একটি কাঠের ভেলা। তখন আমরা তীর থেকে প্রায় ছ’মাইল দূরে। আমি ভেলায় উঠতে যাচ্ছি, এমন সময় আমার সঙ্গীরা (দু’জন বাদী ও অপর দু’জন সঙ্গী) আমাকে ডেকে বললো, আমাদের ফেলে আপনি ভেলায় চড়তে যাচ্ছেন। কাজেই আমার আগে তাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে বললাম, তোমরা দু’জন যাও এবং যে বালিকাটিকে আমি পছন্দ করি তাকেও সঙ্গে নাও।
এই বালিকাটি তখন বলে উঠলো, আমি খুব ভাল সাঁতার কাটতে জানি। ভেলার একটা দড়ি ধরে আমি সাঁতার কেটেই ওদের সঙ্গে যেতে পারব।
কাজেই আমার সঙ্গীদের দুজন, একজন বালিকা গেলো ভেলায় চড়ে আর অপর বালিকাটি গেলো সাঁতার কেটে। নাবিকরাও ভেলার সঙ্গে দড়ি বেঁধে তাই ধরে সাঁতার কেটে চলে গেলো। আমি আমার দরকারী জিনিসপত্র, অলঙ্কারাদি এবং সুগন্ধ দ্রব্যাদি তাদের সঙ্গে পাঠিয়েছিলাম এবং তারা নিরাপদেই তীরে পৌঁছেছিল কারণ হাওয়া তাদের অনুকুলে ছিলো। আমি নিজে জাহাজেই থেকে গেলাম। ক্যাপ্টেন হালের সাহায্যে তীরে যাবার ব্যবস্থা করলেন। নাবিকরা চারখানা ভেলা তৈরী করতে আরম্ভ করলো কিন্তু সেগুলো তৈরী হবার আগেই রাত হয়ে গেলো এবং জাহাজও বোঝাই হয়ে গেলো পানিতে। আমি জাহাজের পেছনের সবচেয়ে উঁচু পাটাতনটির উপরে গিয়ে উঠলাম। ভোর না-হাওয়া অবধি সেখানেই কাটলো। ভোরে একদল বিধর্মী একটি নৌকায় আমাদের কাছে এলে আমরা তাদের মা’বারের মাটিতে এসে পা ফেললাম। আমরা তাদের জানালাম যে, তারা যে সুলতানের প্রজা, আমরা তার বন্ধু। তখন একথা তারা। সুলতানকে লিখে জানালো। ঘটনার বিবরণ আমিও তাকে লিখে জানালাম।
আমরা সেখানে তিন দিন কাটালাম। তিন দিন পরে সুলতানের পাঠানো কয়েকটি ঘোড়া ও কয়েকজন লোক নিয়ে একজন আমীর এলেন। তাদের সঙ্গে একখানা পালকী ও দশটি ঘোড়া ছিলো। আমি আমার সঙ্গীরা, ক্যাপ্টেন এবং একটি বালিকা ঘোড়ায় এবং অপর বালিকাটি পালকীতে আরোহণ করলো। অতঃপর হারকাটু ১ কেল্লায় পৌঁছে আমরা রাত কাটালাম। বাদী বালিকা, দু’জন বালিকা, গোলাম এবং আমার সঙ্গীরা এখানেই থেকে গেলো।
পরের দিন আমরা সুলতানের তাবুতে পৌঁছলাম। সুলতানের নাম গিয়াসউদ্দিন দামাখান। তিনি মরহুম সুলতান জালালউদ্দিনের এক কন্যাকে বিবাহ করেছেন। আমি দিল্লীতে থাকাকালে তার অপর কন্যাকে বিবাহ করি। সারা ভারতে প্রচলিত রীতি এই। যে, সুলতানের সাক্ষাতে যেতে হলে পায়ে বুট (Boots)পরে যেতে হবে। আমার বুট ছিলো না বলে একজন বিধর্মী আমাকে এক জোড়া বুট দিলো। সেখানে অনেক মুসলিমও ছিলো; কিন্তু আমি দেখে অবাক হলাম যে, একজন বিধর্মী আমার প্রতি বেশী ভদ্রতা দেখালো।
সুলতানের কাছে যেতে তিনি আমাকে বসতে বললেন এবং নিকটেই তিনখানা তাবুর ব্যবস্থা করে দিলেন। তাবুতে কাপের্ট এলো, খাবার জিনিসও এলো। পরে আমি সুলতানের সঙ্গে দেখা করে মালদ্বীপে অভিযান করবার প্রস্তাবটি উত্থাপন করলাম। সে। প্রস্তাব মঞ্জুর করে তিনি কোন্ কোন্ জাহাজ পাঠানো হবে তা স্থির করলেন। তাছাড়া সুলতানের জন্য উপঢৌকন ঠিক করে দিলেন এবং আমীর ও উজিরদের জন্যও পোশাক ও অন্যান্য উপহার পাঠাবার ব্যবস্থা করলেন। তিনি সুলতানের ভগ্নীর সঙ্গে তার। বিবাহের চুক্তিপত্রের একটি খসড়া তৈরী করবার ভারও আমার উপর দিলেন। সে দ্বীপপুঞ্জের গরীবদের জন্য তিনখানা জাহাজ বোঝাই করে খয়রাতি মাল পাঠাবার হকুম হলো। অতঃপর তিনি আমাকে বললেন, “পাঁচ দিনের মধ্যে তোমাকে ফিরে আসতে হবে।”
