সরণদ্বীপের একটি পর্বত (Adam’s Peak) পৃথিবীর অন্যতম উচ্চ পর্বত। নয়দিনের পথ দূরে থাকতেই সমুদ্রের বুক থেকে আমরা এ পর্বত দেখেছি। আমরা যখন। এ পর্বতে আরোহণ করেছিলাম। তখন দেখা যাচ্ছিলো আমাদের নীচে। সেজন্য নীচের কিছুই আমাদের দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল না। এ পাহাড়ের বুকে সবুজ বনানী ও নানা রংয়ের। ফুল রয়েছে। ফুলের মধ্যে হাতের তালুর মতো বড় বড় গোলাপও আছে। পাহাড়ের উপর কদম (Foot) পর্যন্ত পৌঁছবার দুটি পথ। তার একটির নাম ‘বাবা পথ’ অপরটির নাম মামা পথ’ অর্থাৎ আদম ও হাওয়ার পথ। মামা পথটি সহজ এবং সেই পথেই তীর্থযাত্রীরা নেমে আসে। কিন্তু কেউ যদি সে পথে উপরে যায় তবে সে আদৌ তীর্থভ্রমণ করেছে বলে গণ্য হয় না। বাবা পথটি দূরারোহ। পূর্ব পুরুষের লোকেরা এ পর্বতের গায়ে একটি সিঁড়ি কাটে এবং লোহার খুঁটি পুতে শিকল লাগিয়ে আরোহীদের ধরতে সুবিধা করে দেয়। এ রকম দশটি শিকল আছে। তার দুটি পাদদেশে প্রবেশ পথে তারপর পর পর সাতটি। দশম শিকলটিকে বলা হয় ইমানের শিকল। এ রকম নাম হবার কারণ এই যে, এ অবধি উঠে কেউ নীচের দিকে চাইলে পড়ে যাবার ভয়ে খোদার নাম স্মরণ করে। এই শিকলটি ছাড়িয়ে গেলে বন্ধুর একটি পথ। দশম শিকল থেকে খিজিরের গুহার দুরত্ব সাত মাইল। গুহাটি প্রশস্ত একটি মালভূমির মধ্যে অবস্থিত। কাছেই মাছে পরিপূর্ণ একটি ঝরণা আছে। কিন্তু কেউ সেসব মাছ ধরে না। কাছেই পথের দু’পাশে পাথর কেটে দু’টি পুষ্করিণী খনন করা হয়েছে। খিজিরের গুহায় পৌঁছে যাত্রীরা তাদের মালপত্র সেখানে রেখে দু’মাইল উপরে কদম মোবারকে পৌঁছে।
হজরত আদমের সেই পবিত্র কদম মোবারক একটি প্রশস্ত মালভূমিতে উচ্চ কালো প্রস্তরখণ্ডে অঙ্কিত। পবিত্র পদটি এতো গভীরভাবে বসেছে যে ছাপটি স্পষ্ট বসেছে। লম্বায় এ পদচিহ্ন এগারো বিঘৎ। পুরাকালে চীনের লোকেরা এখানে এসে বুড়ো আঙুলের ছাপসহ পাথরের কিছু অংশ কেটে নিয়ে যায়। সেটি জয়তুনের একটি মন্দিরে রক্ষিত আছে। দেশের দূরাঞ্চলের লোকেরা অবধি এখানে তা জেয়ারত করতে আসে। যে পাহাড়ে কদম মোবারক রয়েছে সেখানে নয়টি গর্ত করা হয়েছে। এ সব গর্তে বিধর্মী তীর্থযাত্রীরা স্বর্ণ, মূল্যবান মণিমুক্তা ও অলঙ্কারাদি দিয়ে যায়। দরবেশদের দেখা যায়, খিজিরের গুহায় পৌঁছবার পর এ সব গর্তে যা রক্ষিত আছে তা নিবার জন্য রীতিমত প্রতিযোগিতা আরম্ভ করেছে। আমাদের বেলা কিছু পাথর ও সামান্য সোনা ছাড়া সেখানে কিছুই পাইনি। সে সব আমরা গাইডকে দিয়েছি। খিজিরের গুহায় তিনদিন কাটিয়ে সকালে ও বিকালে তীর্থযাত্রীদের কদম মোবারক জেয়ারত করতে হয়, এই-ই এখানে প্রচলিত নিয়ম। আমরাও এ নিয়ম পালন করেছি। তিনদিন এখানে কাটাবার পর আমরা মামা পথে নেমে এলাম। আসবার সময় পথে পাহাড়ের উপর কয়েকটি গ্রামে আমরা থেমেছি। পাহাড়ের পাদদেশে এমন একটি প্রাচীন গাছ আছে যার পাতা কখনো ঝরে পড়ে না। গাছটি যেখানে আছে সেখানে যাওয়া কারও সম্ভবপর নয়। এ গাছের পাতা চোখে দেখেছে এমন কোনো লোকের দেখা আমি পাইনি। এ পাহাড়ের পাদদেশে কয়েকজন যোগী দেখেছি। তারা গাছের পাতা পড়বার প্রতীক্ষায় কখনো এ জায়গা ছেড়ে যান না। এ সম্বন্ধে নোকমুখে নানা অলীক গল্প শুনা যায়। তার একটি হলো, এ গাছের পাতা যে খাবে সে বুড়ো হলেও যৌবন ফিরিয়ে পায়। কিন্তু তা সত্য হতে পারে না। এ পাহাড়ের তলায়ই রয়েছে সেই হ্রদ যেখানে জহরত পাওয়া যায়। এ হ্রদের। পানির বর্ণ উজ্জ্বল নীল।
সেখান থেকে রওয়ানা হয়ে সমুদ্রোপকুলে দিনাওয়ার একটি বড় শহরে এসে পৌঁছলাম। এ শহরে ব্যবসায়ীদের বাস। এ শহরের বড় একটি মন্দিরে দিনাওয়ার নামে একটি মূর্তি রক্ষিত আছে। এ মন্দিরে প্রায় এক হাজার ব্রাহ্মণ ও যোগী বাস করে। এ ছাড়া স্ত্রীলোক, বিধর্মীদের কন্যা আছে প্রায় পাঁচশ। তারা প্রতিদিন রাত্রে মূর্তির সামনে নৃত্যগীত করে। এ শহর এবং তাঁর সর্বপ্রকার আয় মন্দিরের মূর্তির জন্য বরাদ্দ করা আছে। সেইখান থেকে মন্দিরবাসী ও তীর্থযাত্রীদের খাদ্য সরবরাহ করা হয়। প্রায় মানুষের সমান উচ্চ এ মূর্তিটি স্বর্ণ নির্মিত। মূর্তির চোখের স্থানে দুটি প্রকাণ্ড মণি আছে। রাত্রে তা বাতির মতই জ্বল জ্বল করে বলে শুনেছি।
এখান থেকে রওয়ানা হয়ে আঠারো মাইল দূরে কালি (Point-de-Galle) শহর। সেখান থেকে আমরা পৌঁছি কালানবো (Colombo), সিংহলে এটি অতি সুন্দর এবং বড় একটি শহর। এখানে উজির ও জলস্তি সাগরের শাসনকর্তা বাস করেন। তাঁর সঙ্গে এক হাজার হাবসী থাকে। কালাবো থেকে রওয়ানা হয়ে তিন দিন পর আমরা আবার বাটালা এসে আমরা পূর্বোক্ত সুলতানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম। কাপ্তেন ইব্রাহীম তখনও আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। সেখান থেকে একসঙ্গে আমরা মা’বার রওয়ানা হলাম।
***
টিকা
পরিচ্ছেদ ৮
১। মালদ্বীপ যদিও বহুকাল পূর্ব থেকে নাবিক এবং পর্যটকদের কাছে পরিচিত ছিল এবং বারো শতাব্দীতে মুসলিম অধ্যুসিত হয়ে পড়েছিল-তবু ইব্নে বতুতার বর্ণনা হচ্ছে অনেক আগের ব্যাপার, এর অধিবাসী এবং দ্বীপটি সম্বন্ধে এ বিবরণ আমাদের জানা আছে। তার প্রদত্ত অনেক নাম এখনো মানচিত্রে দেখা যায়।
