সুলতানকে সে কথা বললাম। তিনি বললেন, আপনি ফিরে না আসা অবধি কাপ্তেন আমার মেহমান হিসাবে এখানেই থাকবেন।
তৎপর সুলতান আমাকে একখানা পালকী দিলেন। পাল্কীর বাহকেরা তাঁরই গোলাম। এ ছাড়া আমার সঙ্গে দিলেন চারজন যোগী–যাদের রীতি প্রতি বছর সেখানে গিয়ে তীর্থ করা, তিনজন ব্রাহ্মণ,৫ তার কর্মচারীদের দশজন এবং খাদ্যসম্ভার বহনের জন্য আরও পনেরো জন লোক। সে রাস্তায় পানির কোনো অভাব নেই। প্রথম দিন একটি নদীর ধারে গিয়ে আমরা তাবু ফেলি। সে নদীটি পার হয়েছিলাম বাঁশের ভেলার। সাহায্যে। সেখান থেকে রওয়ানা হয়ে আমরা রাজার রাজ্যের শেষ-সীমান্তে মনার মণ্ডলি( মিনারী মালে) নামক সুন্দর একটি শহরে যাই। শহরের বাসিন্দারা আমাদিগকে একটি চমৎকার ভোজের আয়োজন করে আপ্যায়িত করেন। সে ভোজে উপাদেয় ভোজ্য ছিলো মহিষের বাচ্চার গোশত। মহিষের বাচ্চা তারা জীবন্ত অবস্থায় জঙ্গল থেকে ধরে আনে। বন্দর সালাওয়াট (Chilaw) নামক হোট শহর ছাড়িয়ে যাওয়ার পরে আমাদের রাস্তা শুরু হলো নদী-নালাবহুল অসমান ভূমির মধ্য দিয়ে। দেশের এ অংশে যথেষ্ট হাতি আছে, কিন্তু শেখ আবু আবদুল্লার দোয়ার বরকতে তারা বিদেশীদের বা তীর্থযাত্রীদের কোনো অনিষ্ট করে না। তিনিই আদমের কদম মোবারকে যাওয়ার জন্য সর্বপ্রথম এ রাস্তাটি নির্মাণ করেন। এখানকার বিধমরা পূর্বে মুসলমানদের কদম মোবারকে তীর্থ করবার অনুমতি দিতো না এবং তাদের উপর অত্যাচার করতো। এমন কি তাদের সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া বা ব্যবসা-বাণিজ্য পর্যন্ত করতো না। কিন্তু শেখের সময়ে যে ঘটনা ঘটে তারপর থেকে তারা মুসলমানদের সম্মান করতে থাকে, গৃহে প্রবেশের অনুমতি দেয়, তাদের সঙ্গে পানাহার করে এবং তাদের স্ত্রী-পুত্রের সঙ্গে মেলামেশাকেও সন্দেহের চোখে দেখে না। আজ অবধি তারা এ শেখকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করে এবং তাকে বিখ্যাত শেখ বলে।
তৎপর আমরা এখানকার প্রধান সুলতানের রাজধানী কুনাকর শহরে পৌঁছলাম ৬। দুটি পাহাড়ের মধ্যবর্তী সঙ্কীর্ণ একটি উপত্যকায় এ শহরটি অবস্থিত। নিকটেই Lake of Rubles নামে একটি হ্রদ আছে। এ হ্রদে মণি-মুক্তা পাওয়া যায়। শহরের বাইরে শাবুশ নামে পরিচিত শিরাজের শেখ ওসমানের একটি সমজিদ আছে। সুলতানও এখানকার বাসিন্দারা তার কবর জেয়ারত করে ও সম্মানের চোখে দেখে। তিনি কদম মোবারকের একজন প্রদর্শক বা গাইড ছিলেন। পরে যখন তাঁর হাত ও পা কেটে ফেলা হয় তখন থেকে প্রদর্শকের কাজ করেন তার পুত্রগণ এবং গোলামগণ। তাঁর হাত পা কাটার কারণ, তিনি একটি গরু হত্যা করেছিলেন। বিধর্মী হিন্দুদের একটি আইন আছে, কেউ গোহত্যা করলে তাকেও ঠিক সেই ভাবে কেটে হত্যা করা হবে অথবা গরুর চামড়ায় পুরে দগ্ধ করা হবে। শেখ ওসমানকে তারা যথেষ্ট শ্রদ্ধা করতো বলেই শুধু তাঁর হাত পা কেটে ছেড়ে দেন এবং একটি বাজারের আয় তাকে দান করেন। কুনাকরের সুলতানকে কুনার বলা হয়। তার একটি শ্বেতহস্তী আছে। সারা পৃথিবীতে আমি সেই একটি শ্বেতহস্তীই দেখেছি। উৎসবাদি উপলক্ষে তিনি শ্বেতহস্তীতে আরোহণ করেন। তখন এর কপালে বড় বড় মণি-মুক্তা দিয়ে সজ্জিত করা হয়। বাহরামান (Carbuncles) নামক চমৎকার মণি শুধু এ শহরেই পাওয়া যায়। তার কিছু সংখ্যক পাওয়া যায় হ্রদে এবং কিছু সংখ্যক মাটী খুঁড়ে হ্রদ থেকে যেগুলো পাওয়া যায় এদের কাছে সেগুলো বিশেষ মূল্যবান। সিংহল দ্বীপের সর্বত্রই জহরত বা মণি পাওয়া যায়। এখানকার জমি ব্যক্তিগত সম্পত্তি। যে কেউ একটি অংশ কিনে নিয়ে মণির জন্য খনন করতে থাকে। কোনো কোনো মণি লাল, কোনো কোনোটা হলদে (পোখরাজ) কতগুলো নীল (নীলকান্তমণি)। তাদের ভেতর প্রচলিত রীতি অনুসারে এক শ’ ফানাম মূল্যের মণি হলেই তা সুলতানের সম্পত্তি। তিনি সেগুলোর মূল্য দিয়ে নিজে গ্রহণ করেন। কম দামের মণি যারা পায় সেগুলো তাদেরই সম্পত্তি বলে গণ্য হয়। এক শ’। ফানাম ছয় স্বর্ণ দীনারের সমতূল্য।
কুনাকর থেকে রওয়ানা হয়ে আমরা উসতা মাহমুদ পুরী নামক এক গুহার কাছে এসে রইলাম। উস্তা মাহমুদ নামক একজন ধার্মিক লোক একটি পাহাড়ের পাদদেশে হ্রদের ধারে এ গুহাটি খনন করেন। সেখান থেকে আমরা বানরের হ্রদে (Lake of Monkeys) এলাম। এসব পাহাড়ে বহু সংখ্যক বানর আছে। এখানকার বানরগুলোর রং কালো এবং লেজ লম্বা। মানুষের মতো পুরুষ বানরের দাড়ী আছে। শেখ ওসমান, তার ছেলেরা এবং অপর অনেকে বলেছেন, এসব বানরের একজন প্রধান আছে। তাকে অন্যান্য বানর রাজার মতই মান্য করে। প্রধান বানর মাথায় গাছের পাতা দিয়ে তৈরী একটা ফিতের মতো জড়ায় এবং লাঠিতে ভর করে দাঁড়ায়। চারটি বানর লাঠি হাতে দাঁড়ায় তার ডাইনে বাঁয়ে। প্রধান বানর আসন গ্রহণ করলে অপর বানর চারটি তার পেছনে গিয়ে দাঁড়ায় এবং প্রধান বানরের স্ত্রীবানর ও বাচ্চারা তার সামনে এসে প্রত্যেক দিন বসে। অন্যান্য বানররা তখন এসে দুরে দুরে বসে। এবার পূর্বের চারটি বানরের একটি উঠে অপর বানরদের উদ্দেশ্য কিছু বলতেই তারা চলে যায়। তৎপর ফিরে আসে হাতে কলা, লেবু বা তেমনি কোনো ফলমুল নিয়ে। প্রধান বানর, তার বাচ্চারা এবং সঙ্গী চারজন সে সব ফল খায়। একজন যোগী আমাকে বলেছেন যে, প্রধান বানরের সামনে একটি বানরকে উক্ত চার বানর লাঠি দিয়ে প্রহার করছে এবং প্রহারের পরে চুল ছিঁড়ছে বলে তিনি দেখেছেন। সেখান থেকে চলতে চলতে আমরা যে জায়গায় গেলাম তার নাম বুড়ীর কুঁড়ে। এখানেই লোকালয়ের শেষ। সেখান থেকে কতকগুলো গুহার পাশ দিয়ে আমাদের আসতে হয়। এখানে এসেই আমরা উড়ন্ত সেঁক দেখতে পাই। সেগুলো জলার ধারে গাছে বা লতাপাতার মধ্যে বসে থাকে। মানুষ কাছে গেলে এরা তার উপর লাফ দিয়ে পড়ে। শরীরের যেখানে এরা পড়ে সেখানেই অবাধে রক্তপাত হতে থাকে। এজন্য এখানকার লোকেরা সর্বদা একটি লেবু সঙ্গে রাখে। লেবু রগড়ে তার রস জেঁকের উপর ফেললেই জোক পড়ে যায়। তখন তারা একটা কাঠের ছুরির মত চটা দিয়ে জায়গাটা চেঁছে দেয়। এজন্য তারা কাটের ছুরিও সঙ্গে রাখে।
