আমি যাত্রা করে উজির আলীর দ্বীপে গিয়ে পৌঁছলাম। এখানে এসে আমার স্ত্রী ভয়ানক ব্যথায় আক্রান্ত হলেন এবং ফিরে যেতে চাইলেন। কাজেই আমি তাকে তালাক দিয়ে সেখানেই রেখে এলাম এবং উজিরকেও একথা লিখে দিলাম কারণ আমার স্ত্রী ছিলেন তার পুত্র-বধুর মাতা। আমার দ্বীপপুলোর বিভিন্ন জেলায় ঘুরতে-ঘুরতে এমন একটি ক্ষুদ্র দ্বীপে এলাম যেখানে মাত্র একটি বাড়ি। তার মালীক একজন তাঁতী। তার স্ত্রী, পরিবারস্থ অন্যলোক, কয়েকটি নারকেল গাছ এবং মাছমারা ও অন্য দ্বীপে যাতায়াতের জন্য একখান ক্ষুদ্র নৌকা ছিলো। তার এ দ্বীপে কয়েকটি কলাগাছও আমরা দেখেছি কিন্তু দুটি দাঁড়কাক ছাড়া আর কোন পাখী সেখানে আমাদের নজরে পড়েনি। আমরা পৌঁছতে দাঁড়কাক দুটি এসে জাহাজের উপর উড়ে-উড়ে ঘুরপাক খেতে। লাগলো। আমি হলপ করে বলতে পারি, আমি ঐ লোকটিকে হিংসা করেছি এবং মনে মনে ইচ্ছা করেছি, আহা এমন একটি দ্বীপ যদি আমার থাকতো তবে এখানেই আমার বাসস্থান করতাম এবং জীবনে শেষ দিন অবধি এখানেই কাটাতাম। অতঃপর আমরা মুলুক দ্বীপে এলাম। ক্যান্টেন ইব্রাহিমের জাহাজটি এখানেই পড়ে ছিলো। এ জাহাজে করেই আমি মা’বার যাবার সঙ্কল্প করেছিলাম। ইব্রাহিম ও তার সঙ্গীরা আমার সঙ্গে দেখা করে আমাকে যথেষ্ট সমাদর দেখালেন। উজির এ দ্বীপ থেকে প্রত্যহ আমাকে ত্রিশ দীনারের কড়ি, কিছু নারকেল, মধু, পান, সুপারী ও মাছ দিবার আদেশ দিয়েছিলেন। আমি মুলুকে সত্তর দিন ছিলাম এবং দুটি বিয়ে করেছিলাম। দ্বীপের বাসিন্দারা আশঙ্কা। করেছিলো যে, যাবার দিন ইব্রাহিম তাদের দ্বীপ লুট করে যাবেন। কাজেই তারা প্রস্তাব করলো, ইব্রাহিমের সমস্ত অস্ত্রপাতি তারা শেষ দিন অবধি নিজেদের কাছে রেখে দেবে। এ নিয়ে মনাস্তর উপস্থিত হলো। আমরা মহলে ফিরে এলাম কিন্তু পোতাশ্রয়ের ভেতরে ঢুকলাম না। তারপর সমস্ত ঘটনা উজিরকে লিখে জানালে তিনি জবাব দিলেন অস্ত্রপাতি আটক করার কোনো কারণ থাকতে পারে না। আমরা মুলুকে ফিরে এসে ৭৪৫ হিজরীর রবিউস সানি মাসের মাঝামাঝি (22nd. August 1344) সেখান থেকে যাত্রা করলাম। চার মাস পরে উজির জামালউদ্দিন এন্তেকাল করলেন-খোদা তার রুহের উপর দয়া বর্ষণ করুন!
জাহাজে কোনো আভিজ্ঞ পরিচালক ছাড়াই আমরা যাত্রা করেছিলাম। এ দ্বীপ থেকে মা’বারের দুরত্ব তিন দিনের। কিন্তু আমরা নয় দিন চলার পরে নবম দিনে সেলান (Ceylon) দ্বীপে এসে পৌঁছলাম। এখানে এসে দেখতে পেলাম সারান দ্বীপের পাহাড় আকাশে মাথা তুলে আছে ধূম্রের স্তম্ভের ৩ মতো। আমরা সে দ্বীপে এলেই নাবিকেরা। বললো, যে সুলতানের রাজ্যে সওদাগরেরা নির্ভয়ে যাতায়াত করতে পারে এ দ্বীপ সে রাজ্যের অন্তর্গত নয়। দ্বীপটি আয়রি শাকারবতী নামক একজন রাজার। তিনি অত্যাচারী এবং তার বোম্বেটে জাহাজ আছে। আমরা এ দ্বীপের পোতাশ্রয়ে আশ্রয় নিতে ভয় পেয়েছিলাম কিন্তু পর মূহুর্তে ঝড় উঠায় জাহাজ ডুবির ভয়ে আমি কাপ্তেনকে বললাম, আমাকে তীরে নামিয়ে দিন। আমি সুলতানের সঙ্গে এমন ব্যবস্থা করবো যাতে তিনি কোনো রকম দুর্ব্যবহার না করেন। আমার কথা মতো তিনি আমাকে তীরে নামিয়ে দিলেন। তাতে বিধর্মীরা এসে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, আপনি কে? আমি বললাম যে, আমি মা’বারের সুলতানের বন্ধু ও ভায়রাভাই। তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। জাহাজের মালপত্র তার জন্য উপহার। তারা সুলতানের কাছে ফিরে গিয়ে সংবাদ পৌঁছালো। তিনি খবর পেয়ে আমাকে ডেকে পাঠালেন। তার রাজধানী বাটালা (পুটালাম) শহরে গিয়ে আমি তার সঙ্গে দেখা করলাম। কাঠের দেওয়াল ও কাঠের মিনার দিয়ে ঘেরা বাটালা একটি ছোট শহর। এ শহরের সমস্ত উপকূল ছেয়ে পাহাড়ের মতো উঁচু হয়ে পড়ে আছে দারুচিনির গাছ। স্রোতে এসব গাছ ভেসে এসেছে। মা’বার ও মালাবারের লোকে বিনামূল্যে এসব সগ্রহ করে নিয়ে যায়। কিন্তু এজন্য সুলতানকে তারা বোনা কাপড় বা ঐ রকম সব জিনিস উপহার দিয়ে থাকে। এ দ্বীপ থেকে মা’বার একদিন ও এক রাতের পথ।
আমি বিধর্মী রাজা আয়রি শাকারবতীর সামনে হাজির হতেই তিনি উঠে এসে আমাকে নিয়ে তার পাশে বসালেন। এবং অত্যন্ত সদয়ভাবে কথাবার্তা বলতে লাগলেন। তিনি বললেন, আমার সঙ্গীরা সচ্ছন্দে নেমে এসে আমার আতিথ্য গ্রহণ করতে পারেন। কারণ, মা’বারের সুলতান আমার বন্ধু। তারপর তিনি আমাকে সেখানে থাকতে আমন্ত্রণ। জানালেন। আমি তিনদিন তার সেখানে ছিলাম। এ তিন দিনে আমার প্রতি তার আদর যত্ন ক্রমশঃ বেড়েছে। তিনি পার্শী ভাষা জানেন। আমার কাছে বিভিন্ন রাজা ও দেশের। গল্প শুনে তিনি খুব আনন্দ পেতেন। একদিন আমাকে কিছু মূল্যবান মুক্তা উপহার দিয়ে তিনি বললেন, লজ্জিত হবেন না, আপনার যা-কিছু মন চায় আমাকে বলুন। আমি বললাম, এ দ্বীপে এসে অবধি মনে একটা বাসনাই হয়েছে। এবং সে বাসনা হলো। আদমের কদম মোবারক জেয়ারত করা। (তারা বলে আদম বাবা এবং হাওয়াকে বলে মামা)। তিনি বললেন, সে তো সহজ ব্যাপার। একজন লোক সঙ্গে নিয়ে আপনাকে সেখানে পাঠিয়ে দেবো। আমি বললাম, তাই আমি চাই। আর যে জাহাজে আমি এলাম সে জাহাজখানা যেনো নিরাপদে মা’বার রওয়ানা হয়ে যেতে পারে। আমি যখন ফিরে যাবো তখন আপনার নিজের জাহাজে আমাকে পাঠাবেন। তিনি তাতে বলে উঠলেন, নিশ্চয়ই। আমি পরে যখন কাপ্তেনকে এ সব কথা বললাম, তখন তিনি বললেন, আপনি ফিরে না গেলে আমিও যাবো না। দরকার হলে আপনার জন্য এক বছর এখানে অপেক্ষা করবো।
