কী সর্বনাশ! পাইক্র্যাফ্ট, তোমার মনের ইচ্ছেটা ছিল চর্বি কমানোর, মুখে কিন্তু আগাগোড়া বলে গেছ, ওজন কমাতে চাও।
কেন জানি না, দারুণ খুশিতে ডগমগ হয়েছিলাম পাইক্র্যাফটের এহেন পরিস্থিতিতে। সেই মুহূর্তে বড় ভালো লেগেছিল ওকে। হাত বাড়িয়ে ধরে টেনেহিঁচড়ে নামিয়েও এনেছিলাম। পা দুখানা ছুঁড়ে পা রাখবার জায়গা পেতে গলদঘর্ম হয়ে গিয়েছিল বেচারি। আমার কিন্তু মনে হয়েছিল, ঠিক যেন ঝোড়ো বাতাসে নিশান উড়ছে পতপত করে। আঙুল দিয়ে মেহগনি কাঠের ভারী টেবিলটা দেখিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলেছিল অপরূপ নাটকের নায়ক, ওর তলায়… ওর তলায় ঢুকিয়ে দাও–আটকে রেখে দেবে—
তা-ই দিয়েছিলাম। বন্দি বেলুনের মতোই সাঁই করে টেবিলের তলায় আটকে গিয়েছিল ফুলো গতরখানা। মেঝের কার্পেটে পরম আয়েশে বসে জেরা চালিয়ে গিয়েছিলাম আমি। আগে অবশ্য একটা চুরুট ধরিয়ে নিয়েছিলাম মৌজ করে।
তারপর জিজ্ঞেস করেছিলাম খুশি খুশি গলায়–এবার বল, কীভাবে এ হাল হল তোমার।
পাঁচনটা খাওয়ার পরেই।
খেতে কীরকম?
জঘন্য!
জঘন্য তো বটেই। সব কটা পাঁচনের স্বাদই তাই। গুণাগুণ যা-ই থাক-না কেন, ঠাকুমার মায়ের কোনও পাঁচনই আমার কাছে রুচিকর নয়।
প্রথমে এক চুমক খেয়েছিলাম, খুব সামান্য।
তারপর?
বেশ হালকা হালকা লাগছিল নিজেকে। ঘণ্টাখানেক বাদে বেশ তাজা তাজা। তাই ঠিক করলাম, এক ঢোকেই মেরে দেব সবটা।
বল কী?
নাক টিপে গিলেছিলাম অবশ্য। তারপর থেকেই হালকা হতে হতে এই অবস্থা দাঁড়িয়েছে। এই পর্যন্ত মিনমিন করে বলে হঠাৎ ঝাঁ করে তেড়ে উঠল আমার ওপর, ফর্মালিন, কী করি এখন বল তো?
একটা কাজ কখনওই করবে না। বাইরে বেরবে না। বেরলেই শূন্যে উড়ে যাবে, হস্তসঞ্চালনে দেখিয়েছিলাম উড়ে যাওয়ার দৃশ্য।
পাঁচনের কাজ নিশ্চয় মিলিয়ে যাবে আস্তে আস্তে?
সে গুড়ে বালি, খুব জোরে মাথা নেড়ে নাকচ করে দিয়েছিলাম সম্ভাবনাটা। তৎক্ষণাৎ এক পশলা ঝাঁজালো তেজালো রসালো গালাগাল বৃষ্টি হয়ে গেল আমার ওপর। আমার চোদ্দোপুরুষের পিণ্ডি চটকানোর সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ করে আদ্যশ্রাদ্ধ করা হল আমার ঠাকুমার মা বেচারির। এমতাবস্থায় ওর মতো মোটকা হোঁতকা অশিষ্ট মানুষের পক্ষে এবংবিধ আচরণ খুবই স্বাভাবিক। তাই আমি গায়ে মাখলাম না। শুধু বললাম, আমি তো তোমায় সাধিনি, তুমি নিজেই
বলে, উঠে বসলাম ওই হাতলওয়ালা চেয়ারে। বিপদে যে বন্ধু পাশে দাঁড়ায়, সে-ই প্রকৃত বন্ধু। উপদেশ-টুপদেশ দিলাম কিছুক্ষণ। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলাম, এ অবস্থার জন্যে দায়ী পাইক্র্যাফ্ট নিজেই। অতখানি পাঁচন ঢক করে গিলে ফেলা উচিত হয়নি। কোঁত কোঁত করে গেলার স্বভাব ওর চিরকালই। এই বিষয়টা নিয়ে ঘোর মতান্তর ঘটল দুজনের মধ্যে।
গাঁক গাঁক চিৎকার শুনে আর মারদাঙ্গা মূর্তি দেখে ঠিক করলাম, শিক্ষাদানের এ প্রসঙ্গটা মুলতুবি থাক আপাতত। যুক্তি দিয়ে হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দিলাম, মহাপাপ সে করেছে শ্রুতিকটু পদের পরিবর্তে কোমলতর পদের প্রয়োগ করে। বলা উচিত ছিল চর্বি, কিন্তু শুনতে খারাপ লাগে বলে বলেছিল ওজন। কাজটা অত্যন্ত গর্হিত। ফল পেয়েছে হাতে হাতে
প্রসঙ্গটা অসমাপ্ত রাখতে বাধ্য হলাম পাইক্র্যাফটের প্রবল বাধাদানে। হ্যাঁ, হ্যাঁ, সব দোষই সে মানছে। মহাপাপ সে করেছে, অস্বীকার তো করছে না। কিন্তু এখন করণীয়টা কী?
নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে চলা ছাড়া আর তো কোনও উপায় দেখছি না, বুঝিয়ে বলেছিলাম আমি। সমস্যা সমাধানের সত্যিকারের আলোচনাটা শুরু হয়েছিল তখনই, এবং বেশ মনে রাখবার মতো আলোচনা। বলেছিলাম, চার হাত-পায়ে ভর দিয়ে কড়িকাঠে হাঁটাটা এমন কিছু অসুবিধাজনক হবে না কিছুদিনের চেষ্টার পর
ঘুমাতে তো পারছি না, গোঙিয়ে উঠেছিল পাইক্র্যাট।
সেটা কি একটা বিরাট সমস্যা? ধীরেসুস্থে সে সমস্যারও সমাধান করে দিয়েছিলাম আমি। কড়িকাঠে একটা তারের জাল লাগিয়ে নিলেই হল। বিছানার লেপ-তোশক ফিতে দিয়ে লাগানো থাকবে কড়িকাঠের জালে। কম্বল, চাদর বোতাম দিয়ে লাগানো থাকবে পাশে পাশে। ঘরকন্না দেখার ভার রয়েছে যে মেয়েছেলেটার ওপর, তাকেই শুধু সব কথা খুলে বলতে হবে। বেশ কিছুক্ষণ গজর গজর করার পর রাজি না হয়ে পারেনি। পাইক্র্যাফট। যথাসময়ে জিনিসপত্র এসে পৌঁছেছিল ঘরের মধ্যে এবং খুব স্বাভাবিকভাবেই। উলটো বিছানাপত্র নিয়ে তিলমাত্র উলটো-পালটা কৌতূহল না-দেখানোটা বিলক্ষণ উপভোগ্য হয়েছিল কিন্তু অন্তত আমার কাছে। লাইব্রেরি থেকে মইটা এনে রাখা যাবেখন বসবার এই ঘরে। খাবারদাবার সমস্ত রাখা হবে বুকশেলফের ওপরে। হাত বাড়িয়ে খেয়ে নিলেই হল। খুশিমতো মেঝেতে নেমে আসার মৌলিক পদ্ধতিটাও বাতলে দিয়েছিলাম কিছুক্ষণ ভাবনাচিন্তার পর। খুবই সোজা কায়দা, খোলা বুকশেলফে ব্রিটিশ এনসাইক্লোপিডিয়ার দশম সংস্করণটা রেখে দিলেই হল। হাত বাড়িয়ে খান দুয়েক খণ্ড টেনে নিলেই আস্তে আস্তে নেমে আসবে নিচে। আরও অভিনব একটা ব্যাপারে মতৈক্য ঘটল দুজনের মধ্যে। ঘরের ধার বরাবর অনেকগুলো লোহার আঁকশি লাগানো থাকবে। আঁকশি আঁকড়ে ধরে ঘরের নিচের দিক দিয়ে যত্রতত্র গমন করা যাবে। বুদ্ধিটা মন্দ বলা যায় কি?
এই ধরনের বুদ্ধির পর বুদ্ধি গজিয়ে যাচ্ছিল মাথার মধ্যে ফটাফট করে। বেশ চনমনে বোধ করছিলাম বিপদগ্রস্ত বন্ধুকে সাহায্য করার সুযোগ পেয়ে। উদ্যোগী হয়ে আমিই ঘরকন্না দেখার মেয়েছেলেটাকে ডেকে এনেছিলাম, পাইক্র্যাফটের গুপ্ত রহস্য ফাঁস করেছিলাম, এবং মূলত আমিই ওলটানো বিছানা কড়িকাঠে লাগিয়ে দিয়েছিলাম। সত্যি বলতে কী, পুরো দুটো দিন কাটিয়েছিলাম ওর ফ্ল্যাটে। স্ক্রু-ড্রাইভার বাগিয়ে অনেক অভিনবআয়োজন সমাপন করেছিলাম আমিই। তার টেনে ঘণ্টা রেখেছিলাম ওর হাতের কাছে, সব কটা ইলেকট্রিক লাইট লাগিয়েছিলাম উলটো করে। এই ধরনের বহুবিধ বিচিত্র ব্যবস্থা সবই করেছিলাম নিজের হাতে এবং পরমোৎসাহে। সব মিলিয়ে দৃশ্যটা এতই সুখপ্রদ হয়ে উঠেছিল যে, ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। কড়িকাঠ থেকে দরজার পাশ দিয়ে বিশালকায়। টিকটিকির মতো নেমে আসছে ধুসকো পাইক্র্যাফট, আঁকশি ধরে ধরে যাচ্ছে এক ঘর থেকে আর-এক ঘরে… কিন্তু ছায়া মাড়াতে পারছে না ক্লাবের… জীবনে আর পারবেও না! অহো! অহো!
