ভেবেছিলাম, বুঝি আর ঘাঁটাতে আসবে না আমাকে। একদিন দেখলাম, তিনজন নতুন সদস্যকে জ্বালিয়ে মারছে নিজের মোটা চেহারার কথা শুনিয়ে। নতুন ফর্মুলার সন্ধানে আছে নিশ্চয়। তারপরেই বলা নেই, নেই দুম করে পেলাম তার টেলিগ্রাম।
ঈশ্বরের দোহাই, এখুনি এসো।–পাইক্র্যাফ্ট।
যাক, ওষুধ তাহলে ধরেছে। পাঁচনে কাজ হয়েছে। ঠাকুমার মায়ের ইজ্জত রক্ষে পেয়েছে। মনের আনন্দে দশ রকমের পদ দিয়ে তারিয়ে তারিয়ে খেলাম দুপুরের খাওয়া। কফি খাওয়ার পর চুরুটটা শেষ না করেই রওনা হলাম পাইক্র্যাফটের বাড়ির দিকে। ঠিকানা জোগাড় করেছিলাম ক্লাব থেকে। ও থাকে ব্লমসবুরির একটা বাড়ির ওপরতলায়। সদর দরজায় পাইক্র্যাফট কোথায় আছে জিজ্ঞেস করতেই শুনলাম, নিশ্চয় শরীর খারাপ হয়েছে, দুদিন তার টিকি দেখা যায়নি। ও যে তলায় থাকে, সেই তলার চাতালে পৌঁছাতেই উদবিগ্ন মুখে এগিয়ে এসেছিল এক মহিলা। আমার নাম শুনেই বলেছিল, পাইক্র্যাফ্ট বলেই রেখেছে, আমি পৌঁছালেই যেন ঘরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু…
শেষ কথাটা ভেঙেছিল ভীষণ একটা গুপ্তকথা বলার ভঙ্গিমায় ফিসফিস করে, স্যার, উনি তো ঘরে তালা দিয়ে রেখেছেন ভেতর থেকে।
তালা দিয়ে রেখেছে ভেতর থেকে?
গতকাল সকাল থেকে ঘর বন্ধ ভেতর থেকে। কাউকে ঢুকতে দিচ্ছেন না। অনবরত গালাগাল দিয়ে যাচ্ছেন যেন কাকে।
ওই দরজাটা তো?
আজ্ঞে, হ্যাঁ।
ব্যাপারটা কী?
কিসসু বুঝছি না। খালি খাবার চাইছেন। কত খাবারই তো এনে দিলাম, তবুও… ভীষণ কিছু একটা নিশ্চয় ঘটেছে।
দরজার ওদিক থেকে ভেসে এল সরু খ্যানখেনে গলার চিৎকার–ফর্মালিন নাকি?
পাইক্র্যাফট? বলেই দমাদম ঘুসি মেরেছিলাম দরজায়।
তোমার পাশে যে রয়েছে, দূর হতে বল ওকে।
তা-ই বললাম।
তারপরেই শুনলাম দরজার ওপর একটা অদ্ভুত খড়মড় খচমচ আওয়াজ। অন্ধকারে কে যেন দরজার হাতল হাতড়াচ্ছে, ধরতে পারছে না। সেই সঙ্গে পাইক্র্যাফটের গজগজানি– শুয়োরের ঘোঁত ঘোঁত শব্দের সঙ্গে যার আশ্চর্য মিল আছে। বলেছিলাম, খামকা দেরি করছ কেন? আর কেউ নেই এখানে। তবুও খুলল না দরজা। বেশ কিছুক্ষণ গেল এইভাবে। তারপরেই শুনলাম দরজার চাবি ঘোরানোর শব্দ, সেই সঙ্গে পাইক্র্যাফটের কণ্ঠস্বর, এসো ভেতরে।
হাতল ঘুরিয়ে খুললাম দরজা, কিন্তু পাইক্র্যাফ্টকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম না।
না, পাইক্র্যাফট নেই ঘরের মধ্যে।
এরকমভাবে আমার পিলে জীবনে চমকায়নি–সেই মুহূর্তে যেমন চমকে ছিল। ঘরের মধ্যে যেন একটা ঝড় বয়ে গেছে। বই আর লেখবার সরঞ্জামের ওপর খাবার প্লেট-ডিশ গড়াগড়ি যাচ্ছে, খানকয়েক চেয়ার উলটে পড়ে রয়েছে, কিন্তু পাইক্র্যাফট গেল কোথায়?
ঠিক আছে হে, ঠিক আছে। দরজাটা আগে বন্ধ কর। পাইক্র্যাফটের ঝাঁজালো কণ্ঠস্বর।
আঁতকেই উঠেছিলাম।
তারপরেই আবিষ্কার করেছিলাম তাকে, সশরীরে।
ঘরের কোণে কার্নিশের কাছে দরজার ঠিক মাথায় আটকে রয়েছে কড়িকাঠের সঙ্গে কে যেন আঠা দিয়ে তাকে আটকে রেখেছে সেখানে। মুখখানা রাগে আর উদ্বেগে থমথম করছে, হাঁপাচ্ছে হুসহাস করে আর হাত-পা ছুড়ছে পাগলের মতো, দরজাটা… দরজাটা বন্ধ কর আহাম্মক কোথাকার! মেয়েছেলেটা যদি ঢুকে পড়ে ভেতরে…
দরজা বন্ধ করে এসে দাঁড়িয়েছিলাম তার নিচে, চোখ বড় বড় করে তাকিয়েছিলাম কড়িকাঠে আটকানো শূকরপ্রতিম বপুখানার পানে।
বলেছিলাম, পাইক্র্যাফ্ট, এ আবার কী খেলা? পড়ে গেলে যে ঘাড়খানা ভেঙে যাবে।
ভাঙলে তো বাঁচি, সে কী তেজ গলায়।
এই বয়স আর এই ওজন নিয়ে এ ধরনের ছেলেমানুষি জিমন্যাস্টিক দেখাতে যাওয়াটা কি ঠিক হচ্ছে?
নিকুচি করেছে তোমার ঠাকুমার মায়ের। তার জন্যেই…
সাবধান!
কথাটা শোনই-না!
তার আগে বল দিকি, কড়িকাঠে আটকে আছ কীসের আঠায়?
বলে ফেলেই বুঝলাম, আঠা নয়, আঠা নয়–কোনও আঠার জোরেই পাইক্র্যাফট আটকে নেই কড়িকাঠে, গ্যাস ভরতি বেলুনের মতো ফুলে উঠে সেঁটে রয়েছে কার্নিশের কোণে। হাঁচোড়-পাঁচোড় করে দেওয়াল খামচে ধরে নিচের দিকে নামবার চেষ্টা করতে করতে পাইক্র্যাফট বলেছিল, যত নষ্টের মূল ওই প্রেসক্রিপশনটা। তোমার ঠাকুমার মা…
খবরদার! হেঁকে উঠেছিলাম আমি।
দাবড়ানি খেয়ে একটা বাঁধানো ফ্রেম অন্যমনস্কভাবে চেপে ধরেছিল পাইক্র্যাফ্ট, ফ্রেম ভেঙে রয়ে গেল হাতে, ছবি আছড়ে পড়ে খানখান হয়ে গেল মেঝেতে, সাঁ করে ফের শুন্যে উঠে গিয়ে ধাঁই করে কড়িকাঠে ধাক্কা খেয়ে রবারের বলের মতো নেচে নেচে উঠল পাইক্র্যাফট। গতরখানার উঁচু উঁচু জায়গায় সাদা হয়ে রয়েছে কেন, বুঝলাম এতক্ষণে। চুনকাম মেখে কি খোলতাই চেহারাখানিই হয়েছে। কিন্তু হাল ছাড়বার পাত্র নয় এত মেহনত এবং ধকল সত্ত্বেও। হুঁশিয়ার হয়ে একটু একটু করে চেষ্টা চালিয়ে অবশেষে নেমে এল ম্যান্টল ধরে।
দৃশ্যটা বাস্তবিকই অপূর্ব! অসাধারণ! ওইরকম বিশাল, চর্বি-থসথসে, সন্ন্যাসরোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাযুক্ত একখানা গতর যদি মাথা নিচের দিকে করে কড়িকাঠ থেকে মেঝের দিকে দেওয়াল বেয়ে নিম্নগামী হয়, তাহলে কি দৃশ্যটা মনে রাখবার মতো হয় না?
ফর্মালিন, প্রেসক্রিপশনটা দারুণ কাজে লেগেছে।
কীভাবে পাইক্র্যাফ্ট?
ওজন হারিয়েছি–এক্কেবারে।
এতক্ষণে বুঝলাম ব্যাপারটা।
