তারপরেই কুড়ল মেরে বসলাম নিজেরই পায়ে। দায়ী এই উর্বর মগজটা। ভুরভুর করে গজিয়ে যাচ্ছিল বুদ্ধির পর বুদ্ধি–শেষকালে সুড়ত করে এসে গেল এমন একটা বুদ্ধি, যে সর্বনাশ হয়ে গেল আমার নিজেরই।
বসেছিলাম বসবার ঘরে। আগুনের ধারে ওরই চেয়ারে বসে ওরই হুইস্কি পান করছিলাম মৌজ করে। পাইক্র্যাফট লেপটে ছিল ওর অতিপ্রিয় কার্নিশের কোণে হাতে হাতুড়ি নিয়ে পেরেক ঠুকে ঠুকে তুরস্ক দেশের একটা কার্পেট বসাচ্ছিল কড়িকাঠে। বুদ্ধিটা মাথার মধ্যে ঝলসে উঠল ঠিক সেই মুহূর্তেই। চিৎকার করে উঠেছিলাম সঙ্গে সঙ্গে পাইক্র্যাফট! এত ঝামেলার তো কোনও দরকারই দেখছি না।
আইডিয়াটার পুরো প্রতিক্রিয়া ধারণা করে নেওয়ার আগেই গাঁক গাঁক করে তা ব্যক্ত করে ফেলেছিলাম স্বমুখে–সিসের অন্তর্বাস! বাস, ক্ষতি যা হবার হয়ে গেল তৎক্ষণাৎ।
পাইক্র্যাফটের চোখে জল এসে গিয়েছিল শুধু ওই দুটি শব্দ শুনেই–তাহলে বলছ, আবার মাথা তুলে দাঁড়ানো যাবে
চমকপ্রদ আইডিয়াটা গরগর করে বলে গিয়েছিলাম নিজের ক্ষতি কতখানি হতে পারে তা না ভেবেই–সিসের চাদর কেননা পাইক্র্যাফট। চাকা চাকা করে কেটে নিয়ে সেলাই করে নাও গেঞ্জি, জাঙ্গিয়া, পায়জামায়। পায়ে পর সিসের সুকতলা দেওয়া বুটজুতো। হাতে নাও নিরেট সিসে ভরতি থলি। বাস, আর কী চাই! বন্দিদশা ঘুচবে, আবার টো টো করে যেখানে খুশি টহল দিতে পারবে
বলতে বলতে আরও প্রীতিপদ একটা আইডিয়া ফুরুক করে ঠেলে উঠেছিল মগজের বুদ্ধিকোষ থেকে, জাহাজডুবি হলেও আর তোমাকে মরার ভয় করতে হবে না, পাইক্র্যাফট। কিছু বোঝা বা জামাকাপড় ফেলে দিলেই হল–দরকারমতো মালপত্র হাতে নিয়ে হু-উ-উ-স করে ভেসে উঠবে ডোবা জাহাজ থেকে জলের ওপর–ঠিকরে যাবে শূন্যে! বিষম উত্তেজনায় হাতুড়িটা খসে পড়েছিল পাইক্র্যাফটের হাত থেকে–আমার মাথা ঘেঁষে।
ফর্মালিন! আবার তো তাহলে ক্লাবে যাওয়া যাবে।
শুনেই তো আমার চক্ষু চড়কগাছ! উৎসাহ নিবে গেল দপ করে। খাবি খেতে খেতে সায় দিয়েছিলাম এইভাবে, তা-ও তো বটে! তা-ও তো বটে!
হ্যাঁ, ক্লাবে যাওয়া শুরু করে দিয়েছে পাইক্র্যাফ্ট। ওই তো ওই টেবিলে বসে কোঁত কোঁত করে গিলে যাচ্ছে চর্ব-চোষ্য-লেহ্য-পেয়। জুলজুল করে তাকিয়ে আছে আমার পানে। চোখে সেই নীরব মিনতি–বলো না ভায়া, বলো না কাউকে। কড়িকাঠে হেঁটেছি কেউ যদি শুনে ফেলে, ঢি ঢি পড়ে যাবে যে। পড়ুক। ওর ওই গেলা দেখে ঘুণাক্ষরেও কেউ কল্পনা করতে পারছে না যে তিলমাত্র ওজন নেই অত বড় গতরখানার–হালকা… হালকা… বাতাসের মতোই হালকা চর্বির ওই বিশাল পাহাড়টার। তাই জানুক সকলে, কী কুক্ষণেই শেষ বুদ্ধিটা বাতলে ফেলেছিলাম আমি। লেখা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। নতুন একখানা প্লেট নিয়ে চোখ নামিয়ে গোগ্রাসে গিলছে পাইক্র্যাফট, এই ফাঁকে পাশের দরজাটা পেরিয়ে যাওয়া যাবে না?
পিপীলিকা-সাম্রাজ্য
পিপীলিকা-সাম্রাজ্য ( The Empire of the Ants )
[‘The Empire of the Ants’ প্রথম প্রকাশিত হয় পত্রিকায় এপ্রিল ১৯০৫ সালে। আগস্ট ১৯২৬ সালে গল্পটি পুনঃপ্রকাশিত হয়’ Amazing Stories’ পত্রিকায়। ১৯৬২ সালে প্রকাশিত ‘The Empire of the Ants and Other Stories’ সংকলনটিতে গল্পটি স্থান। পায়। ১৯৭৭ সালের ‘Empire of the Ants’ সিনেমাটি এই গল্পের উপর ভিত্তি করে তৈরি।]
০১.
মহাসমস্যায় পড়েছেন ক্যাপটেন গেরিলো।
হুকুম এসেছে গানবোট বেঞ্জামিন কনস্ট্যান্ট-কে নিয়ে যেতে হবে বাদামায়। পিঁপড়েরা মড়ক শুরু করেছে–লড়তে হবে তাদের সঙ্গে। স্থানীয় বাসিন্দারা সৈন্য-সাহায্য চায়।
হুকুমটা শুনে অব্দি ক্যাপটেনের ঘোর সন্দেহ হয়েছে, নিশ্চয় তাঁকে অপদস্থ করার চক্রান্ত এঁটেছে কর্তৃপক্ষ। সম্প্রতি তাঁর পদোন্নতি ঘটেছে এমন প্রক্রিয়ায়, যা ন্যায়সংগত মোটেই নয়। ক্যাপটেনের রোমান্টিক চোখের চাহনিতে মুগ্ধ হয়ে বিশেষ এক মহিলা এমন কলকাঠি নেড়েছিলেন যে, পদোন্নতি কেউ আটকাতে পারেনি। তবে, দু-দুটো দৈনিকে তা ই নিয়ে বেশ টিটকিরি শোনা গেছে।
ক্যাপটেন গেরিলো জাতে পর্তুগিজ। আদবকায়দা আর নিয়মশৃঙ্খলার পরম ভক্ত। তাই মনের কথাটা পাঁচজনের কাছে ব্যক্ত করতে পারেননি। সমপর্যায়ের মানুষ না হলে কি প্রাণ খুলে কথা বলা যায়?
এমন একজনকে অবশেষে পাওয়া গেল গানবোটে। নাম তাঁর হলরয়েড–ল্যাঙ্কাশায়ার ইঞ্জিনিয়ার। চাপা বিরক্তিটা প্রকাশ করে ফেললেন তাঁর কাছে। এ কী উদ্ভট কাণ্ড? মানুষ বনাম পিঁপড়ে? বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না? পিঁপড়ে আসে পিলপিল করে, মানুষের তাতে বয়ে গেল। খামকা লড়তে যাবে কেন?
ইঞ্জিনিয়ারমশায় জবাব দিয়েছিলেন, আমি তো শুনেছি, এই পিঁপড়েরা পিলপিল করে আসে বটে, কিন্তু চলে যায় না। সাম্বো বলছিল–
সাম্বো নয়–জাম্বো। দোআঁশলা।
সাম্বো, ইঞ্জিনিয়ারের জিবের জড়তা সত্যিই অদ্ভুত। ধরিয়ে দিলেও সঠিক উচ্চারণ করতে পারেন না। সাম্বো বলছিল, পিঁপড়েরা কিন্তু যাচ্ছে না–পিলপিল করে পালাচ্ছে মানুষরাই।
রাগের চোটে অনর্গল ধূমপান করে গেলেন ক্যাপটেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, অসম্ভব। পিঁপড়ে মড়ক ছড়ায়–তার পেছনে থাকে ভগবানের হাত। পিঁপড়েরা নিমিত্তমাত্র। ত্রিনিদাদে খুদে পিঁপড়েরা এইরকম মহামারী ডেকে এনেছিল। কমলা গাছ আর আম গাছের পাতা মুখে করে নিয়ে যেত। মাঝে মাঝে বাড়ির মধ্যেও হামলা করে পিঁপড়েরা লড়াকু পিঁপড়ে–আরশোলা, মাছি, উকুন মেরে বাড়ি সাফ করে দিয়ে চলে যায়। ভালোই করে।
