হ্যাঁ, মিনমিন করে বলেছিল পাইক্র্যাফট। ঘুরিয়ে বলেছিল অবিশ্যি। জানি কথাটা মিথ্যে। প্যাটিসন পাঁচন খেয়েছিল নিজের ঝুঁকিতে।
বলেছিলাম ঝাঁজের সঙ্গে, আমার ঠাকুমার মা অনেকরকম পাঁচনের ফর্মুলা দিয়ে গেছে। আমাদের ঠিকই, কিন্তু তা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করাটা বিপজ্জনক ব্যাপার। আনাড়ির হাতে পড়লে আর রক্ষে নেই। পইপই করে বারণ করে গেছে বাবা
পরখ করে দেখেছিলেন বুঝি? যেন ভাজা মাছটি উলটে খেতে জানে না, এমনি সুরে। বলেছিল পাইক্র্যাফট।
একবারই করেছিল–একটা পাঁচনের।
এমন কোনও পাঁচন কি নেই, যা খেলে—
বিদঘুটে পুঁথিগুলোয় যা লেখা আছে, তা পড়েই ভয় ধরে যায়। অদ্ভুত, উদ্ভট সব ব্যাপার ঘটতে পারে। খাওয়া তো দূরের কথা–নাকে গন্ধ পেলেও
কিন্তু পাইক্র্যাফটকে আর কি আটকানো যায়? ভেবেছিলাম, ওইটুকু বলেই ওর উৎসাহ নিবিয়ে দেওয়া যাবে। ঘটল ঠিক তার উলটো। উৎসাহটা গেল বেড়ে। জান কয়লা করে ছাড়ল আমার। প্যাটিসন যে পাঁচনটা গিলেছিল, তার মধ্যে ক্ষতিকর কিছু ছিল না। অন্যান্য পাঁচনের ফর্মুলাতেও দোষের কিছু নেই বলেই জানি। কিন্তু পাইক্র্যাটকে অত কথা বলতে যাব কেন? পাঁচন খাওয়ার মধ্যে ঝুঁকি আছে বললেই ঘ্যানর ঘ্যানর করে এক গানই গেয়ে গেছে–ঝুঁকি নিতে সে রাজি আছে।
মোট কথা, অতিষ্ঠ করে ছাড়ল আমাকে পাইক্র্যাট হারামজাদা। বিদঘুটে পাঁচনগুলোর মধ্যে বিষ-টিশ যদি কিছু থাকে…
ভাবতেই চনমন করে উঠেছিল মনটা। মোটকা পাইক্র্যাটকে বিষ-পাঁচন গিলিয়ে দিলে কেমন হয়?
সেই দিনই রাত্রে অদ্ভুতদর্শন অদ্ভুতগন্ধী চন্দন কাঠের বাক্সটা বার করলাম সিন্দুকের ভেতর থেকে। ভেতরকার খসখসে চামড়াগুলো দেখলাম উলটে-পালটে। যে ভদ্রলোক ফর্মুলা লিখে দিয়েছিলেন ঠাকুমার মা-কে, তাঁর বাতিক ছিল নানা ধরনের পশুচর্ম সংগ্রহের। গোটা গোটা অক্ষরে এইসব চামড়ার ওপরেই ঠেসে লিখে গেছেন অজস্র ফর্মুলা। আমাদের ফ্যামিলির অনেকেই ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে যুক্ত থাকায় বংশানুক্রমে কাজ চলার মতো হিন্দুস্তানি ভাষায় দখল আছে প্রত্যেকেরই। তা সত্ত্বেও কয়েকটা ফর্মুলা এক্কেবারে পড়তেই পারলাম না এবং কোনওটাই খুব সহজবোধ্য ঠেকল না। এরই মধ্যে একটায় নাক গলাতে পারলাম কোনওমতে এবং সেইটা নিয়েই বসে পড়লাম সিন্দুকের পাশে।
পরের দিন পাইক্র্যাফ্টকে চামড়াখানা দেখাতেই ছিনিয়ে নেয় আর কী–ঝাঁ করে সরিয়ে নিয়েছিলাম নাগালের বাইরে।
বলেছিলাম, দেখ বাপু, অতিকষ্টে পাঠোদ্ধার করেছি–যদূর বুঝেছি, মনে হয়, এই পাঁচন খেলেই তোমার ওজন কমবে। তুমি তো ওজনটাই কমাতে চাও–তা-ই না?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, সে কী উৎসাহ পাইক্র্যাফটের।
আমি বলেছিলাম, আমার পরামর্শ যদি নাও, তাহলে বলব, এসব ঝুটঝামেলার মধ্যে যেয়ো না। প্রথমত, পাঁচনের ফর্মুলার মানেটা পুরোপুরি বুঝেছি বলে মনে হয় না। দ্বিতীয়ত, আমার মায়ের দিকের পূর্বপুরুষরা বড়ই সৃষ্টিছাড়া টাইপের মানুষ ছিলেন। বুঝেছ, কী বলতে চাইছি?
চেষ্টা করেই দেখা যাক-না।
বুঝলাম গোঁ ছাড়বার পাত্র নয় মোটকা পাইক্র্যাফ্ট। কী আর করা যায়, চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে জানতে চেয়েছিলাম, রোগা হয়ে যাওয়ার পর নিজের চেহারাখানা কীরকম দাঁড়াবে, সে ব্যাপারটা কি ভাবা হয়েছে। কিন্তু পাইক্র্যাফটকে তখন যুক্তি দিয়ে বোঝায় কার সাধ্যি। নিরুপায় হয়ে ছোট্ট চামড়াখানা ওর হাতে গছিয়ে দিয়ে হুঁশিয়ার করে দিয়েছিলাম, খবরদার, আর যেন নিজের মোটা বপু সম্বন্ধে মোটা মোটা কথা শোনাতে আমাকে না আসে।
শেষকালে বলেছিলাম, পাঁচনটা কিন্তু সুবিধের নয় বলে রাখছি। জঘন্য।
হোক গে, বলে চামড়াখানা উলটে-পালটে দেখেই খাবি খেয়েছিল হিন্দুস্তানি হরফ দেখে! ইংরেজি তো নয়!
শেষ পর্যন্ত তরজমা করে শোনাতে হয়েছিল আমাকেই। তারপর গেছে পনেরোটা দিন। এই পনেরো দিনে যতবার আমার কাছে ঘেঁষতে এসেছে সে, ততবারই দূর থেকে হাত নেড়ে বলেছি আরও দূরে সরে পড়তে। কিন্তু পরে পনেরোটা দিন যাওয়ার পরেও দেখেছি, মোটা রয়েছে আগের মতোই।
পনেরো দিন পর আর দূরে আটকে রাখা যায়নি পাইক্র্যাফটকে। শুরু হয়েছিল নাকিকান্না। নিশ্চয় কোথাও গোলমাল হয়েছে। পাঁচনে কাজ হচ্ছে না কেন?
ফর্মুলাটা চাইতেই পকেট বুক থেকে বার করে দিয়েছিল পাইক্র্যাফট।
উপাদানগুলোর ওপর চোখ বুলিয়ে নিয়ে জানতে চেয়েছিলাম, ডিমটা ফেটিয়ে নিয়েছিলে?
না তো। দরকার ছিল কী?
সেটা কি বলতে হবে? ঠাকুমার মা ঠিক যেভাবে পাঁচন তৈরি করতে বলেছে, সেইভাবেই করতে হবে। সামান্য হেরফের থেকেই মারাত্মক বিপর্যয় ঘটে যেতে পারে। র্যাটল সাপের বিষটা টাটকা ছিল তো?
র্যাটল সাপের বিষ জোগাড় করেছিলাম জ্যামরাকসের কাছ থেকে। দামটা
সেটা তোমার ব্যাপার। শেষ উপাদানটা—
ওটার ব্যাপারে একজনের সঙ্গে
বুঝেছি। এই ফর্মুলায় চলবে না। একই পাঁচনের আরও কয়েকটা ফর্মুলা লেখা রয়েছে দেখছি। তা-ই থেকেই আর-একটা লিখে দিচ্ছি। বানানটা দেখছি জঘন্য–আমার বিদ্যেয় কুলাচ্ছে না। ভালো কথা, কুকুর মানে খুব সম্ভব নেড়িকুত্তা!
এরপর ঝাড়া একটা মাস ধরে দেখেছি একই রকম মোটা শরীর নিয়ে ভীষণ উদবেগে ক্লাবময় চক্কর মারছে পাইক্র্যাফ্ট। চুক্তিভঙ্গ করেনি একবারও। দু-একবার শুধু দূর থেকেই মাথা নেড়েছে হতাশভাবে। একদিন পোশাক-ঘরে আমাকে একলা পেয়েই যেই বলেছে, তোমার ঠাকুমার মা, অমনি এক দাবড়ানি দিয়ে আমি বলেছি, খবরদার, কোনও কথা বলবে না আমার ঠাকুমার মা সম্বন্ধে। বাস, এক্কেবারে ঠান্ডা মেরে গেছে। পাইক্র্যাফট।
