এলসটিড নিজেই লিখবে বলেছিল অত্যদ্ভুত এই উপাখ্যান যন্ত্রপাতি মেরামত করে নেওয়ার পর।
কিন্তু ১৮৯৬ সালের দোসরা ফেব্রুয়ারি আবার গোলক নিয়ে সমুদ্রতলে পাড়ি জমায় এসটিড, আর ফেরেনি৷ তেরো দিন অপেক্ষা করার পর গানবোট রিওতে ফিরে এসে তারবার্তা পাঠায় বন্ধুবান্ধবদের।
আপাতত এর বেশি আর কিছু জানা যায়নি। গভীর সমুদ্রের তলদেশে এমন একটা শহরের অস্তিত্ব কেউ কোনওদিন কল্পনাও করতে পারেনি। সুতরাং আশ্চর্য এই কাহিনি ছড়িয়ে পড়ার পর নিশ্চয় অন্য কেউ গোলক নিয়ে যাবে শহর দেখতে, এই আশা নিয়েই শেষ করা যাক নিতল নগরীর কাহিনি।
পাইক্র্যাফট প্রহেলিকা
পাইক্র্যাফট প্রহেলিকা ( The Truth About Pyecraft)
[‘The Truth About Pyecraft’ প্রথম প্রকাশিত হয় ‘Strand Magazine’ পত্রিকায় এপ্রিল ১৯০৩ সালে। পরে ‘Macmillan and Co.’ থেকে ১৯০৩ সালে প্রকাশিত ‘Twelve Stories and a Dream’ সংকলনটিতে গল্পটি স্থান পায়। পরবর্তী কালে এটি ১৯৬২ সালে প্রকাশিত ‘Alfred Hitchcocks Ghostly Gallery’ সংকলনটিতে স্থান পায়।]
পাইক্র্যাফট বসত আমার কাছ থেকে প্রায় বারো গজ দূরে। কিন্তু ঠায় চেয়ে থাকত আমার দিকে, দুচোখে অসীম মিনতি নিয়ে। নিছক মিনতি বলব না, তার সঙ্গে মিশে থাকত একটু সন্দেহ।
এত সন্দেহ? কোনও কথাই তো কাউকে বলিনি এদ্দিন। বলবার হলে অনেক আগেই বলতাম। বললেই বা কে বিশ্বাস করছে?
বেচারি পাইক্র্যাফ্ট। যেন একটা জেলির পিপে। লন্ডনের সবচাইতে ধুসকো মোটকা মানুষ!
চুল্লির ধারে বসে কেক গিলছে, গিলছেই। আর আড়ে আড়ে তাকাচ্ছে আমার দিকে। চোখে সেই নীরব মিনতি, কাউকে বলো না, ভায়া!
বলতাম না, যদি-না ওর চোখের কোণে আমার সতোর ওপর সন্দেহের ছায়াপাত দেখা যেত। পাইক্র্যাফট, এই জন্যেই সব কথা বলব সবাইকে। অনেক সাহায্য করেছি তোমাকে, অথচ তোমার জন্যেই আজ আমার ক্লাব-জীবন অসহ্য হয়ে উঠেছে। তাই তোমার সামনেই এই টেবিলে বসে লিখে যাচ্ছি তোমার গুপ্তকথা।
এত খাওয়াই বা কেন? খাওয়ার কি আর শেষ নেই? গিলেই যাচ্ছ কোঁত কোঁত করে।
যাক গে, এবার অবসান ঘটুক পাইক্র্যাফট প্রহেলিকার!
পাইক্রাটের সঙ্গে প্রথম পরিচয় এই ধূমপানকক্ষেই। একে তো অল্প বয়স, তার ওপর নতুন সদস্য, কাজেই একটু নার্ভাস ছিলাম। পাইক্র্যাফ্ট তা লক্ষ করেই হেলেদুলে ভারী গতরখানা টেনে এনে ধপাস করে বসে পড়েছিল আমার গা ঘেঁষে। হুস-হুঁস কিছুক্ষণ নিঃশ্বাস ফেলার পর ইয়া মোটা একখানা চুরুট বার করে ধরিয়ে নিয়েছিল দেশলাই জ্বেলে। তারপর কথা শুরু হয়েছিল আমার সঙ্গে। কী কথা তা সঠিক মনে নেই। তবে দেশলাইয়ের কাঠিগুলো যে একেবারেই বাজে, এই জাতীয় কিছু বলেই মনে আছে। পাশ দিয়ে যত ওয়েটার গেছে, তাদের প্রত্যেককে ডেকে বলেছে একই কথা, অতি রদ্দিমার্কা দেশলাই। ঘষতে ঘষতে প্রাণ বেরিয়ে যায়।
খ্যানখেনে সরু গলায় অসভ্য দেশলাই-প্রসঙ্গ দিয়েই পাইক্র্যাট গায়ে পড়ে আলাপ জমিয়েছিল আমার সঙ্গে।
হাবিজাবি অনেক বিষয় নিয়ে ভ্যাড়ভ্যাড় করে বকতে বকতে অবশেষে জ্ঞান দিতে আরম্ভ করেছিল খেলাধুলো সম্বন্ধে। আমার চেহারাটা একটু পাতলা, রোগাই বলা চলে; গায়ের রংটাও কালচে, ঠাকুমার মা হিন্দু বলেই হয়তো, কিন্তু সে জন্যে লজ্জা পাই না মোটেই। কিন্তু আমার গায়ের রং দেখে ধমনির হিন্দু রক্ত সম্বন্ধে কেউ ইঙ্গিত করুক, এটাও চাই না মোটেই। তাই যখন পাইক্র্যাফট ফট করে বলে বসল, নিশ্চয় ক্রিকেট খেলি আমি, কেন-না চেহারাটা বেশ পাতলা, গায়ের রংও কালচে, খাইও নিশ্চয় কম, পাইক্র্যাফটের মতোই (সব মোটা মানুষের মতো ওরও বিশ্বাস, স্রেফ না খেয়েই নাকি মোটা হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন), ব্যায়ামও করি কম নাকি ওর মতোই–তখন থেকেই মনটা খিঁচড়ে গিয়েছিল পাইক্র্যাফটের ওপর।
তারপর থেকেই শুরু হয়ে গেল নিজের মোটা হওয়া নিয়ে ধানাইপানাই। মোটা হওয়ার ব্যাপারে কী কী করেছে এবং কী কী করতে চায়। পাঁচজনে কী কী উপদেশ দিয়েছে তার মোটা হওয়ার ব্যাপারে এবং মোটা যারা হয়েছে, তারাই বা কী কী করেছে তাদের মোটা হওয়ার ব্যাপারে, পুষ্টিকর খাবারদাবার বন্ধ করলেই ল্যাটা চুকে যায় না, আসলে দরকার খাদ্যনিয়ন্ত্রণ এবং উপযুক্ত ওষুধপত্র। মাথা ধরে গেল যাচ্ছেতাই মোটা মোটা কথাবার্তায়।
ক্লাব-জীবনে এ ধরনের অত্যাচার এক-আধদিন সওয়া যায়। কিন্তু পাইক্র্যাফট অত্যাচার চালিয়ে গেল দিনের পর দিন। ওর জন্যে ধূমপানকক্ষে যাওয়া বন্ধ করে দিলাম। কিন্তু রেহাই পেলাম না। যেখানেই থাকি-না কেন, ঠিক হেলেদুলে ভারী গতরখানা নিয়ে আমার গা ঘেঁষে বসে পড়ত এবং শুরু হয়ে যেত একই বিষয়ের চবির্তচর্বণ। প্রথম থেকেই একটা জিনিস আঁচ করেছিলাম। ওর বিষম বিপদের সুরাহা নাকি আমার মধ্যে দিয়েই হতে পারে –একমাত্র সুযোগ বাড়িয়ে দিতে পারি কেবল আমিই–এইরকম একটা ধারণা ঘুরঘুর করছে ওর মগজে। গায়ে পড়ে তাই এত আলাপ জমানোর চেষ্টা।
শেষ পর্যন্ত তো একদিন বলেই ফেলল, পশ্চিমি ওষুধপত্রের নাকি কোনও ক্ষমতাই নেই চর্বি কমানোর–শরীর হালকা করার। পারে কেবল প্রাচ্যের মানুষরা। আর সামলাতে পারিনি নিজেকে। তেড়েমেড়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আমার ঠাকুমার মা যে ভারতবর্ষের মেয়ে, এ খবরটা দিয়েছে কে? প্যাটিসন?
