পরে আমাকে বলেছিল, মনে হচ্ছিল যেন জলের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আমাকে– বাধা দিতে পারছি না। প্রথমে অতটা ভয় পাইনি। যদিও তখন নিশুতি রাত–কিন্তু বড় সুন্দর রাত।
হ্যাঁ। এখানে যখন দিন, ওখানে তখন রাত।… জলের মধ্যে সটান ঢুকে গেলাম তারপরেই। ফুলে ফুলে উঠছে জল–চওড়া হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে দিগন্ত পর্যন্ত–ঠিক যেন চকচকে চামড়া দিয়ে ঢাকা ফোঁপরা গহ্বরের মধ্যে নেমে যাচ্ছি আস্তে আস্তে। নামছি ঢালু পথে। জল উঠে এল চোখ পর্যন্ত। তারপর চলে এলাম জলের তলায়। চকচকে চামড়া টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে গিয়ে ফের জুড়ে গেল মাথার ওপর। চাঁদ লাফ দিয়ে উঠল আকাশে, সবুজ চাঁদ। অস্পষ্ট। চারপাশে খেলছে আবছা দ্যুতিময় মাছ। ঠিক যেন কাচের মাছ-গা থেকে আলো ছিটকে যাচ্ছে। সামুদ্রিক উদ্ভিদের একটা জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে নেমে এলাম আস্তে আস্তে–তেলতেলে আভা বেরুচ্ছে জঙ্গল থেকে। নামছি, নামছি, আরও নামছি। একে একে নিবে গেল একটার পর একটা তারা। আরও সবুজ হয়ে এল চাঁদ আরও গাঢ়। বেগুনি-লাল হয়ে এল সামুদ্রিক উদ্ভিদ। রহস্যময় সেই আলো-আঁধারির মধ্যে সবই থিরথির করে কাঁপছে আবছাভাবে। কানে ভেসে আসছে একটানা শব্দের পর শব্দ এই জগতের শব্দ… চেয়ার গড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ… আশপাশে জুতো মশমশিয়ে লোকজনের হাঁটাচলার শব্দ… দূরে খবরের কাগজ ফেরি করার চিৎকার–নেমে গেলাম জলের আরও গভীরে। কালির মতো কালো হয়ে এল চারদিক… নিঃসীম সেই অন্ধকারে বাইরের কোনও আলো ঢোকার যেন অধিকার নেই… অন্ধকার… অন্ধকার… সীমাহীন নিবিড় তমিস্রা ভেদ করে চলেছি তো চলেইছি… ফসফরাস-দ্যুতি বিকিরণ করে উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে উঠছে অন্ধকারের প্রাণীরা… গভীর জলের উদ্ভিদের সর্পিল শাখা নড়ছে স্পিরিট-ল্যাম্পের জ্বলন্ত শিখার মতো… আরও কিছুক্ষণ পরে উদ্ভিদও আর চোখে পড়ল না। বিকট হাঁ আর ড্যাবডেবে চোখ মেলে সটান আমাকে ছুঁড়ে বেরিয়ে গেল ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ। হাঁ-মুখ দেখে প্রথমে ভয় পেয়েছিলাম–তারপর কিছুই টের পেলাম না– মাছেরাও পেল না। সমুদ্রে যে এরকম বিকট মাছ আছে, কোনওদিন কল্পনাতেও ভাবতে পারিনি।
আলোকময় পেনসিল দিয়ে আঁকা যেন মাছগুলো-কিনারা ঘিরে ঠিকরে যাচ্ছে আগুন। কিলবিলে অনেকগুলো হাত মেলে বিকটাকার একটা প্রাণী পেছনদিকে সাঁতরে আসতেই আঁতকে উঠেছিলাম। তারপরেই কাঠ হয়ে গেলাম অস্পষ্ট বিশাল একটা আলোকপুঞ্জকে ধীরে ধীরে আমার দিকেই এগিয়ে আসতে দেখে। জমাট আঁধারের মধ্যে থেকে একটু একটু করে স্পষ্ট হয়ে উঠছে বহু দুরের চাপ-বাঁধা আলোর ডেলা। কাছে আসতেই টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে গেল আলোর কণা। মাছ। ভাসমান কী যেন একটা ঘিরে ঝাঁকে ঝাঁকে ঘুরছে দ্যুতিময় মাছ। আমি চেয়ারে বসে সটান চলেছি সেইদিকেই। আরও কাছে… আরও কাছে… হঠাৎ দেখলাম একটা ভাঙা বরগা… মাছেদের আলোয় তুলকালাম কাণ্ডের মধ্যে মাথার ওপরে ভাসতে দেখলাম লম্বা কাঠখানা… জমাট কালো অন্ধকারের মতো একটা জাহাজের খোলও দেখলাম, কাত হয়ে রয়েছে মাথার ওপর… অন্ধকার কিন্তু ফিকে হয়ে এসেছে ফসফরাস-দ্যুতিতে… মাছেদের ঠোকরানিতে ফুলিঙ্গের মতো ফসফরাস-দ্যুতি ঠিকরে ঠিকরে যাচ্ছে কতকগুলো আকৃতি থেকে… আতঙ্কে দমবন্ধ হয়ে এসেছিল আমার… চেঁচিয়ে ডেকেছিলাম তোমার বোনকে… আধখাওয়া সেই মড়াদের গায়ে অজস্র ছেদা… আমাকে ঠেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল সেইদিকেই… মড়াদের গায়ের ফুটোগুলোর দিকেই…! উঃ! কী বীভৎস! গায়ে কাঁটা দিচ্ছে, তাই না বেলোজ? দেখ তো হাতটা?
তিন-তিনটে সপ্তাহ সেই অপচ্ছায়া-জগতের মধ্যে কাটিয়েছে ডেভিডসন–নিজের চারপাশের এই জগৎকে দেখতে পায়নি একটুও। তারপর এক মঙ্গলবারে দেখা করতে যেতেই ওর বুড়ো বাবার মুখোমুখি হলাম করিডরে। ওভারকোটে হাত গলাতে গলাতে ছুটছেন। আমাকে দেখেই সজল চোখে ধরা গলায় বললেন, বেলোজ, ছেলেটা এবার ঠিক হয়ে যাবে। দেখতে পাচ্ছে… নিজের বুড়ো আঙুলটা এদ্দিনে দেখতে পেয়েছে।
দৌড়ালাম। ডেভিডসন একটা বই চোখের সামনে ধরে বসে ছিল–হাসছিল আপন মনে –অনেকটা পাগলের মতো। বলেছিল, কী আশ্চর্য! এইখানটা… এই জায়গাটা একটুখানি দেখা যাচ্ছে– আঙুল রেখেছিল বইয়ের পাতায় এক জায়গায়–পাথরের ওপর বসে রয়েছি কিন্তু এখনও। বড় গোলমাল করছে পেঙ্গুইনগুলো। দূরে মাঝে মাঝে দেখছি একটা তিমিকে। অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে, স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু এইখানে কিছু ধর–দেখতে পাব… খুব অস্পষ্ট… ভাঙা ভাঙা… তবুও দেখা যাচ্ছে… অস্পষ্ট প্রেতচ্ছায়ার মতো। আজ সকালে জামাকাপড় পরানোর সময়ে প্রথম দেখেছিলাম। নারকীয় এই অপচ্ছায়া-জগতের মধ্যে যেন একটা ফুটো। রাখ–তোমার হাতটা রাখ এইখানে… না… না… ওখানে নয়। হ্যাঁ… ঠিক হয়েছে! দেখতে পাচ্ছি… তোমারই বুড়ো আঙুল… তলার দিক আর শার্টের হাতার একটুখানি। অন্ধকার আকাশ ফুটো করে যেন বেরিয়ে আছে তোমার ভূতুড়ে হাতের একটুখানি! ঠিক পাশেই ভাসছে একদঙ্গল নক্ষত্র!
সেই থেকেই একটু একটু করে সেরে উঠতে লাগল ডেভিডসন। অপচ্ছায়া-জগৎ দেখে যে বর্ণনা দিয়েছিল–নিখুঁত সেই বর্ণনার মতোই দৃশ্য পরিবর্তনের এই বর্ণনাও বিশ্বাস না করে পারা যায় না। অপচ্ছায়া-জগতের জায়গায় জায়গায় যেন ছেদা হয়ে যাচ্ছে… ছায়াবাজির মতো অলীক জগৎ ছিঁড়েখুঁড়ে উড়ে যাচ্ছে… অর্ধস্বচ্ছ ফুটোর মধ্যে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠছে স্বচ্ছ, অস্পষ্ট এই সত্যিকারের জগতের ছেঁড়া ছেঁড়া দৃশ্য। ক্রশঃ পরিধি বেড়েছে ফুটোগুলোর… বেড়েছে সংখ্যায়… আস্তে আস্তে গায়ে গায়ে লেগে গিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সত্যিকারের এই জগতের দৃশ্যর ওপর–অলীক অপচ্ছায়া-জগৎ অস্পষ্ট ছেঁড়া-ছেঁড়াভাবে দেখা গিয়েছে এখানে-সেখানে। চোখের ওপর অন্ধত্ব দানা আকারে যেন জমে রয়েছে–সেই দানার জায়গাগুলোয় তখনও ঠেলাঠেলি করে ফুটে উঠছে অবাস্তব সেই জগতের মরীচিকাদৃশ্য। নিজে থেকে উঠে বসা, চলাফেরা, খাওয়াদাওয়া, ধূমপান করা, বই পড়ায় অভ্যস্ত হল আস্তে আস্তে। দুটো ছবি ওপর-ওপর থাকায় প্রথমটা একটু গোলমাল লাগত। তা-ও সয়ে গেল দুদিনেই। অলীক মায়াজগতের দৃশ্য আর বাস্তব জগতের দৃশ্য আলাদা করে নিতে পারল সহজেই।
