হাত বুলিয়ে আরও ঘাবড়ে গিয়েছিল ডেভিডসন। হাতে টের পাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু চোখে তো দেখছে না।
তাহলে দেখছটা কী? জানতে চেয়েছিলেন ওয়েড। ডেভিডসন আবার আরম্ভ করেছিল একই ধানাইপানাই। রাশি রাশি বালি, ভাঙা ঝিনুক ছাড়া চোখে তো আর কিছুই পড়ছে না ঠিক এই জায়গাটায়।
ওয়েড আরও খানকয়েক জিনিস ধরিয়ে দিয়েছিলেন ডেভিডসনের হাতে। জানতে চেয়েছিলেন জিনিসগুলো কী। তীক্ষ্ণ চোখে দেখছিলেন মুখের চেহারা।
কিন্তু জবাবটা এসেছিল খাপছাড়া–জাহাজ নোঙর ফেলছে মনে হচ্ছে? আত্মগত স্বর ডেভিডসনের।
মৃদু ভর্ৎসনা করেছিলেন ওয়েড। জাহাজ নিয়ে পরে মাথা ঘামালেও চলবে। মরীচিকা দর্শন মানেটা কি জানা আছে ডেভিডসনের?
একটু একটু, আনমনাভাবে বলেছিল ডেভিডসন!
যা দেখছ, সবই মরীচিকা।
বিশপ বার্কলে, আবার সেই খাপছাড়া জবাব।
দূর! পাদরির দরকার হবে কেন? দিব্যি বেঁচে রয়েছ। তবে চোখের গোলমাল হয়েছে দেখা যাচ্ছে। শুনতে পাচ্ছ, হাত বুলিয়ে টের পাচ্ছ–অথচ দেখতে পাচ্ছ না। বুঝেছ?
খুব ভালোভাবেই দেখতে পাচ্ছি, চোখ ডলে বলেছিল ডেভিডসন।
হয়েছে, হয়েছে। যা দেখছ, তা নিয়ে মাথাটাকে আর কষ্ট দিয়ো না। গাড়ি আনাচ্ছি– বেলোজ আর আমি পৌঁছে দেব বাড়িতে।
দাঁড়ান।–ধরে বসিয়ে দেবেন?… ঠিক আছে… এবার বলুন গোড়া থেকে ব্যাপারটা কী?
ধৈর্য না হারিয়ে পুনরাবৃত্তি করে গেলেন ওয়েড। চোখ মুদে কপালে হাত রেখে সব শুনল ডেভিডসন। তারপর বললে চোখ মুদেই, এখন তো মনে হচ্ছে, সবই ঠিক আছে। ইংল্যান্ডেই রয়েছি। বেলোজ বসে রয়েছে পাশে, কৌচে। অন্ধকার।
বলেই খুলল চোখ–ওই দেখা যাচ্ছে সূর্য। জাহাজ। পাগলা সমুদ্র। উড়ন্ত পাখি। সত্যি, একেবারে সত্যি। বসে রয়েছি বালির ঢিপিতে।
চোখ ঢাকা দিয়ে হেঁট হয়েই ফের চোখ খুলে যেন ককিয়ে উঠল পরক্ষণেই–কালো সমুদ্র আর সূর্যোদয়! তা সত্ত্বেও কিন্তু বসে রয়েছি বয়েসের ঘরে–ওরই সোফায়!… এ কী হল আমার!
সেই শুরু। ঝাড়া তিন-তিনটে হপ্তা চলেছিল এই বিচিত্র ভোগান্তি। আক্কেল গুড়ুম করে ছেড়েছিল আমাদের ডেভিডসনের দু-দুটো চোখ, যে চোখে দৃষ্টি আছে, অথচ দৃষ্টি নেই। যেখানে বসে, সেখানকার কিছুই দেখছে না–দেখছে অন্য এক জায়গার দৃশ্য। অন্ধ হওয়াও বরং এর চাইতে ভালো। ওর সেই অসহায় অবস্থা ভাবলেও কষ্ট হয়। সদ্য ডিম ফোঁটা পাখির ছানাকে যেভাবে খাইয়ে দিতে হয়, সেইভাবেই তাকে খাওয়াতে হয়েছে দিনের পর দিন, হাত ধরে নিয়ে যেতে হয়েছে কলতলায়, জামাকাপড় খুলে আবার পরিয়ে দিতে হয়েছে বাচ্চা ছেলের মতো। নিজের চেষ্টায় হাঁটতে গেলেই হুমড়ি খেয়ে পড়েছে দেওয়ালে বা দরজায়–হোঁচট খেয়েছে পায়ের কাছে রাখা জিনিসের ওপর। দু-একদিন পরে অবশ্য আমাদের দেখতে না পেলেও গলা শুনে আর অমন আঁতকে উঠত না। আমার বোনের সঙ্গে ওর বিয়ে ঠিক হয়েছিল। বোন এসে বসে থাকত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ডেভিডসন আশ মিটিয়ে শোনাত সাগর আর সৈকতের অলীক কাহিনি। কলেজ থেকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার সময়ে সে আর-এক ফ্যাসাদ। বাড়ি তো সেই হ্যাঁম্পস্টিড গ্রামে। গাড়ি নাকি ওকে নিয়ে সোজা একটা বালিয়াড়ি ভেদ করে বেরিয়ে গিয়েছিল। চোখে কিছু দেখতে পায়নি… অন্ধকার… কুচকুচে অন্ধকার। ওপাশ দিয়ে বেরিয়ে আসার পর আবার চোখে পড়েছে গাছ, পাথর, নিরেট জিনিস। গাড়ি নাকি এই সবকিছুর মধ্যে দিয়েই ওকে নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছে–অথচ গাছ, পাথর, নিরেট বস্তু বালিয়াড়িটার মতোই ওকে আটকে রাখতে পারেনি। বাড়ি পৌঁছে ওপরতলার ঘরে নিয়ে যাওয়ার সময়ে সে কী পরিত্রাহি চিৎকার। কাল্পনিক দেশের পাথুরে জমির তিরিশ থেকে পঞ্চাশ ফুট ওপরে শূন্যে তোলা হচ্ছে কেন? পড়ে গেলে ছাতু হয়ে যাবে যে! ডিমের মতো ফট করে ফেটে যাবে মাথার খুলি। একনাগাড়ে এই কাঁইমাই সহ্য করা যায়? নামিয়ে আনা হল একতলায়। বাবার কনসাল্টিং রুমের একটা সোফায় বসে তবে নিশ্চিন্ত হল ডেভিডসন।
দ্বীপটার বর্ণনা শুনেছিলাম ওরই মুখে। মন দমে যাওয়ায় মতো জায়গা। গাছপালা অতি সামান্যই। বেশির ভাগই নেড়া পাথর, পেঙ্গুইন আছে বিস্তর, পাথর সাদা হয়ে থাকে– সংখ্যায় এত, দেখতে অতি বিচ্ছিরি, সমুদ্র মাঝেমধ্যে দামাল। প্রথম দু-একদিনের মধ্যে বজ্রবিদ্যুৎসহ ঝড়ও দেখেছে। বজ্রপাত দেখেছে, বিদ্যুতের চমক দেখে নিজেই চমকে চমকে উঠে সমানে চেঁচিয়ে গেছে কিন্তু বজ্রের আওয়াজ, মেঘ ডাকার গুরগুর শব্দ কানে ভেসে আসেনি। নিঃশব্দ সেই বজ্রপাত নাকি এমনই রোমাঞ্চকর যে ভাষায় বর্ণনা করা দুঃসাধ্য। বার দুয়েক বালির ওপর সিল মাছ উঠে এসেছে। পেঙ্গুইনরা নাকি ওর দেহ কুঁড়ে হেলেদুলে দিব্যি চলে গিয়েছে–কারও কোনও অসুবিধে হয়নি। ওর শুয়ে থাকার জন্যে পেঙ্গুইনরা তিলমাত্র বিচলিত বোধ করেনি।
অদ্ভুত একটা ব্যাপার বেশ মনে আছে। সিগারেট খাওয়ার খুব ইচ্ছে হয়েছিল ডেভিডসনের। আঙুলে পাইপ গুঁজে দিয়েছিলাম। কোটর থেকে চোখ দুটো প্রায় ঠেলে বার করে এনেও সিগারেট বা পাইপ কোনওটাই দেখতে পায়নি। ধরিয়ে দিয়েছিলাম সিগারেট। টেনে কোনও স্বাদ পায়নি। এ ব্যাপার আমার ক্ষেত্রেও ঘটেছে। ধোঁয়া না দেখতে পেলে তামাক খাওয়ার মজা পাওয়া যায় না।
আশ্চর্য দর্শনের সবচেয়ে অদ্ভুত অংশটা শুরু হয়েছিল ঠেলা-চেয়ারে বসিয়ে ওকে হাওয়া খেতে নিয়ে যাওয়ার সময়ে। আমার বোন গিয়েছিল সঙ্গে। কেঁদে ফেলেছিল নাকি ডেভিডসন। কাকুতিমিনতি করেছিল বোনের কাছে। ভয়াবহ এই অন্ধকারে আর সে থাকতে পারছে না। অসহ্য! অসহ্য! বোনের হাত খামচে ধরে বলেছিল কাঁদতে কাঁদতে, নিয়ে চল, নিয়ে চল এই অন্ধকারের বাইরে–নইলে আর বাঁচব না। খুলে বলতে পারেনি। ডেভিডসন। বোন ওকে নিয়ে বাড়িমুখে রওনা হয়েছিল তৎক্ষণাৎ চড়াই ভেঙে হ্যাঁম্পস্টিডের দিকে যেতে যেতেই বিভীষিকা থেকে মুক্তি পেয়েছিল বন্ধুবর। আবার নাকি তারা দেখা যাচ্ছে–অথচ তখন সূর্য মাথার ওপর।
