প্রথমটা দারুণ খুশি হয়েছিল ডেভিডসন। ফেটে পড়েছিল মুক্তি পাওয়ার আনন্দে। তারপরেই শুরু হল উলটো টান। বিলীয়মান আশ্চর্য দ্বীপ, বিচিত্র সমুদ্র, পেঙ্গুইনের পাল, সমুদ্রের গভীরে ভাসমান জাহাজের খোল আবার ভালো করে দেখার জন্যে ব্যাকুল হয়েছিল। একা একা ছুটে যেত হ্যাঁম্পস্টিডের নিচু অঞ্চলে। কিন্তু সত্যিকারের দুনিয়ার চড়া রোদ দুদিনেই মিথ্যে দুনিয়ার রাতের অন্ধকারকে মুছে দিলে একেবারে। ছেঁড়া-ছেঁড়া দৃশ্য একটু একটু করে ফিকে হতে হতে একেবারেই গেল মিলিয়ে। তা সত্ত্বেও গভীর রাতে অন্ধকার ঘরে দেখতে পেত অলীক দ্বীপের রোদে তেতে-ওঠা সাদা পাথর, পেঙ্গুইনদের হেলেদুলে চলা। আস্তে আস্তে এ দৃশ্যও সরে গেল তার চোখের সামনে থেকে নিশুতি রাতেও। আমার বোনকে বিয়ে করার পর অলীকদর্শন তিরোহিত হল একেবারেই।
সবচেয়ে উদ্ভট ঘটনাটায় এবার আসা যাক। বিয়ের দুবছর পরে ডিনার খেতে গিয়েছিলাম ডেভিডসন-দম্পতির সঙ্গে। খাওয়াদাওয়ার পর অ্যাটকিন্স নামে একজন ভদ্রলোক এলেন ঘরে। রয়াল নেভির লেফটেন্যান্ট। ভারী চমৎকার মানুষ। আড্ডাবাজ। আসর জমাতে ওস্তাদ। কথায় কথায় পকেট থেকে একটা ফোটো বার করে দেখিয়েছিলেন আমাদের। ছবিটা একটা জাহাজের।
দেখেই আঁতকে উঠেছিল ডেভিডসন!
সেই জাহাজ! যে জাহাজ সে বারবার দেখেছে অলীকদর্শনে–নিখুঁত বর্ণনাও শুনিয়েছে।
অ্যাটকিন্স তো অবাক! এ জাহাজ ডেভিডসন দেখবে কী করে? অ্যান্টিপোড আইল্যান্ডের দক্ষিণে জাহাজ নোঙর করে অ্যাটকিন্স নৌকো নিয়ে দ্বীপে নেমেছিলেন পেঙ্গুইনের ডিম আনবেন বলে। দ্বীপের বর্ণনা, পেঙ্গুইনের বর্ণনা, জাহাজের বর্ণনা কিন্তু অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেল ডেভিডসনের বর্ণনার সঙ্গে। হ্যাঁ, বজ্রবিদ্যুৎসহ ঝড় উঠেছিল সেই রাতে বাধ্য হয়ে রাত কাটাতে হয়েছিল দ্বীপে।
সব শোনবার পর পরিষ্কার বোঝা গেল, সেরাতের সবকিছুই ডেভিডসন দেখেছে। এই লন্ডন শহরে সে যখন এখানে-সেখানে ঘুরছে আমাদের সঙ্গে–অব্যাখ্যাতভাবে তার দৃষ্টিশক্তি বহু দূরের সেই দ্বীপে ঘুরে বেড়িয়েছে এক জায়গা থেকে আর-এক জায়গায়। কীভাবে, আজও তা রহস্য।
ডেভিডসনের আশ্চর্য চোখের অত্যাশ্চর্য কাহিনির পরিসমাপ্তি এইখানেই। দূরের দৃশ্য চামড়ার চোখ দিয়ে দেখার এত বড় নজির আর কেউ দিতে পারবেন না। ব্যাখ্যা অনেকরকমই শোনা যাচ্ছে–প্রফেসার ওয়েডের ব্যাখ্যাটাই সবচেয়ে জোরালো। কিন্তু তাঁর ব্যাখ্যা চতুর্থ মাত্রিক জগৎকে কেন্দ্র করে রচিত, স্থান সম্পর্কে তত্ত্বকথাপূর্ণ ভারী নিবন্ধ ফোর্থ ডাইমেনশনের হেঁয়ালিতে পূর্ণ। দড়ি বা তার যেমন পাকিয়ে যায়, স্থান বা স্পেসও নাকি হঠাৎ পাকিয়ে গিয়ে এই অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছে। হাস্যকর ব্যাখ্যা, সন্দেহ। নেই। এক্কেবারেই উদ্ভট। অবশ্য অঙ্ক জিনিসটা আমার মাথায় ঢোকে না কোনওকালেই। আট হাজার মাইলের ব্যবধান রয়েছে দুটো জায়গার মধ্যে–এটা একটা ঘটনা এবং কোনও তত্ত্বই এ ঘটনাকে উলটে দিতে পারে না। আমার এই জবর যুক্তি শুনে প্রফেসার শুধু বলেছিলেন, এক তা কাগজের ওপর দুটো বিন্দু এক গজ তফাতে রেখেও অনায়াসে মিলিয়ে দেওয়া যায় কাগজটাকে মুড়ে ধরলেই। ফোর্থ ডাইমেনশনের স্থানও নাকি ওইভাবে মোচড় খেয়ে এক হয়ে গিয়েছিল। সুধী পাঠক-পাঠিকা হয়তো তাঁর এই যুক্তির সারবত্তা বুঝতে পারবেন। আমি পারিনি–পারবও না। প্রফেসারের আইডিয়া মাথায় আনতে গেলে মাথা ঘুরতে থাকে আমার। ডেভিডসন বড় ইলেকট্রোম্যাগনেটের দুই প্রান্তের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকার সময়েই নাকি এই বৈজ্ঞানিক বিস্ময়টি ঘটে যায় চকিতের মধ্যে, অস্বাভাবিক এক মোচড় মুচড়ে দেয় তার অক্ষিপটের মৌলকে–এবং সেটা ঘটে বজ্রপাতের ফলে শক্তিক্ষেত্র অকস্মাৎ পালটে যাওয়ার।
প্রফেসারের বিশ্বাস, এর পরিণামস্বরূপ, পৃথিবীর এক জায়গায় দেহ নিয়ে বিদ্যমান থেকে অপর জায়গায় শুধু চোখে দেখার জগৎ নিয়ে দিব্যি বসবাস করা অসম্ভব কিছু নয়। আইডিয়াটা সপ্রমাণ করার জন্যে কিছু এক্সপেরিমেন্টও করেছিলেন, কিন্তু কয়েকটাকুকুরকে অন্ধ করে দেওয়া ছাড়া ফললাভ কিছু ঘটেনি। বেশ কয়েক হপ্তা আর দেখা হয়নি প্রফেসারের সঙ্গে। জানি না এখনও তাঁর ওই ফ্যান্টাস্টিক তত্ত্ব নিয়ে হেদিয়ে মরছেন কি না। আমার কিন্তু ধ্রুব বিশ্বাস, ডেভিডসনের অত্যাশ্চর্য অভিজ্ঞতার মূল অন্যত্র–ফোর্থ ডাইমেনশনের উদ্ভট গণ্ডির মধ্যে অন্তত নয়।
দেহ-লুঠেরা
দেহ-লুঠেরা ( The Story of the Late Mr. Elvesham )
[‘The Story of the Late Mr. Elvesham’ প্রথম প্রকাশিত হয় ‘The Idle’r পত্রিকায় মে ১৮৯৬ সালে। ১৮৯৭ সালে লন্ডনের ‘Methuen & Co.’ থেকে প্রকাশিত ওয়েলসের ছোটগল্পের সংকলন ‘The Plattner Story and Others’ বইটিতে গল্পটি স্থান পায়। জুন ১৯২৭ সালে গল্পটি পুনঃপ্রকাশিত হয় ‘Amazing Stories’-তে।]
কাহিনিটা লিখে যাচ্ছি স্রেফ পরোপকারের মনোবৃত্তি নিয়ে। আমার মতো আর কেউ যেন ফাঁদে পা না দেয়। আমার দুর্গতির কাহিনি পড়ে যেন পাঁচজনে উপকৃত হয়। আমার যা হবার, তা তো হয়েই গেছে। পরিত্রাণ নেই। মৃত্যুর জন্যে তৈরি হচ্ছি।
জানি, অবিশ্বাস্য এই কাহিনি পড়ে মুচকি হাসি হাসবেন প্রত্যেকেই। সত্যি কথা বলতে কী, বিশ্বাস করানোর প্রত্যাশা নিয়েও কলম ধরিনি। উদ্দেশ্যটা স্রেফ পরোপকার–আমার মতো হাল আর যেন কারও না হয়।
