আমি ভাবলাম বুঝি ফচকেমি শুরু করেছে ডেভিডসন। তারপরেই দেখলাম, তার পায়ের কাছে ভেঙেচুরে পড়ে রয়েছে ল্যাবরেটরির সবচেয়ে ভালো ইলেকট্রোমিটারটা। বললাম, কী চ্যাংড়ামি হচ্ছে ডেভিডসন? ইলেকট্রোমিটারটা ভাঙলে কেন?
আরে গেল যা! বেলোজই তো চেঁচাচ্ছে। ইলেকট্রোমিটার ভেঙেছি? বেলোজ! এ বেলোজ! কোথায় তুমি? বলেই আচমকা টলতে টলতে এগিয়ে এল আমার দিকে। বেঞ্চির সামনে এসেই যেন কুঁচকে গেল। মাখনের মধ্যে পা চালিয়ে এলাম যেন এতক্ষণ। এখন তো আর পারছি না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দুলতে লাগল মাতালের মতো।
এবার ভয় পেলাম। বললাম, কী হল তোমার?
ডাইনে-বাঁয়ে সামনে-পেছনে ঘুরে ঘুরে আমাকে খুঁজল ডেভিডসন। বললে আপন মনে, বেলোজের গলা। কিন্তু বেলোজ! কী ইয়ারকি হচ্ছে? সামনে এসো-না!
ডেভিডসন কি হঠাৎ অন্ধ হয়ে গেছে? সন্দেহটা বিদ্যুঝলকের মতোই ঝলসে উঠল মাথার মধ্যে। টেবিলটাকে পাক দিয়ে ওর হাতে হাত রাখলাম, সাংঘাতিক চমকে উঠল ডেভিডসন। জীবনে এভাবে চমকে উঠতে কাউকে দেখিনি। আতঙ্কে বিকৃত মুখভঙ্গি করে দাঁড়াল আত্মরক্ষার ভঙ্গিমায়। সেই সঙ্গে সেই অর্থহীন চিৎকার–যাচ্চলে! এ আবার কে?
আমি–ডেভিডসন–আমি বেলোজ!
তিড়িং করে লাফিয়ে উঠেই ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল ডেভিডসন–আমাকে ছুঁড়ে আমার মধ্যে দিয়ে ওর দৃষ্টি চলে গেল অনেক দূর!
তারপরই শুরু হল বিড়বিড় বকুনি। নিজের মনেই বকে চলেছে–আমার উদ্দেশে বলছে না কিছুই–এই তো দিনের আলো… ঝকঝক করছে সমুদ্রসৈকত। লুকিয়ে থাকবে কোথায়? পাগলের মতো চাইল ডাইনে-বাঁয়ে সামনে-পেছনে। দেখি তো কোথায়? আচমকা ঘুরে দাঁড়িয়েই ধাঁ করে ধেয়ে গেল সটান বড় ইলেকট্রোম্যাগনেটটা লক্ষ্য করে– পরক্ষণেই ধাঁই করে এক ধাক্কা। পরে দেখেছিলাম, কাঁধ আর চোয়ালের হাড়ে কালশিটে পড়ে থেঁতলে গিয়েছিল এইভাবে দমাস করে আছড়ে পড়ায়। যন্ত্রণায় মুখ বেঁকিয়ে এক পা পেছিয়ে এসে সে কী গোঙানি–হে ভগবান! এ কী হল আমার! বিষম আতঙ্কে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল ডান হাত দিয়ে বাঁ হাত খামচে ধরে–ম্যাগনেট চোট দিয়েছিল সেখানেও।
উদ্ভট এই কাণ্ডকারখানা দেখে আমি কিন্তু ততক্ষণে যেমন উত্তেজিত, তেমনি ভয় পেয়েছি। তা সত্ত্বেও অভয় দিয়েছিলাম মিনমিনে স্বরে। ও কিন্তু আমার গলা শুনেই আবার আগের মতোই আঁতকে উঠেছিল একটু বেশিরকমভাবেই। কেশে গলা সাফ করে পরিষ্কারভাবে আবার অভয় দিতে ও জানতে চেয়েছিল আমিই বেলোজ কি না।
কেন? চোখে দেখতে পাচ্ছ না? বলেছিলাম আমি। আবার সেই বিতিকিচ্ছিরি হাসি হেসেছিল ডেভিডসন। নিজেকেই নাকি দেখতে পাচ্ছে না, আমাকে দেখার প্রশ্নই উঠছে। না!
আমি বলেছিলাম, সে কী! ল্যাবরেটরিতে দাঁড়িয়ে আছি তোমার সামনেই।
ল্যাবরেটরি! বিমূঢ় স্বরে জবাব দিয়েছিল ডেভিডসন–ল্যাবরেটরিতে তো ছিলাম দারুণ ঝলকে চোখ ঝলসে যাওয়ার আগে পর্যন্ত। এখন তো সেখানে নেই। যাক গে! জাহাজটা দেখছ?
জাহাজ? কী আবোল-তাবোল বকছ?
তেড়ে উঠেছিল ডেভিডসন। স্পষ্ট দেখছে, জাহাজ ভাসছে জলে, ঢেউ নাচছে সমুদ্রে– বললেই হল জাহাজ নেই! তাহলে নিশ্চয় অক্কা পেয়েছি দুজনেই। কিন্তু মজা তো সেখানেই। মরে গেলে কি দেহ থাকে? দেহের যন্ত্রণা থাকে? ওর নাকি দেহ আছে–কিন্তু দেহটাকে বাগে আনতে পারছে না কিছুতেই। ধমক দিয়েছিলাম আমি। পাগলামির একটা সীমা আছে। বহাল তবিয়তে ল্যাবরেটরির মধ্যে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের ঢেউ আর জাহাজ দেখা যায়? এইমাত্র একটা ইলেকট্রোমিটার ভাঙা হল তো এইখানেই–বয়েস এসেই তো একহাত নেবে।
ক্রায়োহাইড্রেটসের রেখাচিত্রের দিকে যেতে যেতে ডেভিডসন বলেছিল, কালা হয়ে গেলাম নাকি? কামান ছুঁড়েছে জাহাজ থেকে ধোঁয়া দেখতে পাচ্ছি আওয়াজ তো পেলাম না।
এ তো আচ্ছা জ্বালা! আবার হাত রেখেছিলাম ওর হাতে। এবার আর ভূত দেখার মতো চমকে ওঠেনি। বলেছিল অনেকটা আত্মস্থ স্বরে, তবে কি দুজনেই অদৃশ্য দেহ পেয়ে বসেছি? বেলোজ, দেখতে পাচ্ছ না? নৌকো আসছে–ডাঙার দিকে আসছে–দেখছ?
ডেভিডসন! জোরে ঝাঁকুনি দিয়ে বলেছিলাম, জাগ, বন্ধু, জাগ!
ঠিক এই সময়ে ঘরে ঢুকেছিল বয়েস। ওর গলা শোনার সঙ্গে সঙ্গে সে কী চিৎকার ডেভিডসনের–বয়েস! তুমিও মারা গেছ! কী সর্বনাশ!
বয়েসকে তাড়াতাড়ি বুঝিয়ে দিয়েছিলাম ব্যাপারটা। ঘুমের ঘোরে হাঁটাচলার রোগে পেয়েছে নিশ্চয় ডেভিডসনকে। শুনেই কৌতূহল জাগ্রত হয়েছিল বয়েসের। ঘোর কাটিয়ে দেওয়ার অনেক চেষ্টা করেছিলাম দুজনে। প্রশ্নের জবাব দিয়েছিল। ডেভিডসন নিজেও প্রশ্ন করেছিল, কিন্তু মনটা পড়ে রয়েছে যেন সৈকত আর জাহাজের দিকে। মরীচিকা কাটিয়ে উঠতে পারছে না কিছুতেই। ছায়ামায়ায় ভরা বীক্ষণাগারের মধ্যে ও নাকি সমানে দেখতে পাচ্ছে পাল আর জাহাজ, নৌকো আর ঢেউ। শুনলেও গা শিরশির করে।
বেশ বুঝলাম, চোখের দৃষ্টি একেবারেই হারিয়েছে। নিতান্ত অসহায়। দুজনে দুপাশ থেকে কনুই ধরে করিডর বরাবর হাঁটিয়ে নিয়ে গেলাম বয়েসের প্রাইভেট ঘরে।
ডেভিডসনের মনে, চোখে ভাসছে কিন্তু সেই অবাস্তব জাহাজ। বয়েসও ছেলে ভোলানোর মতো সায় দিয়ে গেছে সমানে। ঘরে পৌঁছে খবর পাঠিয়েছিলাম কলেজের ডিন বুড়ো ওয়েডকে। ওঁর গলা শোনার পর একটু যেন শান্ত হয়েছিল ডেভিডসন। ঘ্যানর ঘ্যানর কিন্তু কমেনি। জানতে চেয়েছিল, হাত দুখানা তার কোন চুলোয়–দেখা যাচ্ছে না কেন? কোমরসমান উঁচু জমির মধ্যে দিয়েই বা তাকে হাঁটিয়ে আনা হল কেন? শুনে-টুনে ভুরু কপাল কুঁচকে চেয়ে রইলেন বুড়ো ওয়েড। তারপর ডেভিডসনের হাতখানা তুলে ধরে কৌচ ছুঁইয়ে বললেন, এই তো তোমার হাত-হাত দিয়েছ কৌচে–প্রফেসার বয়েসের প্রাইভেট রুমে। ঘোড়ার চুল-ঠাসা কুশন–তা-ই না?
