আবার যখন ফিরে গেলাম স্বপ্নের মধ্যে–দেখেছিলাম, একদল সৈন্য এগিয়ে যাচ্ছে মন্দির চত্বরের দিকে–আমি বসে আছি বাইরে। বাধা দিয়েছিলাম। আমার ভাষা তারা বোঝেনি। আমিও তাদের ভাষা বুঝিনি। একজন তলোয়ারধারীর হাত চেপে ধরতেই
তলোয়ারটা আমূল ঢুকিয়ে দিয়েছিল আমার বুকে।
না। কোনও যন্ত্রণা অনুভব করিনি৷ অপরিসীম বিস্ময়বোধে শুধু আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিলাম।
লন্ডন এসে গেছে। ল্যাম্পপোস্টের পর ল্যাম্পপোস্ট সাঁত সাঁত করে পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। গোধূলির রক্তাভা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। গতি কমে আসছে ট্রেনের।
আর স্বপ্ন দেখেননি? প্রশ্ন করেছিলাম বিষম উৎকণ্ঠায়।
দেখেছি। শুধুই দুঃস্বপ্ন। মন্দিরের ওদিকে রয়েছে আমার সঙ্গিনী। কাছে যেতে পারছি না কিছুতেই।
কুলির হাঁক শুনলাম বাইরে।
———–
[অনুবাদক: আরমাগেডন–বাইবেলে, বিশেষ করে বুক অব রিভিলেশন-এ শেষের দৃশ্য, শুভ বনাম অশুভ শক্তির চূড়ান্ত লড়াই। এ লড়াই হবে বিচার দিবসের আগে। নামের মধ্যে সম্ভবত মেগিডো পাহাড়ের উল্লেখ আছে। বহু প্রাচীন যুদ্ধের ক্ষেত্র ছিল বলে লোকপ্রসিদ্ধ যুদ্ধ প্রতীক হিসাবে মেগিডো পাহাড় বিখ্যাত।]
ডেভিডসনের আশ্চর্য চোখ
ডেভিডসনের আশ্চর্য চোখ ( The Remarkable Case of Davidsons Eyes )
[‘The Remarkable Case of Davidsons Eyes’ প্রথম প্রকাশিত হয় ‘The Story of Davidsons Eyes’ নামে, ১৮৯৫ সালের মার্চ মাসে ‘Pall Mall Budget’ পত্রিকায়। যদিও ওয়েলসের খুব বিখ্যাত গল্পগুলির মধ্যে একে গণ্য করা হয় না, গল্পটি সে যুগের রিমোট ভিউইং গোত্রের গল্পগুলির মধ্যে এটি উল্লেখযোগ্য। এরপর গল্পটি পুনঃপ্রকাশিত হয় বিখ্যাত সাই-ফাই পত্রিকা ‘Amazing Stories’-তে, প্রথম বর্ষপূর্তি সংখ্যায় ১৯২৭ সালের এপ্রিল মাসে। অদ্রীশের কলমে গল্পটি বাংলায় অনুদিত হয় অধুনালুপ্ত কিশোর মন পত্রিকায় ১৯৮০-র দশকে ‘ডেভিডসনের আশ্চর্য চোখ’ নামে।]
সিডনি ডেভিডসনের ক্ষণস্থায়ী মানসিক ভ্রান্তি এমনিতেই রীতিমতো চমকপ্রদ। ওয়েড যে ব্যাখা শুনিয়েছেন, তা মানতে গেলে ব্যাপারটা আরও বেশি চমকপ্রদ হয়ে দাঁড়ায়। দূর ভবিষ্যতে নাকি দারুণ দারুণ ঘটনা ঘটবে যোগাযোগব্যবস্থায়। পৃথিবীর এ পিঠ আর ও পিঠের মধ্যে দূরত্ব বলে আর কিছুই থাকবে না। স্বচ্ছন্দে মিনিট পাঁচেক কাটিয়ে আসা যাবে পৃথিবীর উলটোদিকে। ঘর ছেড়ে বেরতেই হবে না–চেয়ার ছেড়েও নড়তে হবে না। এমনও হতে পারে, লুকিয়ে-চুরিয়ে কোনও গোপন কাজই আর করা যাবে না। অদৃশ্য চাহনি খর-নজর রাখবে আমাদের প্রতিটি গুপ্ত ক্রিয়াকলাপের ওপর। ভবিষ্যতে এমনি অনেক পিলে-চমকানো সম্ভাবনা সত্যি সত্যিই পিলে চমকে দেবে বাস্তবের চেহারা নিয়ে। ডেভিডসন এই সৃষ্টিছাড়া ভ্রান্তি-ঘোরে আক্রান্ত হয়েছিল আমার সামনেই। প্রথম প্রত্যক্ষদর্শী আমিই। কাজেই কাহিনিটা কাগজে-কলমে প্রকাশ করার দায়িত্বও আমার।
ঘটনাস্থলে প্রথম হাজির হয়েছিলাম আমি–তাই আমি সেই মুহূর্তের প্রত্যক্ষদর্শী। আশ্চর্য ব্যাপারটা ঘটেছিল হার্লো টেকনিক্যাল কলেজে-হাইগেট আর্চওয়ের পাশেই। ছোট ঘরটায় ছিলাম আমি। নোট লিখছিলাম। ওজন করার সরঞ্জাম থাকে এই ঘরেই। কাজে অবশ্য মন দিতে পারছি না। লন্ডন শহরটার ঝুঁটি ধরে যেন ঝাঁকুনি দিচ্ছে সাংঘাতিক ঝড়। সেই সঙ্গে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, বাজ পড়ছে। আচমকা একটা বাজের আওয়াজে কানের পরদা যেন। ফালাফালা হয়ে গেল! দারুণ চমকে উঠেছিলাম। বজ্রপাতের কানফাটা আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে আরও একটা আওয়াজ যেন ভেসে এল কানে পাশের ঘর থেকে। কাচ ভাঙার ঝনঝন শব্দ। লেখা থামিয়ে কান খাড়া করলাম। সেকেন্ডকয়েক আর কোনও আওয়াজ পেলাম না। ঢেউখেলানো দস্তা-ছাদের ওপর শিলাবৃষ্টির ঝমাঝম আওয়াজ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। ঠিক যেন শয়তানের আঙুলের বাদ্যি। খট খটা খট! খট খটা খট! খট খটা খট! তারপরেই আবার কানে এল আর-একটা আওয়াজ। দড়াম করে কী যেন আছড়ে পড়ল বেঞ্চি থেকে নিচে। বেশ ভারী জিনিস। না, এবার আর কানের ভুল নয়। তড়াক করে লাফিয়ে উঠে দরজা খুলে ঢুকলাম বড় ল্যাবরেটরির মধ্যে।
অবাক হয়ে গিয়েছিলাম বিদঘুটে একটা হাসির আওয়াজ শুনে। ডেভিডসনকে অপ্রকৃতিস্থের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম ঘরের মাঝখানে। পা টলছে। চোখে-মুখে ভ্যাবাচ্যাকা ভাব। দেখেই প্রথমে মনে হয়েছিল, নেশা করেছে। আমাকে লক্ষই করল না। হাত বাড়িয়ে বাতাসে কী যেন খামচে ধরার চেষ্টা করছে দশ আঙুল দিয়ে। জিনিসটা কিন্তু দেখা যাচ্ছে না। ডেভিডসনের রকমসকম দেখে মনে হচ্ছে, অদৃশ্য বস্তুটা রয়েছে চোখের গজখানেক সামনে। হাত বাড়িয়ে দিল খুব আস্তে আস্তে। বেশ দ্বিধার সঙ্গে খামচে ধরল বস্তুটা। কিন্তু পেল না কিছুই। আপন মনেই বললে, ব্যাপার কী বুঝছি না। দশ আঙুল ছড়িয়ে হাত বুলিয়ে নিলে মুখে। কী আশ্চর্য! বলেই পা তুলল বদ্ধপাগলের মতো–যেন পা আটকে যাচ্ছে মেঝেতে বেগ পেতে হচ্ছে পা তুলতে।
চিৎকার করে বলেছিলাম, ডেভিডসন! হল কী তোমার? বোঁ করে আমার দিকে ফিরে তাকাতে লাগল ডেভিডসন আমার আশপাশ দিয়ে। কখনও তাকায় আমার ঘাড়ের ওপর দিয়ে পেছনে, কখনও দুপাশে, কখনও সোজাসুজি আমার দিকেই। অথচ দেখতে পেয়েছে বলে মনেও হল না। বিড়বিড় করে বললে নিজের মনে–ঢেউ! ঢেউ! পালতোলা জাহাজটাও কী সুন্দর। বেলোজের গলা শুনলাম না? হ্যাঁ, বেলোজের গলাই তো বটে! না, ভুল হয়নি। হ্যাল্লো? তুমি কোথায়? আচমকা চেঁচিয়ে উঠল গলার শির তুলে।
