পরের দিন বিশ্বব্যাপী যুদ্ধের খপ্পর থেকে পলায়ন করেছিলাম দুজনে। দূরে… দূরে অনেক দূরে।
কত দূরে?
জবাব নেই।
কদ্দিন লেগেছিল পালাতে?
সে নিরুত্তর। মুখ সাদা। হাত মুষ্টিবদ্ধ। আমার কৌতূহল তাকে আর স্পর্শও করছে না।
পালিয়ে গেলেন কোথায়?
কখন?
ক্যাপ্রি থেকে বেরিয়ে?
দক্ষিণ-পশ্চিমে। নৌকোয় করে।
এরোপ্লেন নিলেন না কেন?
সব এরোপ্লেনই তখন যুদ্ধ-পাগলদের হাতে।
আর প্রশ্ন করা সমীচীন বোধ করলাম না। একটু পরে সে যেন নিজের মনের সঙ্গেই তর্ক চালিয়ে গেল আত্মগত সুরে।
কেন এই যুদ্ধ? কেন এই রক্তক্ষয়? কেন জীবন নিয়ে হানাহানি? ভালোভাবে জীবনটাকে উপভোগ করব বলেই তো সরে এসেছিলাম যুদ্ধ থেকে ভালোবেসে বাঁচতে চেয়েছিলাম, ঢলঢলে দুটো চোখের মধ্যে নতুন জীবনের ছবি দেখেছিলাম, সুন্দর একটা মুখের মধ্যে জীবনের আহ্বান স্পন্দিত হতে দেখেছিলাম। কিন্তু তার বদলে কী পেলাম? যুদ্ধ আর মৃত্যু!
স্বপ্ন ছাড়া তো কিছু না।
স্বপ্ন! দপ করে জ্বলে উঠেছিল সে–এখনও বলবেন এর নাম স্বপ্ন!
সেই প্রথম দেখলাম, প্রচণ্ড প্রাণশক্তির প্রলয়ংকর বিস্ফোরণ ঘটল যেন তার মধ্যে। দুহাত মুঠো পাকিয়ে শূন্যে তুলে ফের নামিয়ে নিল হাঁটুর ওপর। চোখ ফিরিয়ে নিলে আমার দিক থেকে। বাকি কথাগুলো বলে গেল অন্যদিকেই চেয়ে।
প্রেতচ্ছায়ার মতোই অনেক বাসনা-কামনা ঘিরে রয়েছে আমাদের। প্রেতচ্ছায়ার মধ্যে প্রেতচ্ছায়ার মতোই এগিয়ে চলেছি আমরা দিনের পর দিন। আলো আর ছায়ার মতো বাস্তবতা আর অবাস্তবতার দোলায় দুলে যাচ্ছি নিরন্তর। একটা বিষয় কিন্তু স্বপ্ন নয়। মোটেই, কখনও নয়। যা আমার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু, আর সবকিছুই তুচ্ছ, নগণ্য, অকিঞ্চিৎকর এই কেন্দ্রবিন্দুর কাছে। সব মিথ্যে, সব ফাঁকা! কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আমার সঙ্গিনী, যাকে আমি ভালোবাসি, আমার স্বপ্নের সেই সঙ্গিনী, যাকে নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারিনি। মারা গেছি দুজনেই!
স্বপ্ন! যে স্বপ্ন একটা জীবন্ত মানুষের দিবস-রজনির প্রতিটি মুহূর্তে বিষম যাতনায় ভরিয়ে রাখে, তাকে কি স্বপ্ন বলা যায়? স্বপ্নের শোকের যন্ত্রণা জাগরণে একজনকে এইভাবে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে খাক করে দিতে পারে? তবুও বলবেন এর নাম স্বপ্ন?
সঙ্গিনী নিহত হওয়ার মুহূর্ত পর্যন্ত আশা ছিল, পালিয়ে বেঁচে যাব। নৌকোয় যাওয়ার সময়ে দেখেছিলাম যুদ্ধসাজে সজ্জিত ক্যাপ্রিকে। সাদা পাথরের অজস্র জানলা আর তরুবীথি-সমারোহ দেখে তখনও শান্তির নিকুঞ্জ বলেই মনে হয়েছিল দ্বীপটাকে। তারপরে চোখে পড়েছিল বিরাট বিরাট হাতিয়ার। উত্তরে-দক্ষিণে-পূর্বে দেখেছিলাম বর্শাফলকের আকারে ধাবমান বিমানশ্রেণির ছুটোছুটি। এ্যাম নিশ্চেষ্ট নেই–ধেয়ে যাচ্ছে পূর্বে। পূর্বের বিমান ধেয়ে যাচ্ছে উত্তরে। দক্ষিণ থেকেও আসছে ঝাঁকে ঝাঁকে বিমান। বিশালকায় পাখির দঙ্গল পঙ্গপালের মতো ছেয়ে ফেলেছে আকাশকে। যুদ্ধে মেতেছে সারা পৃথিবী।
ডাঙায় পায়ে হেঁটে যেতে গিয়ে বাধা পেয়েছি পদে পদে। পকেটে অর্থ নেই–আমার পরিচয়েরও আর কোনও দাম নেই। সঙ্গিনীর নিগ্রহ-সম্ভাবনায় কারও কাছে। দাক্ষিণ্যপ্রত্যাশীও হইনি। ঘন ঘন কামান নির্ঘোষ শুনেছি দক্ষিণ-পশ্চিমে। চোরের মতো গা ঢেকে আমরা এগিয়েছি শুধু উত্তরদিকে। পথকষ্ট ক্লান্ত করেছে সঙ্গিনীকে, কষ্ট কাকে বলে, জীবনে সে জানেনি, তবুও মুখ ফুটে কখনও তা ব্যক্ত করেনি। খিদের জ্বালা মুখ বুজে সহ্য করে গেছে। ছিন্ন পোশাকে ধুলোয় আর নোংরায় আমাদের চেহারা পর্যন্ত পালটে গেছে। পালাচ্ছে চাষিরাও। ধরা পড়ছে সৈন্যদের হাতে, চালান করছে সেনাশিবিরে। মতলব ছিল, আবার একটা নৌকো নিয়ে সমুদ্রে ভাসব, কিন্তু তা আর হল না। যুদ্ধ গিলে নিল আমাদের দুজনকেই।
বেশ বুঝেছিলাম, দুদল সৈন্যের মাঝে পড়ে গিয়েছি৷ লড়াইয়ের ঠিক মাঝখানে। ঘন ঘন এরোপ্লেন উড়ে যাচ্ছে মাথার ওপর দিয়ে। শুনছি কামান নির্ঘোষ। সেসব কামান এ যুগের কামানের চেয়েও অনেক বেশি বিধ্বংসী, সে যুগের যুদ্ধবিমানদের ক্ষমতা যে কদ্দূর, সে হিসেবও কেউ রাখে না, তৈরি হওয়ার পর থেকে কোনও দিন কাজে তো লাগেনি…
আমার সঙ্গিনী কাঁদছিল। আমি পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। পথকষ্ট আর সইতে পারছে না–কাঁদুক। একটু আগে মিনতি করেছিল। আমি রাজি হইনি। যুদ্ধে আমি নেই–থাকবও না। অনুতাপ? একেবারে নেই। মৃত্যু? আসুক-না।
মাথার ওপর ফাটল একটা গোলা। দূরে কয়েকটা বিমান জ্বলতে জ্বলতে ফেটে গেল শুন্যে। পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখলাম, সঙ্গিনী উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়েছে আমার দিকে। তারপরেই মুখ থুবড়ে পড়ল মাটিতে।
কাছে গেলাম। হৃৎপিণ্ড এ ফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে গেছে গোলার টুকরোয়।
তারপর?
পাঁজাকোলা করে তাকে বয়ে আনলাম কতকগুলো পুরানো মন্দিরের মাঝে একটা চত্বরে–কবরখানা বলেই মনে হল। পাথরের ওপর তাকে শুইয়ে পাশে বসে রইলাম পাথরের মতো। টিকটিকি আর গিরগিটি ছুটোছুটি করতে লাগল আশপাশে।
এইভাবেই কতক্ষণ বসে ছিলাম জানি না। স্বপ্ন থেকে ফিরে এসে দেখেছিলাম, বসে রয়েছি অফিসঘরে। কীভাবে যে ঘুম থেকে উঠে জামাকাপড় পালটে অফিসে এসেছি, কিছু মনে নেই। চিঠিপত্র দেখে গেছি যন্ত্রের মতো–কী লেখা ছিল কাগজপত্তরে–তা-ও মনে নেই।
