সাবমেরিনের নব্বইজন আধিকারিক এবং নাবিকের সঙ্গে আমার মোলাকাত হয়েছিল। প্রত্যেকে তাঁর নিজস্ব কাজে ব্যস্ত। যে কাজ খুব সহজসাধ্য ছিল না, কিন্তু তাঁরা তাঁদের মিশনের চ্যালেঞ্জের জন্য গর্ববোধ করেন। মধ্যাহ্নভোজনে সুস্বাদু নিরামিষ খাবার পরিবেশন করা হয়েছিল এবং পরবর্তী ত্রিশ বছরে নৌবাহিনীর সাবমেরিন পরিকল্পনা নিয়ে একটা প্রেজেন্টেশন উপস্থাপিত হয়েছিল। জলের নীচে তিন ঘণ্টা কাটিয়ে আমরা জলের ওপরে ভেসে উঠলাম ও তীরে ফিরেছিলাম। সার্বিকভাবে ওটা ছিল এক স্মরণীয় পরিভ্রমণ।
২০০৬ এর ৮ জুন, আমি সুখোই-৩০ যুদ্ধবিমানে এক উড়ানে উড়লাম। আগের রাতে কমান্ডার অজয় রাঠোর আমায় কেমনভাবে উড়তে হবে তার পাঠ দিয়েছিলেন, শিখিয়েছিলেন কীভাবে বিমান চালাতে হবে, সঙ্গে অস্ত্রনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আয়ত্তে রাখতে হবে। এই কাজটা আমি যখন ইঞ্জিনিয়ার হয়েছিলাম, সেই ১৯৫৮ সাল থেকে করতে চেয়েছিলাম। মহাকাশ উপযোগী পোশাক পরার পরে সুখোই টেক অফ করে হু-হু ৭৫০০ মিটার — ২৫,০০০ ফিট উঁচুতে উড়ে চলল, ঘণ্টায় ১২০০ কিমি বেগে। উইং কমান্ডার রাঠোর কয়েকটা পাক ও কৌশলের বুদ্ধি দিলেন। আমার যুদ্ধবিমান চালানোর এক ব্যাপক অভিজ্ঞতা এবং তিনগুণ মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কাছাকাছি শক্তি অনুভব করার অভিজ্ঞতা হল। অবশ্যই ব্ল্যাক আউট থেকে বাঁচার জন্য জি-স্যুট বা জি মহাকাশ উপযোগী পরিধান পরেছিলাম। উড়ান চলাকালীন ভারতীয় বৈজ্ঞানিকদের দ্বারা যে-সমস্ত ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে এবং যুদ্ধবিমানে একত্রিত করা হয়েছে তা বোঝবার চেষ্টা করছিলাম। মিশন কম্পিউটার, র্যাডার ওয়ার্নিং রিসিভার, ডিসপ্লে প্রসেসর ও দেশে নির্মিত অন্যান্য যন্ত্রপাতি দেখে ভীষণ খুশি হয়েছিলাম। বায়ুমণ্ডলে বা ভূমিতে কোনও লক্ষ্য স্থির করতে কীভাবে কৃত্রিম আলোকরন্ধ্রের মাধ্যমে প্রতিফলিত বেতার রশ্মির সাহায্য নেওয়া হয় তা দেখানো হয়েছিল। প্রায় ৩৬ মিনিট ধরে উড়ান চলেছিল, আমার বহুদিনকার স্বপ্ন যেন পরিপূর্ণতা লাভ করেছিল। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল ছত্রী সেনাবাহিনী, কেন্দ্রীয় ও রাজ্য পুলিশবাহিনী এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মীদের সঙ্গে ভাব বিনিময় করার। তাঁদের নিষ্ঠা এবং শৌর্য আমার মনে গভীর ছাপ রেখেছিল।
.
রাষ্ট্রপতি হিসেবে আমাদের সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে মিলিত হওয়ার সুযোগ হয়েছে। পারস্পরিক ভাবের আদানপ্রদানের মাধ্যমে আমি তাদের বোঝার এবং তাদের আকাঙ্ক্ষা এবং চ্যালেঞ্জ উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছি। সমস্ত মানুষকে সাধারণ জাতীয় লক্ষ্যে একতাবদ্ধ করাও আমার পক্ষে সমান গুরুত্বপূর্ণ।
০৫. জাতিকে আমি কী দিতে পারি?
৫. জাতিকে আমি কী দিতে পারি?
স্বপ্নই জাতিকে উন্নীত করে
দেশকে আমি কী দিতে পারি? অন্যান্য দেশের মধ্যে আমার দেশকে সম্মান এবং শ্রদ্ধা দিতে পারি। আমার একলক্ষ কোটি দেশবাসী ভাই-বোনের মুখে হাসি ফোটাতে পারি। শুধুমাত্র অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং শিক্ষার মাধ্যমে তা সম্ভব। আত্মসম্মান অর্জনের ক্ষেত্রে শিক্ষা হল সর্বপ্রধান। নিবেদনের অভ্যাসের বদ্ধমূল সংস্কার উন্নয়নের মূলস্রোতে আমাদের দেশবাসীকে নিয়ে আসবে।
স্বাধীনতা দিবস এবং প্রজাতন্ত্র দিবসের প্রাক্কালে ভারতের রাষ্ট্রপতি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবার সম্মান লাভ করেন। এই দুই উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্দিষ্ট পর্বে দেশের উন্নয়ন এবং উন্নয়নকালীন পর্বে যেসব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয় তা জ্ঞাপন করেন।
অভিভাষণ প্রথমে ইংরেজিতে দেওয়া হয়, তারপর হিন্দিতে। ব্যতিক্রম হিসেবে আমি অভিভাষণের শুরুতে শুভেচ্ছা জানাতাম এবং বক্তৃতার একটা সংক্ষিপ্তসার হিন্দিতে বলতাম।
আমি যখন রাষ্ট্রপতি হলাম তখন হিন্দি ভাষায় আমার জ্ঞান খুব সামান্য ছিল। যদিও আমি উপলব্ধি করতাম হিন্দি ভাষায় প্রারম্ভিক জ্ঞানের সাহায্যে বৃহদাংশ শ্রোতার কাছে অন্ততপক্ষে ভাষণের সৌরভ তো পৌঁছনো সম্ভব।
প্রজাতন্ত্র দিবসের ভাষণের একটা নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু থাকে। সাধারণত এর প্রস্তুতি বেশ কিছুদিন আগে থেকে নেওয়া হয়। প্রথমে আমরা বিষয় নির্বাচন করি তারপর বিভিন্ন বিভাগ থেকে তথ্যসংগ্রহ এবং ওই বিষয়ে আন্তর্জাতিক চিত্রটা বোঝার চেষ্টা করি। আমরা বিশেষজ্ঞদের কাজে এক-একটা প্রশ্নাবলি পাঠিয়ে তারপর তথ্যগুলো একত্রিত করতাম। ভাষণের অসংখ্য খসড়া তৈরি হত, দশটা বা তার বেশি খসড়া কোনও অসম্ভব ঘটনা ছিল না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০০৪ সালের প্রজাতন্ত্র দিবসের বিষয় ছিল-‘একশো কোটি মানুষের মুখে হাসি’-এর প্রায় দশটা খসড়া হয়েছিল। মূল্যবোধ ছিল এর উদ্দেশ্য। ২০০৫-এর ১৪ অগস্টের বিষয়বস্তু ছিল শক্তিক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা। পনেরোটি খসড়ার মধ্যে দিয়ে ভাষণটি তৈরি হয়েছিল। সর্বাধিকসংখ্যক খসড়া তৈরি হয়েছিল ২০০৭ সালের ২৫ এপ্রিল ইউরোপীয় পার্লামেন্টে আমার ভাষণ তৈরি করতে গিয়ে। ৩১টি খসড়ার মধ্য দিয়ে এ ভাষণ তৈরি হয়েছিল।
রাষ্ট্রপতি মেয়াদকালীন আমি দশটা ভাষণ দিয়েছি। প্রতিটি ভাষণের বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেগুলো ছিল স্বপ্নকে লক্ষ্যে রূপান্তর করার বক্তৃতা। আরও অনেক বিষয়বস্তু ছিল যার জন্য আমাদের মনে রাখা উচিত: মানবজীবনে আত্মসম্মানের জন্য শিক্ষা; কর্মনিয়োগ সংঘটনে এক কর্মপ্রক্রিয়া পরিকল্পনা; একশো কোটি দেশবাসী: এক দর্শন; জাতীয় জাগরণ এবং আমি আমার দেশকে কী দিতে পারি। সমস্ত বিষয়গুলি ভারতবর্ষকে এক উন্নত দেশে রূপান্তরিত করার সাধারণ ভাবনা থেকে উদ্ভূত হয়েছে। এই বার্তা দেশের নাগরিক ও পেশাদারদের কাছে ছড়িয়ে গিয়ে নিজেদের ক্ষেত্রে বিতর্ক তুলেছে এবং সক্রিয় করেছে। উদাহরণস্বরূপ বলা চলে, কর্মনিয়োগ সৃষ্টি করতে যখন জাত্রোফা কার্কাস-এর বাগিচাশিল্পের কথা আমি বলেছিলাম, বহুসংখ্যক রাজ্য একে লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছিল। এবং আজকের দিনে লক্ষ লক্ষ হেক্টর জমি এই শিল্পে ব্যবহৃত হয়। উপরন্তু, জাত্রোফা চাষ সম্বন্ধে বিশেষজ্ঞরা আফ্রিকার রাষ্ট্রগুলিতে আমাদের কৃষকদের সহযোগিতায় এই বাগিচাশিল্পের উন্নয়ন ঘটান, যাতে জৈব-জ্বালানি উৎপাদনে তারা এই গাছের ব্যবহার করতে পারে। জাত্রোফা পতিত জমিতে উৎপাদিত হতে পারে। একবার গাছ রোপণ করলে পঞ্চাশ বছর অবধি বাঁচে এবং প্রতি বছর ফল দেয়, যার বীজ থেকে তেল নিঃসৃত হয় এবং ডিজেলের সঙ্গে মেশানো যায়।
