এর পরই সফলভাবে পরীক্ষামূলক উডডয়ন অনুষ্ঠিত হলো পাইলটবিহীন টার্গেট এয়ারক্র্যাফটের (পিটিএ)। ব্যাঙ্গালোর ভিত্তিক অ্যারোনটিক্যাল ডেভলপমেন্ট এস্টাবলিশমেন্ট (এডিই)-এর ডিজাইন করা পিটিএর জন্য রকেট মোটর তৈরি করেছিল আমাদের প্রকৌশলীরা। মোটর টাইপ-অ্যাপ্রুভড় করেছিল ডিটিডিঅ্যান্ডপি (এয়ার)। মিসাইল হার্ডওয়ার উন্নতির দিকে এটা ছিল একটা ক্ষুদ্র কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ যা শুধু ক্রিয়ামূলকই নয় বরং ইউজার এজেন্সিগুলোর কাছেও গ্রহণযোগ্য। একটা বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠান ডিআরডিএলের টেকনোলজি ইনপুট নিয়ে উৎপাদন করছিল নির্ভরযোগ্য উঁচু থ্রাস্ট-টু-ওয়েট রেশিও রকেট মোটর। একক গবেষণাগার প্রকল্প থেকে বহু গবেষণাগার কর্মসুচি আর সেখান থেকে ল্যাবরেটরি ইন্ডাস্ট্রির দিকে আমাদের কর্মপরিধি ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছিল। চারটে আলাদা সংস্থার ওপর বেশ প্রভাব সৃষ্টি করেছিল পিটিএ। আমার মনে হচ্ছিল, আমি যেন দাঁড়িয়ে আছি একটা মিলনকেন্দ্রে আর তাকিয়ে আছি ডিটিডিঅ্যান্ডপি (এয়ার) এবং আইএসআরও থেকে আসা রাস্তাগুলোর দিকে। চতুর্থ রাস্তাটি ছিল ডিআরডিএল, মিসাইল প্রযুক্তিতে জাতির আত্মনির্ভরতার মহাসড়ক।
দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আমাদের অংশীদারিত্ব আরও এক ধাপ বাড়িয়ে জয়েন্ট অ্যাডভান্সড টেকনোলজি প্রোগ্রামস শুরু করা হলো ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব সায়েন্স (আইআইএস) ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আমার সবসময়ই প্রগাঢ় শ্রদ্ধা ছিল। উন্নয়নের ক্ষেত্রে যে ইনপুট দিতে পারেন শিক্ষাবিদরা তাকে আমি মূল্য দিই। এসব প্রতিষ্ঠানে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানান হয়েছিল এবং ডিআরডিএলে তাদের অনুষদগুলো থেকে কোন বিশেষজ্ঞরা আসবেন তা আয়োজন করা হয়েছিল।
বিভিন্ন মিসাইল সিস্টেমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কিছু অবদানের কথা বলা যাক এই অবসরে। পৃথ্বীর ডিজাইন করা হয়েছিল গাইডেড মিসাইল হিসাবে। সঠিকভাবে লক্ষ্যে পৌঁছাতে ট্রাজেক্টরি-প্যারামিটারে সংযুক্ত করা লাগত মস্তিষ্ক অর্থাৎ অন-বোর্ড কম্পিউটার। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে একদল তরুণ প্রকৌশলী গ্রাজুয়েট, অধ্যাপক ঘোষালের তত্ত্বাবধানে, তৈরি করেছিল রোবাস্ট গাইডেন্স অ্যালগোরিদম। আইআইএস-এ স্নাতকোত্তর ছাত্ররা, অধ্যাপক আইজি শর্মার নেতৃত্বে, তৈরি করে দিল আকাশ-এর মাল্টি-টার্গেট অ্যাকুইজিশনের জন্য এয়ার ডিফেন্স সফটওয়ার। অগ্নির জন্য রি-এন্ট্রি ভেহিকল সিস্টেম ডিজাইন মেথডলজি তৈরি করে দিল আইআইটি মাদ্রাজ-এর তরুণদের একটা দল এবং ডিআরডিওর বিজ্ঞানীরা। ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নেভিগেশনাল ইলেকট্রনিক্স রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেইনিং ইউনিট নাগ-এর জন্য তৈরি করেছিল স্টেট-অব-দ্য-আর্ট সিগনাল প্রসেসিং অ্যালগোরিদম। সহযোগীদের সামান্য কয়েকটি উদাহরণ এগুলো। প্রকৃতপক্ষে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সক্রিয় অংশীদারিত্ব ব্যতিরেকে আমাদের পক্ষে অগ্রসর প্রযুক্তিগত লক্ষ্য অর্জন অত্যন্ত কঠিন হতো।
বিবেচনা করা যাক অগ্নি পেলোড় ব্রেকথ্রর উদাহরণটা। অগ্নি হচ্ছে টু-স্টেজ রকেট সিস্টেম। দেশে প্রথমবারের মতো তৈরি রি-এন্ট্রি টেকনোলজি এতে ব্যবহার করা হয়। এসএলভি-৩ থেকে বিক্ষিপ্ত একটা ফাস্ট-স্টেজ সলিড রকেট মোটরের দ্বারা এটা সামনে ঠেলে দেওয়া হয়, তারপর দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও গতি-সঞ্চারিত করা হয় পৃথ্বীর লিকুইড রকেট ইঞ্জিন দিয়ে। অগ্নির ক্ষেত্রে হাইপারসোনিক গতিতে পোলোড খালাস করা হয়। এর জন্য প্রয়োজন হয়েছিল একটা রি-এন্ট্রি ভেহিকল স্ট্রাকচারের ডিজাইন করা আর সেটা উৎপাদন করা। গাইডেন্স ইলেকট্রনিক্স-এ বোঝাই পেলোড স্থাপন করা হয় রি-এন্ট্রি ভেহিকল স্ট্রাকচারে, এর উদ্দেশ্য ভেতরের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রেখে পেলোড রক্ষা করা যখন বাইরের আবরণের তাপমাত্রা ২৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের চেয়েও অনেক বেশি। অন-বোর্ড কম্পিউটারযুক্ত একটা ইনার্শিয়াল গাইডেন্স সিস্টেম কাঙ্খিত লক্ষে গাইড করে নিয়ে যায় পেলোডকে। যে কোনো রি-এন্ট্রি মিসাইল সিস্টেমের ক্ষেত্রে কার্বন-কার্বন মোজ ওই রকম প্রচণ্ড তাপেও শক্তিশালী রাখার জন্য ত্রিমাত্রিক পারফর্ম মূল চাবিকাঠি। ডিআরডিওর চারটে গবেষণাগার ও সিএসআইআর এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছিল মাত্র ১৮ মাসের মধ্যে অন্য দেশগুলো এ সাফল্য অর্জন করেছিল এক দশক গবেষণার পর!
অগ্নি পেলোড ডিজাইনে সংশ্লিষ্ট আরেকটা চ্যালেঞ্জ বিপুল গতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ছিল। বস্তুত, অগ্নি এটমসফেয়ারে পুনঃপ্রবেশ করতে পারত শব্দের গতির বারো বার (বিজ্ঞানে একে আমরা বলি ১২ ম্যাচ)। আমাদের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না যে, এই বিপুল গতিতে ধাবমান ভেহিকলকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে। পরীক্ষা করার জন্য, ওই ধরনের গতি সঞ্চালনের উইন্ড টানেল আমাদের ছিল না। আমরা যদি আমেরিকার সাহায্য চাইতাম, তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াত এমন যে, তাদের এক্সক্লসিভ সুবিধা হাতানোর উচ্চাভিলাষ করছি যেন আমরা। এমনকি তারা যদি সহযোগিতা করতেও চাইত, তাহলেও এ বাবদ এমন এক ভাড়া নির্ধারণ করত যা হতো আমাদের পুরো প্রকল্পের বাজেটের চেয়েও বেশি। এখন প্রশ্ন দাঁড়াল কীভাবে এই সিস্টেম আয়ত্ত করা যায়। আইআইএসের অধ্যাপক এসএম দেশপান্ডে খুঁজে বের করলেন চারজন উজ্জ্বল তরুণ বিজ্ঞানীকে যারা কাজ করছিল ফ্লুইড ডাইনামিক্স-এর ক্ষৈত্রে এবং ছয় মাসের মধ্যে কম্পিউটেশনাল ফ্লুইড ডাইনামিক্স ফর হাইপারসোনিক রেজিস-এর জন্য একটা সফটওয়ার তৈরি করলেন, দুনিয়ায় যার দ্বিতীয়টি ছিল না।
