.
আরেকটা অর্জন ছিল একটা মিসাইল ট্রাজেক্টরি সিমুলেশন সফটওয়ার। অনুকল্পনা নামে এটা তৈরি করেছিলেন আইআইএসের অধ্যাপক আইজি শর্মা। আকাশ গোত্রের উইপন সিস্টেমের মাল্টিটার্গেট অ্যাকুইজিশন সক্ষমতার জন্য। কোনো দেশই এ ধরনের সফটওয়ার আমাদের দিত না, ফলে দেশীয় ভাবেই আমরা এটা তৈরি করি।
বৈজ্ঞানিক প্রতিভার আরেক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন আইআইটি দিল্লির অধ্যাপক ভারতী ভাট। তিনি কাজ করছিলেন সলিড ফিজিক্স ল্যাবরেটরি (এসপিএল) এবং সেন্ট্রাল ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড (সিইএল)-এর সঙ্গে। আকাশএর সার্ভেইলেন্স, ট্র্যাকিং ও গাইডেন্সের জন্য মাল্টি-ফাংশন মাল্টি-টাস্কিং ৩-ডি ফেজড আর্মি রাডারে ব্যবহারের জন্য ফেরিট ফেজ শিফটার তৈরি করে এক্ষেত্রে তিনি পশ্চিমা দেশগুলোর একচেটিয়া অধিকার খর্ব করে দিয়েছিলেন। আরসিআইতে আমার সহকর্মী ছিলেন বিকে মুখোপাধ্যায়, তার সঙ্গে কাজ করছিলেন খড়গপুরে অবস্থিত আইআইটির অধ্যাপক সারাফ। তিনি নাগ-এর সিকার হেডের জন্য একটা মিলিমেট্রিক ওয়েভ (এমএমডব্লিউ) অ্যান্টিনা তৈরি করে দিলেন মাত্র দুই বছরে, এটা ছিল একটা রেকর্ড। সেন্ট্রাল ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস রিসার্চ ইন্সটিটিউট (সিইইআরআই), পিলানি, এসপিএল ও আরসিআই সহযোগে একটা Impatt Diode তৈরি করেছিল বিদেশের ওপর প্রযুক্তিগত নির্ভরশীলতা কাটিয়ে ওঠার জন্য, যা ছিল যে কোনো এমএমডব্লিউ ডিভাইসের প্রাণ।
.
প্রকল্পের কাজ আনুভূমিকভাবে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজের মূল্যনির্ধারণ করাও বেশি বেশি করে সংকটজনক হয়ে উঠছিল। ডিআরডিওর রয়েছে একটা মূল্যনিৰ্ণায়কযুক্ত পলিসি। ৫০০ বিজ্ঞানীকে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে, তাদের কাজের মূল্যায়ন করে অ্যানুয়াল কনফিডেনশিয়াল রিপোর্ট প্রস্তুত করতে হতো আমাকে। এসব রিপোর্ট সুপারিশের জন্য পেশ করা হতো বাইরের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত একটা মূল্য-নিৰ্ণায়ক বোর্ডের কাছে। অনেক লোক আমার কাজের এই অংশটাকে দেখত কঠোর সমালোচনার দৃষ্টিতে। কারো পদোন্নতি না হলে তাকে আমি অপছন্দ করি বলে মনে করা হতো। অন্য সহকর্মীদের পদোন্নতিকে দেখা হতো এভাবে যে, ওই সহকর্মীরা আমার আনুকুল্য পেয়েছে। কাজ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আমি সর্বদা চেষ্টা করেছি ন্যায়বিচারকের ভূমিকা পালন করার।
একজন বিচারককে ঠিকভাবে বুঝতে হলে, আপনাকে অবশ্যই পরিমাপ দন্ডের প্রহেলিকা বুঝতে হবে; একদিকে স্তূপাকার হয়ে উঠেছে আশা, অন্য দিকে আশঙ্কা। পাল্লা যখন এক দিকে ঝুঁকে পড়ে তখন উজ্জ্বল আশাবাদ পরিণত হয় নীরব ত্রাসে।
কোনো ব্যক্তি যখন নিজের দিকে তাকায়, তখন যা সে খুঁজে পায় তার ভুল বিচারই করে অধিকাংশ সময়। নিজের অভিপ্রায়ই সে শুধু দেখতে পায়। অধিকাংশ লোকেরই রয়েছে সদুদ্দেশ্য, সুতরাং তারা মনে করে যে তারা যা করছে তা ভালো। কোনো ব্যক্তির পক্ষে নিজের কাজকর্মকে বস্তুনিষ্ঠভাবে বিচার করা খুব কঠিন, যা হতে পারে, আর প্রায়ই হয়, তার সৎ অভিপ্রায়ের প্রতি বিসদৃশ। অনেকেই তাদের কাজ করে সুবিধাজনক আচরণে আর আত্মতৃপ্তি নিয়ে সন্ধ্যাবেলায় বাড়িতে ফেরে। তারা কাজের মূল্যায়ন করে না, মূল্যায়ন করে শুধু তাদের অভিপ্রায়ের। এটা মনে করা হয় যে, যেহেতু কোনো ব্যক্তি যথাসময়ে তার কাজ শেষ করার উদ্দেশ্য নিয়েই কাজ করেছে, সুতরাং বিলম্ব যদি ঘটে তবে তা এমন কারণে ঘটেছে যা তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বিলম্ব সৃষ্টির উদ্দেশ্য তার ছিল না। কিন্তু তার ক্রিয়া বা নিষ্ক্রিয়তা যদি ওই বিলম্বের কারণ হয়, তাহলে কি উদ্দেশ্যমূলক নয়?
পেছনের দিকে ফিরে তাকালে, যখন আমি ছিলাম একজন তরুণ বিজ্ঞানী, তখন আমি যা ছিলাম তার চেয়ে আরও বেশি কিছু হতে চাইতাম। আমার আকাঙ্ক্ষা ছিল বেশি অনুভব করা, বেশি শেখা, বেশি প্রকাশ করা। আমার আকাঙ্ক্ষা ছিল বড়ো হয়ে ওঠা, উন্নতি করা, বিশুদ্ধ হওয়া, সম্প্রসারিত হওয়া। আমার ক্যারিয়ার এগিয়ে নিতে আমি কখনও বাইরের প্রভাব ব্যবহার করিনি। নিজের ভেতরেই নিজের সামর্থ্য খুঁজে পাবার বাসনা ছিল আমার। আমার গতিময়তার চাবিকাঠি হলো, কতদূর এসেছি তার চেয়ে কত দূর আরও আমাকে যেতে হবে তা মাথায় রাখা। সর্বোপরি, অমীমাংসিত সমস্যা, উচ্চাভিলাষী বিজয় ও অনিয়তাকার পরাজয়ের একটা মিশ্রণ ছাড়া জীবন আর কি?
সমস্যা হলো আমরা প্রায়শ জীবনের সঙ্গে কারবার করার বদলে জীবনকে বিশ্লেষণ করতে বসি। লোকেরা ব্যর্থতার জন্য নানারকম অজুহাত তৈরি করে, কিন্তু সেগুলো মোকাবেলা করে না আর সেগুলো জয় করার জন্য অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে না-যাতে করে পরবর্তী সময়ে এসব পরিহার করা যায়। আমার বিশ্বাসটা হলো এমন: সমস্যা সংকটের ভেতর ফেলে দিয়ে খোদা আমাদের সুযোগ দেন বড়ো হয়ে ওঠার। সুতরাং আপনার আশা, স্বপ্ন ও লক্ষ্য যখন ধ্বংস হয়ে যাবে তখন ধ্বংসাবশেষের মধ্যেই খুঁজে দেখুন, হয়তো একটা সুবর্ণ সুযোগ খুঁজে পাবেন ওরই ভেতর।
লোকজনকে তাদের কাজের ভেতর নিমগ্ন করে দেওয়া আর বিষণ্ণতার মোকাবেলা করা একজন নেতার জন্য সবসময়ই একটা চ্যালেঞ্জ। আমি শক্তির ভারসাম্য আর পরিবর্তনে প্রতিরোধের মধ্যে সাদৃশ্য লক্ষ্য করেছি প্রতিষ্ঠানের ভেতর। একটা বিরোধী শক্তির ক্ষেত্রে পাচালো স্প্রিং হিসাবে পরিণত হওয়ার কথা কল্পনা করা যাক, এমন যে কিছু শক্তি পরিবর্তন সমর্থন করে আর অন্যরা প্রতিরোধ করে। সমর্থনকারী শক্তিকে বাড়িয়ে অথবা প্রতিরোধী শক্তিকে কমিয়ে পরিস্থিতিকে চালিত করা যেতে পারে কাঙ্খিত ফলাফলের দিকে কিন্তু অল্প সময়ের জন্য মাত্র, আর সেটাও একটা নির্দিষ্ট পরিসর পর্যন্ত। কিছু সময় অতিবাহিত হলে অনেক বেশি শক্তি নিয়ে প্রতিরোধী শক্তি ঠেলা দিতে শুরু করবে, যত জোরেই সেটা চেপে রাখা হোক না কেন। সুতরাং চাপ না দিয়ে প্রতিরোধ শক্তিকে এমনভাবে কমাতে হবে যাতে করে সমর্থনকারী শক্তি নিজেই বৃদ্ধি পাবে। এই উপায়ে পরিবর্তন আনতে ও রক্ষা করতে কম শক্তির প্রয়োজন হবে।
