১৯৮৫ সালের গ্রীষ্মে, ইমারত কাঞ্চায় মিসাইল টেকনোলজি রিসার্চ সেন্টার তৈরির সমস্ত গ্রাউন্ডওয়ার্ক সম্পূর্ণ হয়ে গেল। প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ১৯৮৫ সালের ৩ অগাস্ট রিসার্চ সেন্টার ইমারত (আরসিআই)-এর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করলেন। অগ্রগতিতে তাকে খুব সন্তুষ্ট মনে হলো। তার মধ্যে ছিল শিশুসুলভ কৌতূহল। এক বছর আগে এখানে পরিদর্শনের সময় তার মায়ের যে স্থিরচিত্ততা ছিল, তার মধ্যেও তা দেখা গেল। তবে পার্থক্য ছিল এক জায়গায়। ম্যাডাম গান্ধী ছিলেন একজন টাস্কমাস্টার, অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী লক্ষ্য অর্জনের জন্য ব্যবহার করতেন তার ক্যারিসমা। তিনি ডিআরডিএল পরিবারকে বললেন যে, ভারতীয় বিজ্ঞানীদের যে কঠোর অবস্থা মোকাবেলা করতে হচ্ছে তা তিনি উপলব্ধি করছেন। বিদেশে আরামদায়ক চাকরির সুযোগ না নিয়ে যারা মাতৃভূমির জন্য কাজ করছেন তাদের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। তিনি বললেন যে, দৈনন্দিন জীবনের দুঃশ্চিন্তাগুলো থেকে মুক্তি না পেলে কারো পক্ষে এ ধরনের কাজ গভীর মনোযোগের সঙ্গে করা সম্ভব নয়। তিনি আমাদের আশ্বাস দিলেন, বিজ্ঞানীদের জীবনযাত্রা স্বস্তিদায়ক করার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু করা হবে।
তার সফরের এক সপ্তাহের ভেতর, মার্কিন বিমান বাহিনীর আমন্ত্রণে ডু. অরুণাচলমের সঙ্গে আমি যুক্তরাষ্ট্রে গেলাম। ন্যাশনাল অ্যারোনটিক্যাল ল্যাবরেটরির রোডম নরসিমহা ও এইচএএলের কেকে গণপতি আমাদের সঙ্গে ছিলেন। ওয়াশিংটনের পেন্টাগনে আমাদের কাজ শেষ করার পর, নরগ্রপ করপোরেশন পরিদর্শনে লস এঞ্জেলেসে যাবার পথে আমরা সান ফ্রান্সিসকোতে অবতরণ করলাম। আমি এই সুযোগে আমার প্রিয় লেখক রবার্ট শুলার কর্তৃক নির্মিত ক্রিস্টাল ক্যাথেড্রাল দেখে নিলাম। আমি অবাক হয়ে গেলাম পুরোপুরি কাঁচের, চার পয়েন্টের, তারকা আকৃতির স্থাপত্যের এই অদ্ভুত সৌন্দর্য দেখে। একটা পয়েন্ট থেকে অন্য পয়েন্টের দূরত্ব ৪০০ ফিটেরও বেশি। একটা ফুটবল মাঠের মতো ১০০ ফিট লম্বা কাঁচের ছাদ মনে হলো যেন শূন্যে ভাসছে। এই ক্যাথেড্রাল নির্মিত হয়েছে শুলারের চেষ্টায় দাতাদের দেওয়া কয়েক মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে। খোদা সেই ব্যক্তির মাধ্যমে বিপুল কাজ করতে পারেন যে ব্যক্তি কৃতিত্বের ধার ধারে না। অহংকার অবশ্যই ত্যাগ করতে হবে। শুলার লেখেন, সাফল্য দিয়ে খোদা তোমাকে বিশ্বাস করার আগে, বড়ো পুরস্কার পাওয়ার মতো যথেষ্ট নিরহংকার প্রমাণ করতে হবে তোমার নিজেকে। শুলারের গির্জায় আমি খোদার কাছে প্রার্থনা করলাম, তিনি যেন আমাকে সাহায্য করেন ইমারত কাঞ্চায় একটা রিসার্চ সেন্টার স্থাপন করতে সেটাই হবে আমার ক্রিস্টাল ক্যাথেড্রাল।
.
১৩.
তরুণ প্রকৌশলীরা ডিআরডিএলের গতি বদলে দিল। আমাদের সবার জন্য এটা ছিল মূল্যবান অভিজ্ঞতা। এই তরুণ দলের মাধ্যমে এখন আমরা এমন অবস্থায় পৌঁছেছিলাম যাতে তৈরি করা সম্ভব রি-এন্ট্রি টেকনোলজি ও স্ট্রাকচার, একটা মিলিমেট্রিক ওয়েভ রাডার, একটা ফেজড অ্যারে রাডার, রকেট সিস্টেম আর এ ধরনের অন্যান্য ইকুইপমেন্ট। প্রথম যখন তরুণ বিজ্ঞানীদের এসব কাজের দায়িত্ব আমরা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম, তারা তখন কিন্তু তাদের কাজের গুরুত্ব পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি। যখন বুঝতে পারল তখন তাদের ওপর স্থাপিত বিশাল আস্থার ভারে তারা অস্বস্তি বোধ করল। আমার এখনও মনে আছে এক তরুণ আমাকে বলছে, আমাদের দলে নামজাদা কেউ নেই, আমরা একটা ব্রেক থ্র দিতে সমর্থ হবো কীভাবে? আমি তাকে বললাম, নামজাদা লোক হচ্ছে ক্ষুদ্র লোক যে কিনা শুধু বন্দুক চালাতে থাকে, সুতরাং চেষ্টা কর। তরুণ বৈজ্ঞানিকদের পরিবর্তিত হয় আর আগে মনে হওয়া অবাস্তব কাজ কীভাবে বাস্তব হয় তা লক্ষ্য করা সত্যিই চমকপ্রদ ছিল। তরুণদের দলের অংশ হয়ে অনেক বৃদ্ধ বিজ্ঞানী পুনঃযৌবন লাভ করেছিলেন।
আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হয়েছে যে, আসল সৌরভ, খাঁটি কৌতুক, কাজের অবিরাম উদ্দীপনা ইত্যাদি বিরাজ করে কাজ করার মধ্যেই। চারটে মূল ফ্যাক্টরে আমি প্রভাবিত ছিলাম, আর সাফল্যজনক ফলাফলের সঙ্গেও সেগুলো জড়িত ও লক্ষ্য স্থির করা, ইতিবাচক চিন্তা; দৃশ্যায়ন এবং বিশ্বাস।
এই পর্যায়ে আমরা লক্ষ্য স্থির করা বিষয়ক সবকিছুই সম্পন্ন করেছিলাম এবং এসব লক্ষ্য সম্পর্কে তরুণ বিজ্ঞানীদের মধ্যে উদ্যম জাগিয়ে তুলেছিলাম। আমি চাইতাম রিভিউ মিটিঙে তরুণ বিজ্ঞানীরা তাদের দলের কাজ তুলে ধরুক। সময় সিস্টেমের দৃশ্য কল্পনা করতে তাতে তাদের সাহায্য হতো। ক্রমেই আত্মবিশ্বাসের পরিবেশ সৃষ্টি হলো। তরুণ বিজ্ঞানীরা নিরেট টেকনিক্যাল বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করতে লাগল সিনিয়র সহকর্মীদের। সন্দেহ দেখা দিলে তা প্রমাণ করতে লাগল। তারা শীঘই ক্ষমতাধর ব্যক্তিতে পরিণত হলো। আমি চেষ্টা করলাম, বৃদ্ধ বিজ্ঞানীদের অভিজ্ঞতা আর তরুণ বিজ্ঞানীদের দক্ষতার মিশ্রণে কাজের একটা জীবন্ত পরিবেশ বজায় থাকুক। তরুণ ও অভিজ্ঞদের মধ্যে এই নির্ভরশীলতা ডিআরডিএলে অত্যন্ত উৎপাদনশীল কর্ম সংস্কৃতি সৃষ্টি করেছিল।
.
মিসাইল প্রোগ্রামের প্রথম পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলো ১৯৮৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর, শ্রীহরিকোটার টেস্ট রেঞ্জ থেকে এ দিন ছোঁড়া হলো ত্রিশূল। সলিড প্রোপেল্যান্ট রকেট মোটরের ইন-ফ্লাইট পারফরমেন্স পরীক্ষার জন্য এটা ছিল একটা ব্যালিস্টিক ফ্লাইট। ভূমি থেকে মিসাইল ট্র্যাক করতে ব্যবহৃত হয়েছিল দুটো সিব্যান্ড রাডার এবং ক্যালিডিও-থিওডোলাইট (কেটিএল)। পরীক্ষা সফল হলো। লঞ্চার, রকেট মোটর ও টেলিমেট্রি সিস্টেম কাজ করল পরিকল্পনা অনুযায়ী। তবে উইন্ড টানেল টেস্টিং-এর ভিত্তিতে অনুমিত হিসাবের তুলনায় অ্যারোডাইনামিক ড্রাগ অনেক বেশি হলো। টেকনোলজির ব্রেকথ্র বা অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধির দিক থেকে এই টেস্টের মূল্য বেশি ছিল না, কিন্তু এই টেস্টের আসল অর্জনটা হলো এই যে আমার ডিআরডিএল এর সহকর্মীদের মনে করিয়ে দেওয়া, রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মতো কঠিন চাহিদা পূরণ না করেও তারা মিসাইল উৎক্ষেপণ করতে পারে।
