রিভিউ বোর্ডে ছিলেন পুরনো পরিচিত ব্যক্তি টিএন সেশন। খুবই আনন্দের বিষয় ছিল সেটা। এসএলভি-৩ ও এখনকার এই সময়ে আমাদের মধ্যে গড়ে উঠেছিল একটা হৃদ্যতা! এবার প্রতিরক্ষা সচিব হিসাবে সেশন খোঁজখবর নিলেন শিডিউল ও আর্থিক প্রস্তাবনার টিকে থাকার নানা প্রসঙ্গে। এসব ছিল আরও নির্দিষ্ট। সেশন ছিলেন হাস্যরসিক মানুষ। তার বিরোধীদেরও তিনি হাস্যরস দিয়ে কোণঠাশা করে ফেলতেন। তবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে তিনি ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু আর সুবিবেচক। আমার দল ভীষণ আনন্দিত হয়েছিল বিশেষ করে তার আইজিএমডিপিতে নিয়োজিত অগ্রবর্তী প্রযুক্তি বিষয়ে নানা প্রশ্নের জবাব দিতে। কার্বন-কার্বন কম্পোজিটের দেশীয় উৎপাদন সম্পর্কে তার নির্ভেজাল কৌতূহলের কথা আমার আজও মনে পড়ে। আর আপনাদেরকে একটা গোপন কথা বলি-সেশন হলেন এ দুনিয়ার একমাত্র ব্যক্তি যিনি ৩১টি অক্ষর ও পাঁচটি শব্দে গঠিত আমার পুরো নাম ধরে আমাকে সম্বোধন করতেন-আবুল পাকির জয়নুলাবদিন আবদুল কালাম।
মিসাইল প্রোগ্রাম এগিয়ে চলছিল এবং ডিজাইন, উন্নয়ন ও উৎপাদনে তাতে শরিক হয়েছিল ১২টি অ্যাকাডেমিক ইন্সটিটিউট ও ডিআরডিওর ৩০টি গবেষণাগার, কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ (সিএসআইআর), আইএসআরও এবং শিল্প প্রতিষ্ঠান। বস্তুত, ৫০ জনেরও বেশি অধ্যাপক ও ১০০ জন গবেষক পন্ডিত নিজ নিজ ইন্সটিটিউটের গবেষণাগারে মিসাইল সম্পর্কিত সমস্যা নিয়ে কাজ করছিলেন। সেই এক বছরে অংশীদারিত্বের ভেতর দিয়ে অর্জিত কাজের উন্নত মান আমাকে এই আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল যে, দেশে যে কোনো উন্নয়ন কর্মকান্ড গ্রহণ করা যেতে পারে। এই সমীক্ষার চার মাস আগে, আমার মনে হয়। ১৯৮৪ সালের এপ্রিল-জুন মাসে, মিসাইল কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আমরা ছয়জন শিক্ষাঙ্গনগুলো পরিদর্শন করে প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ গ্রাজুয়েটদের তালিকা তৈরি করেছিলাম। আমরা অধ্যাপক ও উৎসাহী ছাত্রদের সামনে মিসাইল প্রোগ্রামের রূপরেখা তুলে ধরেছিলাম, প্রায় ৩৫০ জন ছাত্রের সামনে, এবং অংশগ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছিলাম। সমীক্ষকদের আমি অবগত করলাম যে, প্রায় ৩০০ তরুণ প্রকৌশলী আমাদের গবেষণাগারগুলোয় যোগ দেবে বলে আমরা আশা করছি।
ন্যাশনাল অ্যারোনটিক্যাল ল্যাবরেটরির তৎকালীন পরিচালক নোম নরসিমহা এই সমীক্ষার ব্যাপারটাকে প্রযুক্তির দৃঢ় এক প্রকাশ হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন। তিনি সবুজ বিপ্লবের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন, তাতে প্রমাণিত হয়েছিল লক্ষ্য পরিষ্কার থাকলে বড়ো বড়ো প্রাযুক্তিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দেশের অনেক প্রতিভাবান ব্যক্তিকে সহজেই পাওয়া যায়।
অর্ঘ্য ভারত যখন শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে তার প্রথম পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটাল, তখন পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানোর ক্ষমতাসম্পন্ন পৃথিবীর ষষ্ঠ রাষ্ট্রে পরিণত হলো সে। যখন আমরা এসএলভি-৩ উৎক্ষেপণ করেছিলাম, তখন আমরা ছিলাম স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের সামর্থ্য অর্জনকারী পঞ্চম দেশ। কোনো প্রযুক্তিগত কৃতিত্ব অর্জনকারী প্রথম বা দ্বিতীয় দেশ হব কখন আমরা?
আমি মনোযোগের সঙ্গে সমীক্ষায় সংশ্লিষ্ট প্রতিটি সদস্যের কথা, মতামত ও সন্দেহ শুনলাম, আর শিক্ষা নিলাম তাদের যৌথ জ্ঞান ভান্ডার থেকে। সত্যিই এ ছিল আমার জন্য বিশাল এক শিক্ষা। আসলে বিদ্যালয়ে আমরা পড়তে, লিখতে, বলতে শিখি, কিন্তু শুনি না কখনও, আর পরিস্থিতি পরেও একই রকম থেকে যায়। ঐতিহ্যগতভাবেই ভারতীয় বিজ্ঞানীরা খুব ভালো বক্তা, কিন্তু শোনার মতো পর্যাপ্ত দক্ষতা তাদের নেই। মনোযোগী শ্রোতা হবার জন্য আমরা সংকল্প নিয়েছিলাম।
.
পূর্ববর্তী মাসের সমীক্ষা থেকে তৈরি করা অ্যাকশন প্ল্যান নিয়ে আমরা কাজ করছিলাম। এমন সময় শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর নিহত হবার খবর ছড়িয়ে পড়ল। এর পরপরই এল সহিংসতা ও দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ার খবর। হায়দারাবাদ নগরীতে সান্ধ্য আইন জারি করা হয়েছিল। আমরা পিইআরটি চার্ট গুটিয়ে রেখে একটা সিটি ম্যাপ মেলে ধরলাম টেবিলের ওপর। আমাদের সকল কর্মীকে কোন রাস্তা দিয়ে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া যাবে তা বের করার জন্য। এক ঘন্টারও কম সময়ের মধ্যে গবেষণাগার পরিণত হলো জনমানবহীন ফাঁকা স্থানে। আমি একা বসে থাকলাম আমার অফিসে। শ্রীমতি গান্ধীর মৃত্যুতে পারিপার্শ্বিক অবস্থা অত্যন্ত অশুভ লক্ষণযুক্ত হয়ে পড়েছিল। মাত্র তিন মাস আগে এখানে তার পরিদর্শনের কথা মনে পড়তেই আমার যন্ত্রণা আরও গম্ভীর হলো। মহান মানুষদের শেষ পরিণতি অমন ভয়ংকর হবে কেন? আমি স্মরণ করলাম কাউকে আমার বাবা বলেছিলেন, সাদা আর কালো সুতো যেমন এক সঙ্গে বুনন হয়ে থাকে কাপড়ে, তেমনি সূর্যের নিচে ভালো ও খারাপ মানুষ এক সঙ্গেই বসবাস করে। কালো বা শাদা সুতোর কোনো একটিও যদি ছিঁড়ে যায়, তাঁতী তাহলে খুঁজে দেখবে পুরো বস্ত্রটা, আর সে ততও পরীক্ষা করবে। গবেষণাগার থেকে বেরিয়ে রাস্তায় একটা প্রাণীকেও আমি দেখতে পেলাম না। আমি ছেঁড়া সুতোর তত নিয়েই চিন্তা করতে থাকলাম।
বিজ্ঞান মহলে শ্রীমতি গান্ধীর মৃত্যু ছিল বিশাল ক্ষতি। দেশে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় তিনি শক্তি জুগিয়েছিলেন। শ্রীমতি গান্ধীর হত্যার আঘাত কাটিয়ে ওঠা গেল ক্রমে ক্রমে, যদিও এর জন্য বলি হলো কয়েক হাজার জীবন আর সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষতি হলো। তার পুত্র, রাজীব গান্ধী, ভারতের নতুন প্রধানমন্ত্রী হলেন। তিনি নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের কাছ থেকে ম্যান্ডেট পেলেন মিসেস গান্ধীর পলিসি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। ইন্টিগ্রেটেড গাইডেড মিসাইল ডেভলপমেন্ট প্রোগ্রাম ছিল সেগুলোর একটা অংশ।
