ডিআরডিএলে নবজনের এই সময়টায় পি ব্যানার্জি, কেভি রামানা সাই ও তাদের দল একটা অ্যাটিচিউড কন্ট্রোল সিস্টেম ও একটা অন-বোর্ড কম্পিউটার প্রায় প্রস্তুত করে ফেলেছিলেন। এই উদ্যোগের সাফল্য যে কোনো দেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণ কর্মসূচির জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্য কথায়, আমাদের একটা মিসাইল দরকার এই গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেম পরীক্ষা করার জন্য।
মস্তিষ্কে ঝড় তোলা অনেকগুলো সেশনের পর, আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম এই সিস্টেম পরীক্ষার জন্য একটা ডেভিল ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা হবে উপস্থিতমত প্রাপ্ত উপাদান দিয়ে। একটা ডেভিল মিসাইলের বিভিন্ন অংশ আলাদা করা হলো, নানা প্রকার পরিবর্তন করা হলো তাতে, সম্প্রসারিত সাবসিস্টেম টেস্টিং সম্পন্ন করা হলো এবং মিসাইল চেকআউট সিস্টেম নতুন করে গঠন করা হলো। অস্থায়ী ব্যবস্থারূপে একটা লঞ্চার স্থাপন করে পরিবর্তিত ও সম্প্রসারিত রেঞ্জের ডেভিল ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হলো ১৯৮৪ সালের ২৬ জুন, উদ্দেশ্য ছিল প্রথম দেশীয় স্ট্র্যাপ-ডাউন ইনার্শিয়াল গাইডেন্স সিস্টেম পরীক্ষা করা। সমস্ত চাহিদা পূরণ করল গাইডেন্স। ভারতের মিসাইল উন্নয়নের ইতিহাসে এটা ছিল প্রথম ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক পদক্ষেপ। বহুদিন ধরে অস্বীকার করে আসা একটা সুযোগ অবশেষে যথাযথ কাজে লাগাতে পারলেন ডিআরডিএলের মিসাইল বিজ্ঞানীরা! বার্তাটা ছিল স্পষ্ট ও পরিষ্কার। আমরা এটা করতে পেরেছি।
দিল্লিতে এ বার্তা পৌঁছাতে বেশি সময় লাগল না। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী আইজিএমডিপির অগ্রগতিকে প্রশংসা করলেন। পুরো প্রতিষ্ঠান উত্তেজনায় ভরে গিয়েছিল। ১৯৮৪ সালের ১৯ জুলাই শ্রীমতি গান্ধী ডিআরডিএল পরিদর্শন করতে এলেন।
.
প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন বিপুল গর্ববোধসম্পন্ন একজন মানুষ নিজের সম্পর্কে, নিজের কাজের ব্যাপারে ও তার দেশকে নিয়ে। তাকে আমি ডিআরডিএলে অভ্যর্থনা জানানোর বিষয়টিকে একটা সম্মান হিসাবে গ্রহণ করেছিলাম, যেহেতু আমার এক ধরনের নম্র মানসিকতার মধ্যেও তিনি নিজের কিছু গর্ব সঞ্চারিত করেছিলেন। তিনি খুব সচেতন ছিলেন যে, আশি কোটি মানুষের নেতা তিনি। তার হাতের প্রতিটা নড়াচড়া, প্রতিটা ইঙ্গিত, প্রতিটা পদক্ষেপ ছিল আশাবাদিতার চিহ্ন। গাইডেড মিসাইলের ক্ষেত্রে আমাদের কাজের যে উচ্চমূল্য তিনি দিতেন, তাতে করে আমার নৈতিক শক্তি আরও জোরদার হয়েছিল।
যে এক ঘন্টা তিনি ছিলেন ডিআরডিএলে, সেই এক ঘন্টায় তিনি আইজিএমডিপির সবকিছু খুঁটিয়ে দেখলেন, ফ্লাইট সিস্টেম পরিকল্পনা থেকে বহুমুখী উন্নয়ন গবেষণাগার পর্যন্ত। পরিশেষে তিনি বক্তৃতা দিলেন। আমরা যেটা নিয়ে কাজ করছিলাম সেই ফ্লাইট সিস্টেমের শিডিউল চাইলেন তিনি। আপনারা পৃথ্বীর ফ্লাইট টেস্ট করবেন কবে? শ্রীমতি গান্ধী জানতে চাইলেন। আমি বললাম, ১৯৮৭ সালের জুনে। তিনি দ্রুত বলে উঠলেন, ফ্লাইট শিডিউল এগিয়ে আনতে কী দরকার আমাকে বলুন। তিনি বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত ফলাফল দ্রুত পেতে চেয়েছিলেন। আপনাদের কাজের দ্রুতগতি হচ্ছে সমগ্র জাতির আশা, তিনি বললেন। তিনি আমাকে আরও বললেন যে, আইজিএমডিপির বৈশিষ্ট্য শুধু শিডিউলের ওপরই নয়, উৎকর্ষতা অনুসরণেও। আপনি যা অর্জন করলেন তা বিষয় নয়, আপনার কখনই পুরোপুরি আত্মতৃপ্ত হওয়া উচিৎ হবে না, বরং আরও উন্নতির পথ অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। তিনি যোগ করলেন। এক মাসের মধ্যে নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী এসবি চ্যাবনকে প্রকল্প পরিদর্শনে পাঠিয়ে তিনি তার সমর্থন ও আগ্রহ প্রকাশ করলেন। শ্রীমতি গান্ধীর মনোভাব শুধু যে প্রভাবদায়ক ছিল তাই নয়, বরং ফলপ্রসুও ছিল। আমাদের দেশে আজকের দিনে অ্যারোস্পেস গবেষণায় জড়িতরা জানে যে, আইজিএমডিপি আর উৎকর্ষতা সমার্থক।
আমাদের নিজেদের ম্যানেজমেন্ট টেকনিক আমরা আয়ত্ত করেছিলাম, এবং তা ছিল কার্যকর। এমন একটি টেকনিক ছিল প্রকল্প তৎপরতার ফলো-আপ। সম্ভাব্য সমাধানের প্রাযুক্তিক ও নিয়মানুগ প্রয়োগযোগ্যতার ভিত্তিতে এটা গঠিত হয়েছিল। আর সরব সমর্থনের পর একে কাজে লাগান হতো। অংশগ্রহণকারী কর্ম কেন্দ্রগুলোর তৃণমূল থেকে বিপুল পরিমাণ আইডিয়া এর ফলে পাওয়া গিয়েছিল। এই সফল কর্মসূচির যে কোনো একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাপনাগত কৌশল সম্পর্কে আপনি যদি আমাকে বলতে বলেন, তাহলে আমি এই ফলো-আপের কথাই বলব। বিভিন্ন গবেষণাগারে কৃত ডিজাইন, প্ল্যানিং ইত্যাদির ফলোআপের ভেতর দিয়ে, এবং ইন্সপেকশন এজেন্সি ও অ্যাকাডেমিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাহায্যে দ্রুত অগ্রগতি অর্জিত হয়েছিল। বস্তুত গাইডেড মিসাইল প্রোগ্রাম অফিসে কাজের ধারা ছিল? কোনো ওয়ার্ক সেন্টারে আপনার যদি একটা চিঠি পাঠাতে হয়, তাহলে ফ্যাক্স করুন; যদি আপনার টেলেক্স বা ফ্যাক্স পাঠাতে হয়, তাহলে ফোন করুন; আর যদি টেলিফোনে আলাপ করার প্রয়োজন হয়, তাহলে সরাসরি সেখানে গিয়ে কথা বলুন।
এই দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষমতা আলোয় এল যখন ড. অরুণাচলম আইজিএমডিপির একটা স্টাটাস সমীক্ষা চালালেন ১৯৮৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর। ডিআরডিও গবেষণাগারগুলোর বিশেষজ্ঞরা, আইএসআরও, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও উৎপাদন সংস্থাগুলো একত্রিত হলো সাধিত অগ্রগতি খতিয়ে দেখার জন্য আর বাস্তবায়নের প্রথম বছরে যেসব সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছিল সেগুলো জানতে। বড়ো সিদ্ধান্তগুলো যেমন ইমারত কাঞ্চায় স্থাপনা নির্মাণ ও পরীক্ষাস্থল প্রতিষ্ঠা এই সমীক্ষায় দানা বেঁধেছিল। জায়গাটির মূল নামটিকে মর্যাদা দিয়ে ইমারত কাঞ্চায় ভবিষ্যতের অবকাঠামোর নাম দেওয়া হয়েছিল রিসার্চ সেন্টার ইমারত (আরসিআই)।
