স্পর্শকাতরতা রক্ষার জন্য একজনকে প্রয়োজন হয়েছিল। এর দায়িত্ব দিলাম কৃষ্ণ মোহনকে। কাজকর্মে হুকুম তামিল করার চেয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ গ্রহণের উদ্দীপনা জাগাতে পারবে সে লোকজনের মধ্যে। প্রতিষ্ঠিত নিয়ম অনুযায়ী, আমরা আরসিআই নির্মাণ কাজের জন্য মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসেস (এমইএস) কে ডাকলাম। তারা বলল এ কাজ সম্পূর্ণ করতে পাঁচ বছর সময় লাগবে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ে এ বিষয়ে আলোচনা হলো এবং সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো বাইরের নির্মাণ কোম্পানিকে এই দায়িত্ব দেওয়া হবে। আমরা সার্ভে অব ইন্ডিয়া ও ন্যাশনাল রিমোট সেন্সিং এজেন্সির মধ্যে লিয়াজোঁ রক্ষা করলাম কন্ট্রর ম্যাপ তদন্ত এবং ইমারত কাঞ্চার আকাশ থেকে তোলা আলোকচিত্রের জন্য। এর উদ্দেশ্য ছিল স্থাপনার লোকেশন ও রাস্তার লেআউট প্রস্তুত করা। সেন্ট্রাল গ্রাউন্ড ওয়াটার বোর্ড পানি উত্তোলনের জন্য পাথরগুলোর মধ্যে কুড়িটা লোকেশন শনাক্ত করল। ৪০ এমভিএ পাওয়ার চালু ও প্রতিদিন ৫০ লাখ লিটার পানি উত্তোলনের অবকাঠাম নির্মাণের পরিকল্পনা স্থির করা হলো।
এই সময়েই কর্ণেল এসকে সালওয়ান আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন, অসীম শক্তির অধিকারী একজন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। নির্মাণ কাজের শেষ পর্যায়ে, বোল্ডারের মধ্যে প্রাচীন এক উপাসনাস্থল আবিষ্কার করলেন সালওয়ান। আমার মনে হয়েছিল এই স্থানটি ঈশ্বরের আশীর্বাদপুষ্ট। এখন আমরা মিসাইল সিস্টেম ডিজাইনের কাজ শুরু করেছিলাম এবং অগ্রগতি হচ্ছিল দ্রুত। পরবর্তী পদক্ষেপ ছিল মিসাইল ফ্লাইট পরীক্ষার জন্য একটা উপযুক্ত স্থান খুঁজে বের করা। অন্যদিকে এসএইচএআর অন্ধ্রপ্রদেশে স্থান অনুসন্ধানের কাজ করছিল। এ কাজ ছড়িয়ে পড়েছিল পূর্বাঞ্চলীয় উপকূল রেখা বরাবর। শেষ পর্যন্ত এর সমাপ্তি ঘটল উড়িষ্যার বালাসোরে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় উপকূল বরাবর একটা স্থান শনাক্ত করা হলো ন্যাশনাল টেস্ট রেঞ্জের জন্য। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ওই অঞ্চলে বসবাসকারী লোকদের স্থানান্তরকে ঘিরে সৃষ্টি হওয়া রাজনৈতিক বিতর্কের কর্কশ আবহাওয়ার ভেতর গিয়ে পড়ল গোটা প্রকল্প। অতঃপর আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, উড়িষ্যার বালাসোর জেলার চন্ডিপুরে অবস্থিত প্রুফ এক্সপেরিমেন্টাল এস্টাবলিশমেন্ট (পিএক্সই) সংলগ্ন স্থানে একটা মধ্যবর্তী অবকাঠাম নির্মাণ করা হবে। এই রেঞ্জ গঠনের জন্য ৩০ কোটি রুপি তহবিল গঠন করা হলো। এর নাম দেওয়া হলো ইন্টারিম টেস্ট রেঞ্জ (আইটিআর)। ইলেক্ট্র অপটিক্যাল ট্র্যাকিং ইস্ট্রমেন্ট, একটা ট্র্যাকিং টেলিস্কোপ সিস্টেম এবং একটা ইট্রুমেন্টেশন ট্র্যাকিং রাডার ইত্যাদির জন্য ড, এইচএস রামা রাও ও তার দল অভূতপূর্ব কাজ করেছিলেন। লেফটেন্যান্ট জেনারেল আরএস দেশওয়াল এবং মেজর জেনারেল কেএন সিং রেঞ্জ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও লঞ্চ প্যাড তৈরির দায়িত্ব নিয়েছিলেন। চন্ডিপুর ছিল পাখিদের অপূর্ব এক অভয়ারণ্য। তাদের বিরক্ত না করে টেস্ট রেঞ্জ ডিজাইন করতে বললাম আমি প্রকৌশলীদের।
.
আরসিআই সৃষ্টি ছিল খুব সম্ভবত আমার জীবনের সবচেয়ে তৃপ্তিদায়ক অভিজ্ঞতা। অভূতপূর্ব মিসাইল প্রযুক্তির এই কেন্দ্র নির্মাণ ছিল কাদা থেকে মৃৎশিল্পীর তৈরি মৃৎপাত্রের মতোই একটা ব্যাপার।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আর ভেঙ্কটরমন ১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বরে ডিআরডিএল পরিদর্শনে এলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল আইজিএমডিপির তৎপরতায় তার নিজের মূল্যাবধারণ করা। তিনি আমাদের পরামর্শ দিলেন, আমাদের লক্ষ্য পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুর তালিকা করতে, কোনো কিছুই যেন বাদ না পড়ে, এবং তাতে যেন আমাদের নিজেদের ইতিবাচক ভাবনা ও বিশ্বাস থাকে। আপনি তাই কল্পনা করবেন যা আপনি বাস্তব করবেন, আপনি তাই বিশ্বাস করবেন যা আপনি অর্জন করবেন, তিনি বললেন। ড. অরুণাচলম ও আমি দেখতে পেলাম, আইজিএমডিপির সামনে সম্ভাবনার এক অনন্ত দিগন্ত প্রসারিত হচ্ছে। দেশের সেরা প্রফেশনালরা আইজিএমডিপির প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে দেখে আমরা উদ্দীপিত ও উৎসাহিত হয়েছিলাম। বিজয়ীর সঙ্গে সহযোগিতা করতে কে না চায়? বিশ্ব বুঝতে পেরেছিল আইজিএমডিপি জন্ম-বিজয়ী।
.
১২.
১৯৮৪ সালের মধ্যে লক্ষ্যে পৌঁছানোর ব্যাপারে আমরা একটা মিটিং করছিলাম, এ সময় আমাদের কাছে খবর এল বোম্বাইতে ৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় মারা গেছেন ড. ব্রহ্ম প্রকাশ। মানসিকভাবে এটা ছিল আমার জন্য বিশাল ক্ষতি, কারণ আমার জীবনের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং সময়টাতেই আমি তার অধীনে কাজ করার সুবিধা পেয়েছিলাম। তার সমবেদনা ও নম্রতা ছিল দৃষ্টান্তমূলক। এসএলভি-ই ১ ফ্লাইটের ব্যর্থতার দিন তার সস্নেহ স্পর্শের কথা আর তাতে আমার বেদনা আরও ঘনীভূত হয়ে উঠল।
অধ্যাপক সারাভাই যদি ভিএসএসসির স্রষ্টা হয়ে থাকেন, তাহলে ড. ব্রক্ষ প্রকাশ ছিলেন তার সম্পাদনকারী। তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে পুষ্টি জোগান দিয়েছিলেন, যখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল। আমার নেতৃত্বের দক্ষতাকে রূপ দিতে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন ড. ব্রহ্ম প্রকাশ। বস্তুত তার সঙ্গে আমার কর্মসহযোগ ছিল আমার জীবনের একটা টার্নিং পয়েন্ট। তার তা আমার আগ্রাসী মনোভাবকে স্বাভাবিক করে তুলতে সাহায্য করেছিল। নিজের প্রতিভা বা জ্ঞানের জন্য যে তিনি নতা দেখাতেন তা নয়, বরং তার অধীনে কর্মরতদের মর্যাদা জ্ঞাপনের জন্যই তিনি নম্র আচরণ করতেন। তার মধ্যে আরও ছিল শিশুসুলভ নির্দোষিতা, আর আমি সবসময়ই তাকে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এক সন্ত হিসাবে বিবেচনা করতাম।
