এ সময় আমার সামনে সবচেয়ে জরুরি কাজ ছিল স্বতন্ত্র মিসাইল প্রকল্প পরিচালনার জন্য প্রকল্প পরিচালক নির্বাচন করা। আমাদের বিপুলসংখ্যক প্রতিভাবান লোক ছিল বস্তুত, সম্পদের বাজার। প্রশ্ন হলো কাকে বেছে নেব একজন পরিকল্পনাকারী, একজন নিয়মের বশবর্তীহীন মানুষ, একজন একনায়ক কি একজন দলীয় মানুষ? আমাকে খুঁজে নিতে হবে সঠিক নেতাকে যে পরিষ্কারভাবে লক্ষ্যের ছবি কল্পনা করতে পারবে, এবং তার দলের সদস্যদের শক্তি প্রবাহিত করতে পারবে স্বপ্ন বাস্তবায়নে যারা কাজ করবে বিভিন্ন কর্মকেন্দ্রে তাদের ব্যক্তিগত লক্ষ্যে।
খুব কঠিন এক খেলা, কিছু নিয়ম আমি শিখেছিলাম দুই দশক আইএসআরওর হাই প্রায়োরিটি প্রকল্পসমূহে কাজ করার সময়। ভুল নির্বাচন কর্মসূচির গোটা ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দিতে পারে। অনেক বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীর সঙ্গে আমি চেয়েছিলাম এই পাঁচজন প্রকল্প পরিচালক প্রশিক্ষণ দেবেন অন্য পঁচিশজন প্রকল্প পরিচালককে ও আগামী দিনের দলনেতাদের।
আমার সিনিয়র সহকর্মীদের অনেকেই তাদের নাম উল্লেখ করাটা ঠিক হবে না, কারণ তা হবে শুধুই আমার কল্পনা-এই সময়টায় আমার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের চেষ্টা করেন। আমি একজন নিঃসঙ্গ মানুষের জন্য তাদের উৎকণ্ঠার বিষয়টি শ্রদ্ধা করি, কিন্তু কোনো রকম নিবিড় যোগাযোগ এড়িয়ে যাই। বন্ধুর প্রতি আনুগত্যের কারণে কোনো ব্যক্তি এমনকিছু করতে পারে যাতে প্রতিষ্ঠানের কোনো ভালো স্বার্থ থাকবে না।
হয়তো আমার বিচ্ছিন্নতার প্রধান কারণ ছিল সম্পর্কের দাবি থেকে পালিয়ে থাকার বাসনা। রকেট তৈরির ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো কিছু বিশাল প্রতিবন্ধক বলে আমি মনে করি। আমি শুধু কামনা করতাম আমার জীবনধারায় সৎ থাকতে, আমার দেশে রকেট বিজ্ঞানকে উর্ধ্বে তুলে ধরতে, আর স্বচ্ছ চেতনা নিয়ে অবসর গ্রহণ করতে। আমি কিছুটা সময় নিলাম এবং পাঁচটা প্রকল্প কারা পরিচালনা করতে পারবে তার সিদ্ধান্ত স্থির করতে প্রচুর ভাবলাম। সিদ্ধান্ত নেবার আগে অনেক বিজ্ঞানীর কর্মপন্থা পরীক্ষা করলাম। আমার মনে হয়, আমার কিছু পর্যবেক্ষণ তোমার চিত্তাকর্ষক মনে হবে। কোনো ব্যক্তির কর্মপন্থার মূল পরিচয় হলো কীভাবে সে পরিকল্পনা করে আর কাজ সংগঠন করে। কেউ সতর্ক পরিকল্পনাকারী, প্রতিটা পদক্ষেপ ফেলার আগে সতর্কতার সঙ্গে বিচার করে, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ করে সম্ভাব্য ভুলের দিকে, সে চেষ্টা করে অনিশ্চিত সম্ভাবনাগুলো কভার করতে। অন্য দিকে আছে হুড়োহুড়ি করার লোক, কোনো পরিকল্পনা ব্যতিরেকেই যে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কোনো আইডিয়ায় অনুপ্রাণিত হলেই সে সর্বদা প্রস্তুত হয়ে যায় কাজের জন্য। কোনো ব্যক্তির কর্মপন্থার আরেক পরিচয় হলো নিয়ন্ত্রণ শক্তি ও মনোযোগ উৎসর্গ করা থাকে এটা নিশ্চিত করতে যে সবকিছু নির্দিষ্ট পথে চলছে। এর আবার একদিকে আছে। টাইট কন্ট্রোলার, কঠোর প্রশাসক। নিয়ম-নীতি সেখানে পালন করা হয় ধর্মের মতো। এর বিপরীতে আছে স্বাধীনভাবে চলাচলকারীরা। আমলাতন্ত্রের ব্যাপারে তাদের ধৈর্য সামান্যই। তারা সহজ প্রতিনিধিত্ব করে আর চলাফেরার ব্যাপক স্বাধীনতা দেয় তাদের অধস্তনদের। আমি চেয়েছিলাম মধ্য পথের নেতাদের, সেসব নেতাদের যারা শ্বাসরুদ্ধকর ভিন্নমত বা কঠোর অনমনীয়তা ছাড়াই নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
আমি তাদের চেয়েছিলাম যাদের সম্ভাবনা জাগানোর সামর্থ্য ছিল, ধৈর্যের সঙ্গে সকল সম্ভব বিকল্প বের করতে পারার সামর্থ্য ছিল, নতুন পরিস্থিতিতে পুরনো নীতি প্রয়োগের জ্ঞান ছিল; সামনে এগিয়ে যাবার দক্ষতাসম্পন্ন মানুষ। দরকার ছিল আমার। আমি চেয়েছিলাম তারা নিজ নিজ ক্ষমতা ও কাজ অন্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতে পারবেন, ভালো কাজের প্রতিনিধিত্ব করবেন, জ্ঞানীদের শ্রদ্ধা করবেন। তারা বিভিন্ন বিষয়কে পরস্পর থেকে পৃথক করতে পারবেন, আর দায়িত্ব নেবেন সামনে চলার। সর্বোপরি, সাফল্য ও ব্যর্থতাকে সমানভাবে নিতে পারবেন।
.
পৃথ্বী প্রকল্পের জন্য আমি খুঁজে পেলাম ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইএমই কোরের কর্নেল ভিজে সুন্দরমকে। তার ছিল অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি আর মেকানিক্যাল ভাইব্রেশনে তিনি বিশেষজ্ঞের জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। ডিআরডিএল-এ সুন্দরম ছিলেন স্ট্রাকচার গ্রুপের প্রধান। আমি তার মধ্যে খুঁজে পেলাম অনিশ্চিত ধারণা সমাধানে নতুন ধারার পরীক্ষানিরীক্ষায় প্রস্তুত একজন মানুষকে। টিম ওয়ার্কে তিনি ছিলেন একজন নিরীক্ষক ও উদ্ভাবক। কাজ পরিচালনার বিকল্প পন্থার মূল্যায়ন করার অনন্যসাধারণ ক্ষমতা ছিল তার। যদিও কোনো প্রকল্প নেতার কাছে লক্ষ্য পরিষ্কার হতে পারে এবং লক্ষ্য পূরণে তিনি যথার্থ নির্দেশ দিতেও পারেন, তা সত্ত্বেও তার অধস্তনরা সে উদ্যোগ প্রতিরোধ করতে পারে যদি লক্ষ্য সম্পর্কে তাদের কোনো বোধোদয় না ঘটে। তাই কার্যকর কর্ম নির্দেশনা দেবার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আমি ভাবলাম পৃথ্বীর প্রকল্প পরিচালককে উৎপাদন সংস্থা ও সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আর এক্ষেত্রে সুন্দরমই হবে উপযুক্ত পছন্দ।
ত্রিশূল-এর জন্য আমি এমন এক ব্যক্তিকে খুঁজছিলাম যার শুধু ইলেকট্রনিক্স ও মিসাইল ওয়ারফেয়ারে বিপুল জ্ঞান আছে তাই নয়, যে তার দলের সঙ্গে বোঝাপড়া ও দলের সমর্থন আদায়ের জন্য জটিল বিষয়গুলো দলের কাছে পেশ করতে পারবে। এই কাজের উপযুক্ত লোক হিসাবে খুঁজে পেলাম কমোডর এসআর মোহনকে, ভারতীয় নৌবাহিনী থেকে তাকে নিয়ে আসা হয়েছিল প্রতিরক্ষা আরঅ্যান্ডডিতে। যুক্তির দ্বারা মানুষের মনে প্রত্যয় উৎপাদনের অলৌকিক ক্ষমতা ছিল তার।
