সরকারের মঞ্জুরি পত্র আমি যখন উপস্থাপন করলাম ডিআরডিএলের মিসাইল টেকনোলজি কমিটির সামনে, তখন সবাই যেন হর্ষে ফেটে পড়ল। প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর নামকরণ করা হয়েছিল ভারতের আত্মনির্ভরতার মর্ম অনুসারে। এভাবেই সারফেস-টু-সারফেস উইপন সিস্টেমের নাম দেওয়া হয় পৃথী, ট্যাকটিক্যাল কোর ভেহিকলের নাম দেওয়া হয় ত্রিশূল। অন্যদিকে সারফেস-টু-এয়ার এরিয়া ডিফেন্স সিস্টেমের নাম হয় আকাশ এবং ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প নাগ। আমার অনেক দিনের স্বপ্ন আরইএক্সের নাম দিয়েছিলাম অগ্নি। ড, অরুণাচলম এলেন ডিআরডিএলে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করলেন আইজিএমডিপি, ১৯৮৩ সালের ২৭ জুলাই। সেটা ছিল এক বিশাল ঘটনা। ডিআরডিএলের প্রতিটা কর্মী তাতে অংশ নিয়েছিল। ইন্ডিয়ান অ্যারোস্পেস রিসার্চের সাধারণ ব্যক্তিটাও আমন্ত্রিত হয়েছিল। এ উপলক্ষে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অন্যান্য গবেষণাগার ও প্রতিষ্ঠানের বিপুলসংখ্যক বিজ্ঞানী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধ্যাপকরা, সশস্ত্র বাহিনী, উৎপাদনকেন্দ্র ও ইন্সপেকশন কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিরা, যারা এখন আমাদের কাজের অংশীদার হয়েছিলেন। সমস্ত আমন্ত্রিতদের জন্য একটা কক্ষের ব্যবস্থা করতে না পারায় আমরা তাদের মধ্যে যোগাযোগ নিশ্চিত করেছিলাম ক্লোজড-সার্কিট টিভি নেটওয়ার্ক বসিয়ে। আমার ক্যারিয়ারে এটা ছিল দ্বিতীয় সর্বাধিক তাৎপর্যপূর্ণ দিন। প্রথম দিনটি এসেছিল ১৯৮০ সালের ১৮ জুলাই, যেদিন এসএলভি-৩ পৃথিবীর কক্ষপথে স্থাপন করেছিল রোহিনী রকেট।
.
১১.
এ আইজিএমডিপির উৎক্ষেপণ ছিল ভারতের বিজ্ঞান-আকাশে এক উজ্জ্বল ঝলক। ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিকে বিবেচনা করা হয়েছিল বিশ্বের নির্বাচিত কয়েকটি রাষ্ট্রের জমিদারি হিসাবে। জনগণ কৌতূহলী ছিল যে আমাদের প্রতিশ্রুতি আমরা কীভাবে রক্ষা করি, সেই সময়ে ভারতের পারিপার্শ্বিক প্রেক্ষাপটে। দেশে আইজিএমডিপির উজ্জ্বলতা ছিল বাস্তবিকই নজিরবিহীন। নির্ধারিত প্রকল্পগুলোও ছিল ভারতের আরঅ্যান্ডডি স্থাপনাগুলোর নমুনার বিচারে অসার কল্পনাপূর্ণ। আমি সম্পূর্ণ সচেতন ছিলাম যে, কর্মসূচির জন্য মঞ্জুরি পাওয়া যাবে কেবল দশ শতাংশ কাজ সম্পূর্ণ করতে পারলেও। চালিয়ে যেতে পারলে সেটা হবে একেবারেই আলাদা ব্যাপার। যত বেশি তোমার থাকবে, তত বেশি তোমাকে রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। এখন আমরা প্রয়োজনীয় অর্থ আর স্বাধীনতা পেয়েছি সামনে এগিয়ে যাওয়ার। সুতরাং দলকে। আমার সামনের দিকে চালাতে হবে এবং আমার প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে।
ডিজাইন থেকে মোতায়েন পর্যন্ত এই ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বাস্তবায়নে কী প্রয়োজন হবে? বিপুল জনশক্তি ছিল সহজলভ্য; অর্থ মঞ্জুর হয়েছে; এবং কিছু অবকাঠামও বিদ্যমান। তাহলে অভাব কীসের? এই তিনটে গুরুত্বপূর্ণ ইনপুট ছাড়া একটা প্রকল্পের আর কী দরকার? আমার এসএলভি-৩ অভিজ্ঞতা থেকেই এর উত্তর আমার জানা ছিল। জটিল বিষয় হলো মিসাইল টেকনোলজির ওপর প্রভুত্ব অর্জন করতে হবে। বিদেশ থেকে আমি কিছুই আশা করিনি। টেকনোলজি হচ্ছে গ্রুপ অ্যাকটিভিটি আর আমাদের সেসব নেতা দরকার যারা তাদের হৃদয়-মন সঁপে দিতে পারবেন মিসাইল প্রগ্রামে, সেই সঙ্গে আরও শত শত প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীকে টেনে নিয়ে যেতে পারবেন নিজেদের সঙ্গে। আমি জানতাম, অসংখ্য পরস্পরবিরোধীতা আর হাস্যকর নিয়মনীতি মোকাবেলার প্রস্তুতি নিতে হবে আমাদের, অংশগ্রহণকারী গবেষণাগারগুলোয় যা প্রভাব বিস্তার করে আছে। সরকারি খাতের ইউনিটগুলো মনে করে থাকে তাদের কর্মকুশলতা কখনও পরীক্ষিত হবে না, তাদের মধ্যে বিরাজমান এই মনোভাবের সঙ্গেও আমাদের মিথস্ক্রিয়া করতে হবে। পুরো সিস্টেমকে এর লোকবল, নিয়ম, অবকাঠামকে বর্ধন করা জানতে হবে। আমরা এমনকিছু অর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি যা আমাদের যৌথ জাতীয় সামর্থ্যের বাইরে, এবং আমার এই ব্যাপারে কোনো অলীক ধারণা নেই যে, সঙ্গতি ও সম্ভাবনার ভিত্তিতে আমার দল যতক্ষণ কাজ শুরু না করছে ততক্ষণ কিছুই অর্জিত হবে না।
ডিআরডিএলের সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় ছিল এখানে বিপুলসংখ্যক উঁচু প্রতিভাবান মানুষের সমাবেশ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাদের মধ্যে অনেকেরই অহংকার ও বিদ্রোহাত্মক মনোভাব ছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আত্মবিচারের ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসী হবার মতো যথেষ্ট পরিমাণ অভিজ্ঞতার অভাব ছিল তাদের। মোদ্দা কথা, তারা বেশ উৎসাহ সহকারে নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করত, কিন্তু শেষ পর্যন্ত অল্প কয়েকজনের নির্বাচিত কথার সঙ্গে একমত হতো। তারা কোনো প্রশ্ন ছাড়াই বাইরের বিজ্ঞানীদের কথা বিশ্বাস করত।
.
ডিআরডিএলে একজন চিত্তাকর্ষক ব্যক্তি ছিলেন এভি রঙ্গ রাও। তিনি ছিলেন অতিশয় স্পষ্টভাষী আর তার ছিল প্রভাবদায়ক ব্যক্তিত্ব। তিনি সাধারণত চেক কোটের সঙ্গে লাল নেকটাই আর ঢোলা ট্রাউজার পূরতেন। হায়দারাবাদের গরম আবহাওয়ার মধ্যেও তিনি এগুলো পরতেন, যেখানে এমনকি ফুল হাতা শার্ট আর জুতোও পরিত্যাজ্য বলে বিবেচিত হতো। তার মুখে ছিল ঘন শাদা দাড়ি আর দাঁতের ফাঁকে তামাকের পাইপ। এই গিফটেড মানুষটার চারপাশে দেখা যেত দেহজ্যোতির আভা।
আমি মানব সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিদ্যমান ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম পুনর্গঠিত করার ব্যাপারে রঙ্গ রাওয়ের সঙ্গে আলোচনা করলাম। রঙ্গ রাওয়ের অনেকগুলো মিটিং ছিল সেইসব বিজ্ঞানীদের সঙ্গে যারা দেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি উন্নয়নে আমাদের দর্শনের অংশীদার ছিল। তিনি তাদের কাছে আইজিএমডিপির বিভিন্ন বিষয় ব্যাখ্যা করছিলেন। দীর্ঘ আলোচনার পর আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, গবেষণাগারকে একটা টেকনোলজি-ওরিয়েন্টেড স্ট্রাকচার হিসাবে পুনর্গঠিত করা হবে। প্রকল্পের জন্য দরকারি বিভিন্ন তৎপরতা পরিচালনার জন্য একটা মৌল কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। চার মাসেরও কম সময়ের মধ্যে চারশ বিজ্ঞানী মিসাইল কর্মসূচির কাজ শুরু করে দিলেন।
