আপনারা আগামীকাল সকালে আসুন দয়া করে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী উত্তর দিলেন।
অধ্যাপক সারাভাইয়ের প্রবল উৎসাহ ও স্বপ্নের কথা এতে মনে পড়ে গিয়েছিল। সেই রাতে, ড. অরুণাচলম ও আমি এক সঙ্গে মিলে আমাদের পরিকল্পনা আবার নতুন করে তৈরি করলাম।
আমাদের প্রস্তাবে কতকগুলো জরুরি বিষয় আমরা সম্প্রসারিত ও অন্তর্ভুক্ত করলাম। যোগ করলাম সব ধরনের পরিবর্তন, যেমন ডিজাইন, ফেব্রিকেশন, সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন, কোয়ালিফিকেশন, পরীক্ষামূলক ফ্লাইট, মূল্যনির্ধারণ, আপডেটিং, ইউজার ট্রায়াল, উৎপাদনশীলতা, মান, নির্ভরযোগ্যতা, আর আর্থিক সক্ষমতা। আমরা বিশদ করে দেখালাম ডিজাইন, ডেভলপমেন্ট ও উৎপাদন সহবর্তমানতার ধারণা, এবং ড্রয়িং-বোর্ড পর্যায় থেকেই ইন্সপেকশন এজেন্সি ও ইউজারের অংশগ্রহণের প্রস্তাব দিলাম। আমরা বহু বছরের উন্নয়মূলক কর্মকান্ড পরিচালিত হয়ে আসার পর এখন স্টেট-অব-দ্য-আর্ট সিস্টেম অর্জনের জন্য একটা মেথোডোলজির পরামর্শও দিলাম। আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে আমরা সমকালীন ক্ষেপণাস্ত্রই দিতে চাই, বাতিল হয়ে যাওয়া কোনো অস্ত্র নয়। খুব উত্তেজনাকর একটা চ্যালেঞ্জ আমাদের দিকে ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছিল।
আমাদের এই পরিকল্পনার কাজটা শেষ করতে করতে সকাল হয়ে গেল। হঠাৎ নাশতার টেবিলে আমার মনে পড়ল, সন্ধ্যায় রামেশ্বরমে আমার ভাইঝি জামিলার বিয়ে আর আমার তাতে হাজির থাকার কথা। আমি ভাবলাম কোনো কিছু করার আর সময় নেই। দিনের আরও পরে যদি মাদ্রাজ ফ্লাইট ধরতেও পারি, সেখান থেকে রামেশ্বরমে পৌঁছাব কীভাবে? মাদ্রাজ ও মাদুরাইয়ের মধ্যে কোনো বিমান যোগাযোগ ছিল না, মাদুরাই থেকে রামেশ্বরমে যেতে হতো ট্রেনে। অপরাধের আর্দ্র ছায়া পড়ল আমার মনের ওপর। নিজেকে প্রশ্ন করলাম, পরিবারের প্রতি আমার প্রতিশ্রুতি ও বাধ্যবাধকতা ভুলে যাওয়া কি সঙ্গত? জামিলা আমার কন্যারও অধিক। পেশাগত কারণে তার বিয়েতে থাকতে না পারার চিন্তাটা ছিল অত্যন্ত মর্মপীড়াদায়ক। নাশতা শেষ করে সাক্ষাতের জন্য আমি বেরিয়ে গেলাম।
.
প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ভেঙ্কটরমনের সঙ্গে আমরা যখন সাক্ষাৎ করলাম আর আমাদের সংশোধিত প্রস্তাব দেখালাম, তখন দৃশ্যত তিনি আনন্দিত হলেন। মিসাইল ডেভলপমেন্ট প্রজেক্টের প্রস্তাব রাতারাতি পরিণত হয়েছিল একটা ইন্টিগ্রেটেড প্রোগ্রামের ব্লু-প্রিন্টে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর প্রতি আমার সম্মান রেখেই বলছি, আমি সত্যিই নিশ্চিত ছিলাম না যে তিনি আমাদের পুরো প্রস্তাব ক্লিয়ার করবেন কিনা। কিন্তু তিনি করলেন। আমি অকল্পনীয় আনন্দিত হলাম।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রী উঠে দাঁড়ালেন, সংকেত দিলেন মিটিং শেষ হয়ে গেছে। আমার দিকে ফিরে তিনি বললেন, যেহেতু আমি আপনাকে এখানে এনেছি, তাই আমি আশা করছিলাম এমন কোনো পরিকল্পনা নিয়ে আসবেন আপনি। আপনার কাজ দেখে আমি আনন্দিত। ১৯৮২ সালে ডিআরডিএলের পরিচালক হিসাবে আমার নিয়োগ দানের রহস্য এক মুহূর্তে পরিষ্কার হয়ে গেল। তাহলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ভেঙ্কটরমন আমাকে নিয়ে এসেছেন এখানে। তাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপনের জন্য মাথা ঝুঁকিয়ে আমি দরজার দিকে ঘুরলাম আর শুনতে পেলাম ড. অরুনাচলম এই সন্ধ্যায় রামেশ্বরমে অনুষ্ঠিতব্য জামিলার বিয়ের কথা বলছেন মন্ত্রীকে। বিষয়টা মন্ত্রীর কাছে উত্থাপন করায় আমি বিস্মিত হলাম। সর্বময় ক্ষমতার সাউথ ব্লকে বসা তার মতো একজন ব্যক্তি বহু দূরের এক দ্বীপে একটা ছোট্ট বাড়িতে একটা বিয়ের ব্যাপারে কেন উদ্বিগ্ন হবেন?
ড. অরুণাচলমের প্রতি সবসময়ই আমার শ্রদ্ধা ছিল। আমি একেবারে অভিভূত হয়ে পড়লাম যখন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মাদ্রাজ ও মাদুরাইয়ের মধ্যে গমণকারী বিমানবাহিনীর একটা হেলিকপ্টারে আমার মাদুরাই যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের নিয়মিত ফ্লাইটে আমি মাদ্রাজ পৌঁছে বিমান থেকে নামা মাত্রই ওই হেলিকপ্টার আমাকে সেখান থেকে তুলে নেবে মাদুরাইয়ে পৌঁছে দেবার জন্য। দিল্লি থেকে বিমানটি ছেড়ে যাবে এক ঘন্টার মধ্যেই। উ, অরুণাচলম আমাকে বললেন, এটা আপনি অর্জন করেছেন গত ছয় মাসের কঠোর পরিশ্রমের জন্য।
বিমানে মাদ্রাজের দিকে উড়ে যেতে যেতে আমার বোর্ডিং পাসের উল্টো দিকে আমি দ্রুত হাতে লিখলাম:
Who never climbed the weary league
Can such a foot explore
The purple territories
On Rameswarams shore?
দিল্লি থেকে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের বিমানটি মাদ্রাজ পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই এর খুব কাছে ল্যান্ড করল বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার। পরবর্তী কয়েক মিনিটের মধ্যে আমি হেলিকপ্টারে চড়ে মাদুরাইয়ের পথে উড়ে চললাম। এয়ার ফোর্স কমান্ডান্ট আমাকে রেলস্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে দিলেন, সেখানে রামেশ্বরমগামী ট্রেনটা প্লাটফর্ম ছেড়ে যাবার উপক্রম করেছে তখন। জামিলার বিয়ের অনুষ্ঠানে ঠিক সময়েই আমি যোগ দিতে পেরেছিলাম সেদিন। পিতার ভালোবাসা দিয়ে আমার ভাইয়ের মেয়েকে আমি আশীর্বাদ করেছিলাম।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আমাদের প্রস্তাব ক্যাবিনেটে উপস্থাপন করলেন আর আগাগোড়া খতিয়ে দেখলেন। আমাদের প্রস্তাবের ওপর সুপারিশ গৃহীত হলো এবং এই খাতে ৩৮৮ কোটি রুপি মঞ্জুর করা হলো, যেটা ছিল নজিরবিহীন। এভাবেই জন্ম নিয়েছিল ভারতের মর্যাদাশীল ইন্টিগ্রেটেড গাইডেড মিসাইল ডেভলপমেন্ট প্রোগ্রাম, পরবর্তীতে সংক্ষেপে বলা হতো আইজিএমডিপি।
